kalerkantho


মেয়েটির নাম সাবিনা

মঞ্জুর এ এলাহী   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০৯:৩৪



মেয়েটির নাম সাবিনা

বাসে আমার পাশে বসা মেয়েটি চুপচাপ তার চোখের পানি ফেলছে। অনেকক্ষণ ধরে এই ছিলছিলা বিরাজমান।

অপরিচিতা নারী! তার ব্যাপারে নাক গলাতে চাচ্ছি না আবার এত কান্না করছে চুপচাপ বসে থাকতে পারছি না!...

মেয়েটির হাতে রণবীর কাপুরের ছবি। রণবীর কাপুরের ছবি হাতে নিয়ে কান্না করছে ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং লাগছে। কাহিনী কি যে মেয়েটি কান্না করছে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে মেয়েটির নাক মোছার প্রয়োজন তাই একটি টিস্যু বাড়িয়ে দিলাম। মেয়েটি টিস্যুটি হাতে নিয়ে আবার থেমে গেল। সে টিস্যুটাকে যাচাই-বাছাই করছে। আমার একটু হাসি পেল বটে!
.
-চিন্তা করবেন না...ক্লোরোফর্ম নেই...
.
-আমি কি বলেছি এতে ক্লোরোফর্ম আছে....!?
.
-তা না.....
.
মেয়েটি তার নাক মোছে এবার কান্না থামাল। আমিও চুপচাপ বসে আছি আর মেয়েটিও। হঠাৎ মেয়েটি রেগে গেল!...
.
-এই বয়সে এত স্বাস্থ্য বানিয়েছেন কেন!?...
.
-জ্বি মানে....
.
-বাসের সিটের অর্ধেক জায়গায় তো নিয়ে নিয়েছেন..
.
-আসলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত..আপনি বল্লেন আমি সিট ছেড়ে আরেকজনের সাথে এক্সচেইঞ্জ করতে পারি...
.
-না থাক.....
.
-হুম...
.
-আচ্ছা আপনি কি খুব খান?
.
-আসলে কি বিধাতা প্রদত্ত একটা শক্তি আছে আমার..মুখে অস্বাভাবিকভাবে রুচি শক্তি আমার...ভোজন রসিক তো...
.
-হুহ!পুরাই তো পটকা মাছের মত...
.
কথাটি শুনে খুব কস্ট পেলাম।

