kalerkantho


স্বাধীন পারভেজের গল্প 'আত্মজা'

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ২২:৪১



স্বাধীন পারভেজের গল্প 'আত্মজা'

 দৃষ্টিনন্দন বিশালাকৃতির ফটক অতিক্রম করার সময় মেয়েটা কি রকম যেন ইতস্তত করছিলো। শত প্রেমিক প্রেমিকার কোলাহলে মুখরিত এই পার্কটিতে জন্মদাতা বাবার সাথে প্রবেশ করতে একটুতো লজ্জা লাগবেই! বুদ্ধি করে আমি মেয়েকে সহজ হতে সাহায্য করি।

ওর মনোযোগ ঘোরাতে বিভিন্ন রকম গল্প বলতে থাকি, পার্কে বেড়ে ওঠা নানা প্রজাতির গাছ গাছালি সম্পর্কে বলতে থাকি। এভাবে কথা বলতে বলতে এক সময় আমরা বাপ বেটি একটা কংক্রিটে বাধানো বেঞ্চিতে বসে পড়ি।

    তারপর মেয়ের লাজুক দ্বিধাগ্রস্থ মুখপানে চেয়ে বলি- মা জননী, তুমি কি লজ্জা পাচ্ছো? দেখো, এখানে এই পার্কটিতে কত গাছ পালা বেড়ে উঠছে। পাখীরা বাসা বেঁধে থাকছে। গবাদী পশু গুলো ঘাস লতা পাতা খাচ্ছে। লেকের পরিস্কার পানিতে কত মাছ সাঁতার কেঁটে বেড়াচ্ছে। আমরা বাপ বেটি বেঞ্চিতে বসে বসে গল্প করছি, আবার এখানেই একটু আড়াল আবডাল খুজে পেয়ে অনেক ছেলে মেয়ে একে অন্যের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে থাকছে। কিছু বুঝলে? আসলে যার যা কাজ সে সেটাই করছে। যে যেমন চরিত্রের সে সেভাবেই সময় পার করছে এখানে।

    মেয়েটা মাথা নিচু করে বসে থাকে। হাতের নরম আঙ্গুলের ডগায় ওড়নার সুতা জড়াতে জড়াতে কাঁপা কণ্ঠে থেমে থেমে বলতে থাকে- আব্বু, আমি আসলে বুঝতে পারছিনা তুমি আমাকে এখানে কেন আনলে। কিছু বলতে চাইলে তো বাড়িতেই বলতে পারতে। অথবা আমার কলেজে বা তোমার দোকানে ডেকে নিতে পারতে, পার্কে কেন?।
    আমি একটু হেসে নিই। এতো বড় হয়ে গেছে মেয়েটা তবুও সে আমাকে খুব একটা বুঝে উঠতে পারেনা, এখনো। অবশ্য এতে ওরও খুব একটা দোষ নেই। তিন বছর বয়সের ছোট্ট মেয়েটিকে তার মায়ের কোলে রেখে জীবিকার খোঁজে বিদেশ গিয়েছিলাম আমি, আজ থেকে ষোল বছর আগে। ন‘বছর পরে ফিরেও এসেছিলাম স্বদেশে। মেয়েটা তখন হাই স্কুলে পড়ছে। একমাত্র মেয়ের মুখচেয়ে ভেবেছিলাম আর প্রবাসে ফিরবোনা। কিন্তু ভাগ্য আমাকে মুক্তি দেয়নি। রাজনৈতীক জটিলতায় জড়িয়ে প্রবল অনিচ্ছা থাকা সত্বেও আট মাসের মাথায় আবার দেশ ছাড়তে হয়েছিলো আমাকে। তিন বছর বাদে ফিরেও এসেছিলাম একেবারে। কিন্তু ততদিনে মেয়ে আমার অনেক বড় হয়ে গেছে। আর দুরেও সরে গেছে বাবার কাছ থেকে, অনেকটা। ওরই বা দোষ কি? নিজের শৈশব কৈশরে প্রয়োজনের সময়টা তে বাবাকে কাছে পায়নি। তাই এই বেলাতেও বাবার খুব একটা ঘনিষ্ঠ হতে পারছিলোনা। এভাবেই ও মেট্রিক পাশ করলো এবং কলেজেও ভর্তি হলো। আর মেয়ের নামে আমি খুলে বসলাম ট্রান্সপোর্ট ব্যাবসা।

