kalerkantho

আনা

নাজমুস সাকিব রহমান   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০৯:৪৭



আনা

পাঁচ বছর আগের কথা।

ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলছে। একদিন পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে দেখলাম- বন্ধুদের কেউ নেই। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায়, আমি রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে সিএনজি ভাড়া করব কি-না ভাবছি। কারণ, যে কয়েকটি রিকশা ওমর গণি কলেজের সামনে ছিল, তাদের কেউ চকবাজার যেতে রাজি হয়নি। খুলশির চালকদের মতোই প্রায় সবাই একটা নির্দিষ্ট এলাকায় গাড়ি চালায়।

খানিকক্ষণ পর হঠাৎ বৃষ্টি নেমে এলো। আমার মনে পড়ল, এখন বর্ষার সময়। সকালে তাড়াহুড়া করে বের বেরোবার সময় ছাতা আনা হয়নি। সে জন্যে নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে, একটা বাড়ির গেইটের নিচে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। দেড়টার বৃষ্টিতে অর্ধেক ভেজার পর, ওই বাড়ির দারোয়ান এসে বলল, 'সাহেব, আপনারে ডাকে।

ভেতরে যান। '

আমার খানিকটা কৌতূহল হলো। বাড়িটা বাইরে থেকে অন্যরকম হওয়ায় ভেতরে ঢুকে অবাক হলাম। সে সময় আমি ডুপ্লেক্স বাড়ি দেখলে অবাক হতাম। তার ওপর ওটাই প্রথম দেখা।

বিপত্নীক ভদ্রলোকের নাম আতাহার হোসেন। বয়স পঞ্চাশ বছরের কাছাকাছি। দুই কানের পাশে কিছু চুল পাকা। তিনি নিজের হাতে একটি তোয়ালে এনে বললেন, ‘মাথাটা মুছে নাও। ’

একটু পর জিজ্ঞেস করলেন, কফি খাবে?

তারপর নিজেই কফি বানিয়ে আনলেন।

আমাকে ডেকে আনার কারণ কি না জানার পরেও আমিও এতোটুকু প্রত্যাশা করি নি। তিনি ড্রইংরুমের নীরবতা ভেঙে বললেন, ‘তুমি কি একটু আগে পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়েছো?

আমি বললাম, ‘একটায় পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ’

তিনি বললেন, ‘অনেকদিন আগে আমারও তোমার মত হয়েছিল। পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়েই বৃষ্টির মুখোমুখি। সেদিন আমার সঙ্গে ছাতা ছিল না। আমি এক বাড়ির গেইটের নিচে দাঁড়িয়েছিলাম। খানিকক্ষণ পর ওদের দারোয়ান এসে গেইটের সামনে থেকে সরে যেতে বলেছিল। আমি খুব অভিমান নিয়ে ঘরে ফিরেছিলাম।

ওই সময় আমাদের ঘরে দুটো ছাতা ছিল। একটি আব্বার জন্যে, আরেকটা আমরা তিনভাই ও আমাদের আম্মা ব্যবহার করতাম। এই জন্য ছাতা নিয়ে বেরিয়ে গেলে বাকিরা সমস্যায় পড়ত।

তোমাকে গেইটের সামনে দাঁড়াতে দেখে নিজের কথা মনে পড়ল। ’

আতাহার হোসেনের ড্রয়িং রুমটা জল্পনার মত নয়, সাধারণ। সোফা ছাড়া দেয়ালে একটি ছবি আছে। একটু আগে উনি জানিয়েছেন, এই বাড়িতে দারোয়ান, বাবুর্চি, উনি আর উনার একমাত্র কুকুর ‘আনা’ থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই কুকুরের এই ধরণের নাম—প্রথম শুনার পর অবাক হয়েছিলাম।

আমি দেয়ালের ছবিটির দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছি দেখে উনি বললেন, ‘এই ছবির নাম ‘পার্সিসটেন্স অব মেমোরি। ’’

আমি বললাম, ‘এটা কি নকল ছবি?’