মন খারাপ করে বসে রয়েছি। মেয়েটির মুখে লাগাম নেই..কথা বার্তা দ্বারা আশেপাশের কেউ কস্ট পায় কিনা তার কোন তোয়াক্কায় করে না!...আমি মেয়েটিকে একটু ব্যাঙ্গ করার জন্য তার হাতে থাকা রনবীর কাপুরের ছবিটি আঙ্গুল দেখিয়ে বল্লাম 
.
-আপনার বয়ফ্রেন্ডের ছবি?..
.
-হলে তো ভালই হতো...আমার জান ও...
.
-বাহ!...
.
-আপনাকে দেখে তো রনবীর কাপুরের সমবয়সীই মনে হয়..ওর সিক্স প্যাক আর আপনার...
.
-ব্যাছ আর বলতে হবে না...
.
-দেখুন সকল পুরুষের উচিত ফিট থাকা..জিম বডি থাকা...ডায়েট করা..
.
-শুনুন জিম বডির জন্য তাকে সবাই টাকা দেয়...কোটি কোটি টাকা না দিলে দেখতেন যে এই রনবীর কাপুরই বা কেমন ফিট থাকতো!..
.
-ওর নামে কিছু বলবেন না!...
.
-আচ্ছা...আরেকটা প্রশ্ন করি?...
.
-করুন..
.
-একটু আগে কাঁদলেন কেন?
.
-আসলে আমি রনবীর কাপুরের চরম ভক্ত..সব সময় স্বপ্ন ছিল ওর মত কাউকে বিয়ে করবো। আমার ইউনিভার্সিটিতে এরকম একটা ছেলেও পেয়েছিলাম..প্রপোজ করার আগেই দেখি বুক হয়ে আছে ছেলেটি....তারপরও রনবীরের মত ছেলে খুচ্ছিলাম..এদিকে শুনি আমাকে পাত্র পক্ষ দেখতে আসছে....
.
-আপনার বাবাও তো মনে হয় আপনার পছন্দের মতই ছেলে খুঁজেছে....
.
-ছোট কাকুর কাছে শুনেছি ছেলে উচ্চ শিক্ষিত...মানুষ ভালো কিন্তু স্বাস্থ্য ভালো!মিনি হাতি বলা চলে...আমি ভাবছি ছেলেটিকে না করে দিব...আমার হাজব্যান্ডের সিক্স প্যাক বডি থাকা চাই....
.
-আশা করি আপনার ইচ্ছা খুব শীঘ্রই পূরণ হবে...
.
মেয়েটির কথা শুনে খারাপও লাগলো। আসলে আমিই সেই ছেলে যার সাথে ওর বিয়ের কথা চলছে। মেয়েটি কেমন আর তার পছন্দ কেমন বা তাকে ইমপ্রেস করার জন্য আজ ও যে বাসে আসার কথা ছিল সেই বাসে ওর পাশেই বসি...
কিন্তু যা বুঝছি বরাবরের মত এই পাত্রীও আমাকে রিজেক্টই করেছে...মনটা খারাপ আমার...বাস থেকে নেমে উল্টো পথে ঢাকায় যাওয়ার চিন্তা করলাম। উঠে দাঁড়ালাম এবং বাসের হেল্পারের কাছে গিয়ে তাকে বাস থামাতে বলবো কিন্তু তার আগেই দেখি বাসই থেমে গেল!
বাসের ইঞ্জিন নস্ট হয়ে গেছে।
সবাইকে নামিয়ে হেল্পার আরেকটি বাসে উঠিয়ে দিবে এমন সময় মুশোলধারের বৃষ্টি নামলো। বাস থেকে নামার অপসনও শেষ!বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত যে যার সিটে আবার বসে পরলাম।
.
সাবিনঅর্থাৎ আমার পাশের সেই মেয়েটি বাসের জানালা দিয়ে বৃষ্টি উপভোগ করছে। আমার আর তার সাথে কথা বলার ইচ্ছা নেই। হঠাৎ সে চিল্লিয়ে উঠলো। রাস্তা দিয়ে একটি বাইক চালক বৃষ্টিতে গতি হারিয়ে রাস্তায় স্লিপ কেটে পরে গিয়েছে। মেয়েটি সহ সবাই সেই বাইক চালককে বাসের ভিতর থেকে দেখছে। বাইরে এত বর্জ্রপাত এবং বৃষ্টি তাই কেউ যাচ্ছে না তাকে সাহায্য করতে!...
আমি কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে বাস থেকে বের হয়ে সেই বাইক চালককে উদ্ধ্যার করলাম। কেন না তাকে না উঠালে কোন গাড়ির উপর চাপা পরবে। মানবতা কতটা নিচে নেমে গেছে!বৃষ্টি বড় না জান বড়!অনেক্ষণ ধরে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বাসেরর ভেতরের  দুই একজনকে বলছি আমাকে সাহায্য করতে!...কিন্তু বৃষ্টিতে ভেজার ভয়ে কেউ আসছে না!.....
কিছুক্ষণ পর সাবিনা বাস থেকে নামলো। সে আমাকে হেল্প করছে লোকটিকে বাঁচাতে। বৃষ্টির মধ্যে একটি সিএনজি পেলাম। লোকটিকে আমি এবং সাবি সিএনজিতে উঠিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে গেলাম। লোকটি এ যাত্রায় বেঁচে গেছে। লোকটির পরিবারকে জানালাম তারা আসলো তারপর আমি যখন চলে আসবো ঠিক তখন দেখি সাবিনা আমার পিছু নিচ্ছে....আমাকে ডাক দিলো...
.
-এই যে শুনুন...
.
-জ্বি..
.
-আপনি কি সিলেট যাবেন?..
.
-যাওয়ার কথা ছিল তো....
.
-আমি সিলেট যাবো...আমার ব্যাগ এবং মোবাইল সব বাসে রেখে এসেছি....
.
.
-একটা কাজ করুন..আমার মোবাইলটা নিয়ে বাসায় ইনফর্ম করুন...আর আমি সাভার থেকে আপনাকে একটি বাসে উঠিয়ে দিচ্ছি...টাকাটা পরে এক সময় দিয়েন.....
.
সাবিনা রাজি হয়ে গেল। তাকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে বিদায় দিলাম। কিন্তু খারাপ লাগছে খুব। যাক মেয়েটিকে বিয়ে না করতে পারলাম। বাসে কিছুক্ষণ কথা বলা হলো,সিএনজিতে ঘুরা হলো। হ্যা মাঝখানে দূর্ঘটনা কবলিত লোকটি ছিল। কিন্তু জার্নিটি খারাপ ছিল না। মনটা ভারি হয়ে আছে জানি এই মেয়ে আমায় স্বপ্নেও পছন্দ করবে না,যে মেয়ে রনবীরের ভক্ত সে আবার আমাকে..এই কথা ভাবতে ভাবতে আমার বাবাকে কল করে জানিয়ে দিলাম কাল পাত্রীকে  দেখতে যাবো না।
.
রাতে বাসায় পৌছালাম। ঠান্ডা লেগে মাথা ভার হয়ে আছে...
দেখি আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছে...
.
-হ্যালো..কে?..
.
-আমি সাবিনা...
.
-হ্যা বলুন...
.
-আসলে বাবার ফোন থেকে নাম্বারটি নিয়েছি...আপনার একটা বিকাশ নাম্বার দিন আমি টাকাটা পাঠিয়ে দিবো কাল..
.
-আমার এই নাম্বারটায় বিকাশ নাম্বার...
.
-ওকে...আচ্ছা শামীম... আমাকে কাল সত্যিই দেখতে আসবেন না?....
.
-মানে!?....
.
-শুনুন ডিজিটাল যুগ রানিং...পাত্রের ছবি ফেসবুক আর হয়াটস এ্যাপেই পাওয়া