    -দেখো আম্মু, তোমাকে কিছু জিনিষ দেখাতে এবং বোঝাতে এখানে নিয়ে এসেছি আমি। লজ্জা পেওনা, চারপাশটা দেখো। এখানকার ছেলে মেয়েরা আসলে কি করছে সেটা বোঝার চেষ্টা করো। তোমাকে একটা কথা বলি, এই যে এখানে  যাদেরকে তুমি দেখতে পাচ্ছো তারা প্রত্যেকেই কিন্তু নিজের সঙ্গীকে ভালোবাসে এবং ভবিষ্যতে বিয়ে করবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই এখানে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। তুমি এদের নাম পরিচয় নোট করে রাখো, পাঁচ বছর পরে খোঁজ নিয়ে দেখবে এদের মাত্র পাঁচ শতাংশকেও তুমি পরস্পরের স্বামী-স্ত্রী রুপে পাবেনা। তাহলে বুঝতে পারছো এই প্রতিশ্রুতি গুলো কতটা মামুলি, ঠুনকো?
    আরেকটা বেশ মজার ব্যাপার হলো এই এক্ষুনি তুমি কাজী নিয়ে এখানকার যুগল গুলোকে বিয়ে দিতে চাও, দেখবে প্রায় সব গুলো ছেলে মেয়েই নানা অজুহাতে দৌড়ে পালাবে। কেউ কাউকে বিয়ে করতে চাইবেনা। তাহলে বুঝে নাও এদের মধ্যকার তথাকথিত ভালোবাসাটা আসলে কতটা মিথ্যে, বানোয়াট!
    এই যে এই ছেলে মেয়ে দু‘টিকে দেখো!
    আমাদের সামনেই ডান দিকে গাছের নিচে জড়াজড়ি করে বসে থাকা যুবক যুবতীকে ইঙ্গিত করে মেয়েকে দেখাই। যেখানে ছেলেটা দু‘জনের যুগল ছবি মোবাইলে ক্যামেরা বন্দি করতে চাইছিলো কিন্তু মেয়েটা তাতে ভিষন রেগে গিয়েছিলো। এমনকি বেশ জোরে জোরে বলছিলো- এসব কি, তুমি ছবি তুলছো কেন? কাকে দেখাতে ছবি তুলছো? আমার এসব একদম ভালো লাগেনা। আজকাল এরকম ছবি দিয়ে অনেক ঝামেলাও হয়ে থাকে। আর, আমি চাচ্ছিনা এখনই তোমার কাছে আমার কোন ছবি টবি থাকুক। প্লিজ স্টপ ইট।
    মেয়ের হাত ধরে একটু নাড়া দিয়ে বলি- দেখেছো বুড়ি, এদের একে অন্যের প্রতি কতটুকু বিশ্বাস! আড়ালে আবডালে নিজের শরীরটা সপে দিচ্ছে, কিন্তু প্রকাশ্যে দেখানোর মত একটা যুগল ছবি তোলারও আস্থা পাচ্ছেনা। কি বলবে তুমি এগুলোকে? ভালোবাসা?।

