kalerkantho


স্টেথোস্কোপের মাথা

অপরিচিত অপু   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০৯:২৩



স্টেথোস্কোপের মাথা

অনুপমার সাথে যে দিন নীলক্ষেতে স্টেথোস্কোপ কিনতে গিয়েছিলাম, সেদিন ও গোলাপি রংয়ের লিপস্টিকে ঠোঁট রাঙিয়েছিল। অপ্সরীর মতো লাগছিল ওকে।

প্রশংসা করতে চেয়েও ওকে রাগানোর জন্য বলেছিলাম, "মাথার স্কার্ফটা বাদামি না হয়ে কালো হলে আরো বেশি সুন্দরী লাগত"। ওকে আরো রাগানোর জন্য, অন্য একটি অ্যাপ্রন পরা মেয়ের দিকে index finger দেয়ে ইশারা করে বলেছিলাম, "দেখছ, তোমার চেয়েও কিউট মেয়েটা"। অতঃপর যা হবার তাই। পাগলীটার মাথার সব রাগ ওর ডান পায়ের গোড়ালি দিয়ে আছড়ে পড়েছিল আমার বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে। দাঁতে দাঁত কামড়ে মাটিতে বসে পড়েছিলাম। উঠে দেখি অপরিচিত মুখগুলোর জনসমুদ্রে হারিয়ে গেছে আমার অনুপমা।

অভিমানী লুকোচুরিতে তাকে খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না জেনেও পাক্কা আড়াই ঘণ্টা বইয়ের দোকানের আনাচে-কানাচে খুঁজেও দেখা পেয়েছিলাম না তার। পরে তাকে আবিষ্কার করেছিলাম রাস্তার পাশের ভেলপুরির দোকানে। গোগ্রাসে সাবাড় করছিল ওর অতীব পছন্দের ভেলপুরি।

কপালের ঘাম আর দুই পায়ের জড়তা নিয়ে ওর পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, "দুঃখিত মহারানি, আর কখনোই এমন করব না। " ভুবনজয়ী একটি হাসি দিয়ে তখন অনুপমা বলেছিল, "তবে ইয়্যা ব্বড় একটা হাঁ কর। " বোকার মতো না বুঝেই হাঁ করেছিলাম, অমনি একটা ভেলপুরি মুখে ঢুকিয়ে দিয়ে খিলখিলিয়ে হেসে উঠেছিল আমার "Laughing Angel". সেই হাসিটা এখনও
আমার টিমপেনিক মেমব্রেন এ অনুরণন জাগায়।

স্টেথোস্কোপ কিনতে দোকানে যাবার পর, ও পছন্দ করতে শুরু করল। এইটা না অইটা, অইটা না ঐঈটা করতে করতে অনেক সময় পেরিয়ে গেল। শেষমেশ বেগুনি টিউবওয়ালা MDF এর একটা স্টেথোস্কোপ ওর পছন্দ হলো। তারপর আমাকে বলেছিল, "আও মেরে রাজা, ম্যাঁ তেরে দিলকি ধাড়কান শুননা চাহ তি হু। " তারপর ইয়ারপিসটা কানে লাগিয়ে স্টেথোস্কোপের ডায়াফ্রাম চেপে ধরেছিল আমার বুকের বামপাশের 5th intercostal space এ। চোখ বন্ধ করে পরম তৃপ্তির সাথে শুনতে ছিল আমার হৃৎস্পন্দন। তারপর হঠাৎ করে চোখ খুলল আমার অগ্নিনয়না। ভ্রু কুঁচকে চোখ ওপরে তুলে তাকাল আমার চোখের দিকে। সারা মুখে ওর ততক্ষণে অমাবস্যা লেগে গিয়েছিল। তারপর আবার সজোরে ডায়াফ্রামটা চেপে ধরেছিল আমার 2nd intercostal space. আর আমি মৃদু চিৎকার করে বলেছিলাম, " আমার পেকটোরালিস!" 