তিনি বললেন, ‘আসল ছবিটা ১৯৩৪ সাল থেকে নিউ ইয়র্কের ‘মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে’র কাছে। সেটিও আমার দেখা হয়েছে। আমি একবার স্ত্রী-সহ সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলাম। ওকে বললাম, ছবিটি কেমন লাগল নাহিন?

আমার স্ত্রীর নাম ছিল নাহিন। সে আমাকে বলল, ‘বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে ছবিটি তোমার মত। তোমাকেও ঠিক বুঝতে পারি না। ’

‘এতো আগের ছবি?’

‘এটা সালভাদর দালির আঁকা ছবি। ব্যক্তিহিসেবে আমার ভীষণ পছন্দের একজন শিল্পী। প্যারিসের মঁমার্ত শহরটি চিত্রশিল্পীদের তীর্থস্থান। সেখানে প্লেস দ্যু টারটার চত্বরের একটু দূরে, তাকে উৎসর্গ করে ‘এল স্পেস সালভাদর দালি’ নামের একটি মিউজিয়াম আছে। সেখানে তার সমস্ত চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্য প্রদর্শন করা হয়। আমি সেটাও দেখেছি। ’

আমি বললাম, ‘নামটা আগে শুনি নি। ’

তিনি বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শোন, বৃষ্টি বিকেলের আগে থামবে বলে মনে হয় না। তোমাকে অবশ্য গল্প করার জন্যে ডেকেছি। সালভাদর দালির  গল্পই বলি।  

এই নামটা ওর বড় ভাইয়ের। সে অল্পবয়সে মারা গিয়েছিল। দালি জন্মাবার পর তার আব্বা আম্মার মনে হল, এই ছেলেটা তাদের বড় ছেলের ছায়া। সে জন্য বড় ছেলের নামেই ছোট ছেলের নাম রাখা হয়েছিল। ’

‘অদ্ভুত তো!’

ওই সময় মুখে এটা বললেও আমার মনে হল, যদি ছোট ছেলেটা মারা যেতো, তাহলে কি বড় ছেলের নামটা বদলে তার নাম রাখা হত? হয়তো হত না। কিন্তু প্রশ্নটা শুনে আতাহার হোসেন বিরক্ত হবেন বলে করা হল না।

‘আরও অদ্ভুত ব্যাপার আছে। তিনি নিজের প্রতি অসম্ভব আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। এ জন্যেই মাত্র ৩৭ বছর বয়সে আত্মজীবনী লিখে ফেলেছিলেন। এটি পরে দ্যা সিক্রেট লাইফ অব সালভাদর দালি নামে ইংরেজিতে ভাষান্তর হয়। ’

আমি বললাম, ‘ওইটা তো শেষ বয়সে লেখার জিনিস। ’

‘তুমি ঠিকই বলেছ। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ না। সেই বইয়ে তিনি লিখেছেন, তিনি নাকি প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে ওঠে সালভাদর দালি হওয়ার আনন্দ পান। ’

আতাহার হোসেনের কথা বলার ভঙ্গী সুন্দর। মাঝামাঝি স্বর। উঁচুতে কথা বলেন না। বলার সময় কোথায় থামতে হবে—তা জানেন।   আমি খুব সহজেই তার শ্রোতা হয়ে গেলাম। দুপুরটা কীভাবে যেনো কেটে গেল। অবশ্য এর মধ্যে আমি জেনে গেলাম,  সাত বছর আগে তার স্ত্রী নাহিন সন্তান হবার সময় মারা গিয়েছেন। স্ত্রী এবং সন্তানের কেউ বেঁচে না থাকায় এখন তার কথা বলার সঙ্গী সাতবছরের কুকুর ‘আনা’।

বাইরের বৃষ্টি চলে গেছে। আমি ফেরার সময় তিনি আমাকে, তার ঘরে আমন্ত্রন জানিয়ে রাখলেন।

২.