যায়
তারমানে?
হ্যা আমি জানতাম আপনিই সেই    পাত্র -তাই একটু বাজিয়ে দেখলাম,না কেন করলেন আমায়?পছন্দ হয়নি বা আমি কি দেখতে সুন্দরী নই?
আপনার তো সিক্স প্যাক পছন্দ পেটুক না.....

ওলেরে এখনো রাগ করে আছে মটু?
প্রথমে ভেবেছিলাম অপমান করে দিয়ে আপনাকে আগেই ভাগিয়ে দিবো,কিন্তু যে ছেলে নিজের জীবনের কথা চিন্তা না করে পরের জীবন বাঁচায় সে যে আমার কতটা যত্ব নিবে তা বুঝে গেছি,তাই রনবীর বাদ,মটু দরকার আমার...জানেন আমি খুব ভালো রান্না করতে পারি,আপনার তো আবার বিধাতা পদত্ত রুচি শক্তি অনেক

-হাহাহাহাহা

সাবিনার সাথে তো কথা বল মজাই লাগছে,আজ রাত ওর সাথে কথা বলেই কেটে যাবে ভেবেছিলাম কিন্তু সে তার বাবার ফোন থেকে কল করেছে,আমার আর সহৃ হচ্ছে না,কাল ভোরেই সিলেটের বাসে উঠবো।


মন্তব্য