মুখ খুললো অনুপমা, "কই, কোথাও তো আমার নাম শোনা যাচ্ছে না! কেন, এমন কেন? এমন হলো কেন?'' দোকানদার এতক্ষণে ভ্যাবাচ্যাকা। আমি বলেছিলাম, "আরে ধুর। আমি কি তোমাকে ভালোবাসি নাকি? যে আমার হৃদয় অনুপমা, অনুপমা করবে। আমি তো ভালোবাসি পাশের বাসার সুন্দরী আন্টির সুন্দরী মেয়েটাকে।
স্টেথোস্কোপটা আবার ধরো, শুনতে পাবে, আমার হৃদয় শুধুই রিমা, রিমা বলে ডাকছে। " এবার ও যা হবার তাই হলো। আমার নিচের ঠোঁটটা ফেটে রক্ত বের হচ্ছিল একটু একটু করে। কিলটা জোরে দিতে চেয়েও আস্তে দিয়েছিল সে। না হলে, আমি ততক্ষণে 'ফোকলা খোকন' হয়ে যেতাম। তারপর সে ব্যাগ থেকে দু-তিনটা টিস্যু বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। তারপর স্টেথোস্কোপের মাথা খুলে নিয়ে হাঁটা শুরু করেছিল অনুপমা। দু পা এগিয়ে, থেমে, আবার এক পা পিছিয়ে রাগত কান্না মিশানো কণ্ঠে বলেছিল, "স্টেথোর বিলটা দিয়ে, রাবার টিউব আর ইয়ারপিসটা নিয়ে সোজা বাসায় চলে যাও। যদি বেঁচে থাকি আর রাগ কমে তবে দুই সপ্তাহ পর ফেরত পাবা। "

তারপর টানা তিন দিন পাগলীটা কোনো ফোন করেনি, smsও দেয়নি। আর ফোন রিসিভ তো দূরের কথা। ফোন দিলে দু-তিনবার রিং হবার পর সুইচ অফ।  

শেষমেশ আন্টিকে ফোন দিয়ে জানতে পেরেছিলাম যে, সে নাকি ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চ বাদ দিয়ে শুধু মাত্র ডিনারটা করে। তাও আবার রুম এ একা একা। বুঝতে পেরেছিলাম যুদ্ধের ডাক এসেছে। তাই তো গলায় 'আমি অনুতপ্ত' লিখা কার্ড ঝুলিয়ে ওর দোতলার জানালার নিচে দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ বৃষ্টি, তবুও ক্ষমা মিলেনি সেদিন। টানা দেড় ঘণ্টা বৃষ্টিস্নান করে যখন জ্বরে ভুগছিলাম তখন ও একটা ওষুধ এর বাক্সের মধ্যে চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছিল। চিঠিতে লিখা ছিল, "এবারের মতো মাফ করে
দিলাম। " তারপর sms দিলাম, "কাল ক্লাসে স্টেথোর মাথাটা নিয়ে এসো। " রিপ্লাই পেয়েছিলাম, "রাগ কমেছে, কিন্তু সপ্তাহ এখনো তো দুইটা পার হয় নাই। "

সেই দুই সপ্তাহ আজও পার হয় নাই। এখনো পাইনি আমার সেই স্টেথোস্কোপের মাথাটা। বার বছর পেরিয়ে গেছে তবুও দুই সপ্তাহ সময় শেষ হয়নি অনুপমার। জানি, হয়ত বা আর কোনোদিন ও হাতে পাব না স্টেথোস্কোপের সেই মাথা। আমার পাগলী গার্লফ্রেন্ডটা, এখন আর আমার গার্লফ্রেন্ড নেই।

সেই পাগলীটা এখন আমার বউ, আমার ঘরের লক্ষ্মী, আমার সন্তানের জননী, আমার জীবনের বাতিঘর, আর আমার পার্থিব স্বর্গ।

সেই স্টেথোস্কোপের মাথা আর মস্তকহীন স্টেথোস্কোপটা স্কচটেপ দিয়ে আমাদের বেডরুমের দুই দেয়ালে লাগানো রয়েছে। আর আমার কিন্তু এখন বারটা স্টেথোস্কোপ। আমার প্রতিটি জন্মদিনেই আমাকে একটি করে নতুন স্টেথোস্কোপ উপহার দেয় আমার অনুপমা।


মন্তব্য