আতাহার হোসেনের সঙ্গে আমার পরবর্তী দেখা যখন হল, তখন ক্যালেন্ডারের হিসেবে দেড় বছর পার হয়ে গেছে। তখনও তার দুই কানের পাশে থাকা পাকা চুলের সংখ্যা বাড়ে নি। এবার তার সঙ্গে দেখা হল পশু হাসপাতালের সামনে। তিনি আমাকে হেঁটে যেতে দেখে ডাক দিলেন। কিছুটা খোঁজ খবর দেওয়ার পর আমি বললাম, ‘ আপনি এখানে কেন?’

তিনি বললেন, ‘আনা খুব অসুস্থ। ওকে ডাক্তার দেখাতে এসেছি। ’

ব্যক্তিগতভাবে আমি কুকুর ভর পাই। তারপরেও ‘ওকে খুব পছন্দ করেন?’

‘সাত বছর ধরে আমার সঙ্গে আছে। ওর ওপরমায়া পড়ে যাওয়ার কারণে নিজেই পশু হাসপাতালে নিয়ে আসলাম। অন্য কাউকে পাঠানোর সাহস করতে পারি নি। আপাতত কাজ শেষ। এবার ঘরের দিকে যাব। তোমাকে দেখে দাড়ালাম। ’

আমি প্রশ্ন করলাম, ‘আচ্ছা, আনা নামটিকে রেখেছেন?’

তিনি বললেন, ‘নাহিনের রাখা। তার বাচ্চা হবে শুনে এই নামটি ঠিক করেছিল। ’

তখনই আমার মনে হল,আতাহার হোসেনের স্ত্রী নাহিনের খুব ইচ্ছে ছিল, তাঁদের প্রথম সন্তানের নাম—দুজনের নামের প্রথম অক্ষর যোগ করে রাখবেন। কারণ, আতাহারের ‘আ’ আর নাহিনের ‘না’ যোগ করলে ‘আনা’ হয়।   কিন্তু সাত বছর আগে বাচ্চা হবার সময়—ভদ্রমহিলা ও তার সন্তান দুজনেই মারা যাওয়ায় এই নামকরণটি হয়নি।

এদিকে আতাহার হোসেন স্ত্রীকে খুব ভালবাসেন। স্ত্রীকে হারিয়ে তিনি সাত বছর ধরে একটি কুকুর পুষছেন। স্ত্রী’র ঠিক করে রাখা নাম দিয়ে তাকে কথা বলার সঙ্গী করে নিয়েছেন। শুধু তাই না, একেবারেসন্তানের মতই দেখছেন। এর মূলে ওই স্ত্রীর রাখা নাম।  

আমি তার জীবনের গল্পটি আবিস্কার করে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি।

রাস্তায় দাঁড়িয়েই বলি, ‘আপনার স্ত্রীর একটা গল্প বলুন তো। ’

তিনি বললেন, ‘একবার আমরা দুজন চার কামরার ছোট ট্রেনে চড়ে, শ্রীলঙ্কার বেনটোটা থেকে কলম্বো গিয়েছিলাম। ওখানে সমুদ্র ঘেঁষে ট্রেনের লাইন। একের পর এক সমুদ্র ও তার পাড়ের জেলেপল্লী দেখছিলাম। দৃশ্যপট বদলেছে কিন্তু সমুদ্র বদলায় নি।

সেই যাত্রাটা নাহিনের খুব ভাল লেগেছিল। সে প্রায়ই বলত ওইদিনের কথা। বলার সময় তার চোখ চিক চিক করতো। অদ্ভুত ব্যাপার হল, সেদিন ট্রেনের শোচনীয় কামরার কারণে আমার কাছে বিরক্ত লাগলেও এখন বুঝতে পারি, নাহিনই ঠিক ছিল। সমুদ্র ঘেঁষা যাত্রা আসলেই অসাধারণ। ’

আতাহার হোসেন এটুকু বলেই চলে যান। যাওয়ার আগে বললেন, ‘আনাকে বাসায় নিয়ে খাবার দিতে হবে। সকাল থেকে কিছু খায় নি। তুমি সময় করে একবার এসো। গল্প করবো। ’

সেদিন আমি তার কাছে যাওয়ার কথা বললেও, এখনও সেই কথা রাখতে পারি নি।


মন্তব্য