    কথার ভেতর একটা ছোট্ট বিরতি দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি আমি। তারপর নরম সুরে বলতে শুরু করি- দেখো আম্মু, বিয়ের আগে তোমার মা‘কে নিয়ে আমি একবারও পার্কে আসিনি। তার কাছ থেকে গোপনে কোন কিছু পেতে এখানে সেখানে আড়াল আবডাল খুজে বেড়াইনি। কিন্তু বিয়ের পর প্রায় তেইশ বছর এক সাথে সংসার করছি। তোমার কি মনে হয় আমরা একে অপরকে ভালোবাসছিনা? অবশ্যই বাসি!। বরং যুবক বয়সে আমার যেসব বন্ধু বান্ধবীরা নিজেদের মধ্যে প্রেম পিরিত করতো, তারা কিন্তু কেউ কাউকে বিয়ে করেনি। উল্টা এখন এই মধ্য বয়সে এসে তারা একে অপরকে দোষারোপও করে, নিজেদের জীবন নষ্ট করার দায় দিয়ে।
    আসলে কি জানো মা, প্রেম এমন একটা সম্পর্ক যার মাধ্যমে ছেলে মেয়েরা স্বীকার করে নেয় যে তারা কোন রকম স্বীকৃতি ছাড়াই কেবল ভালোলাগার অজুহাতে নিজেদেরকে সপে দিতে পারে। তো জেনে শুনে এরকম খোলামেলা চরিত্রের মানুষকে বিশ্বাস করবে কে? তাই আমরা নিজেদের প্রেমিক প্রেমিকাকে বিয়ে করিনা। আবার অতীতে অন্যের প্রেমিক বা প্রেমিকা ছিলো এরকম কাউকেও নিজের জীবন সঙ্গী হিসাবে মানতে চাইনা। প্রেমের প্রতি এতোটাই প্রকাশ্য ঘৃনা আমাদের! অথচ চরম আশ্চর্যের বিষয় হলো এতোসব কিছু জেনেও আমরা প্রেম করি। অন্যায় জেনেও নিজেদের কুপ্রবৃত্তির মোহ ত্যাগ করতে পারিনা। এতোটাই দুর্বল ব্যাক্তিত্ব আমাদের এই প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের!

    গড়গড় করে কথাগুলো বলে মেয়ের দিকে ফিরে তাকাতেই চমকে উঠি আমি!
    সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে!
    অপ্রস্তুত হয়ে আমি তার চিবুক ধরে নেড়ে আদর করতে যাই। আর অমনি হুরমুর করে আমার বুকে এসে পড়ে সে। গুঙ্গিয়ে গুঙ্গিয়ে বলতে থাকে- আব্বু আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারিনি। আমাকে তুমি মাফ করে দাও! আর কক্ষনো আমি এরকমটি করবোনা। ঐ ছেলের সাথে আমি আর কোনও যোগাযোগই রাখবোনা। কারো সাথে কোনদিন পার্কেও আসবোনা। কোনদিনই না। আসলে আমার খুব একা একা লাগতো, তাই না বুঝে ভুল করে...। আর এরকম হবেনা আব্বু, এখন থেকে আমি আমার মনের সব কথা তোমার সাথেই শেয়ার করবো। মেয়েকে এতাটা ভালোবাসে, এরকম যত্ন করে কাছে টেনে নিয়ে ভালো মন্দ বোঝায়, এমন বাবা ক‘জন মেয়ের ভাগ্যে জোটে বলো? আমিও তোমাকে ভালোবাসি আব্বু। কিন্তু আগে বুঝতে পারিনি, তাই বলতেও পারিনি। আমাকে তুমি মাফ করে দাও আব্বুগো! আমি আর পার্কে আসবোনা।
    
    বহু বছর পরে আবার আমার পুরুষ চোখেও অশ্রু ঝরে। অবুঝের মতো মেয়েকে চুমু খেতে থাকি। মেয়ের গালের সাথে গাল মিলিয়ে দিয়ে আহলাদ করে ঢুলতে থাকি আর গুমগুম কণ্ঠে বলি- কেন পার্কে আসবেনা মা সোনা? আসবে তো। বাপের সাথে আসবে। আজকের মতো....

 


মন্তব্য