kalerkantho


ম্যান বুকার পেলেন আনা বার্নস

দুলাল আল মনসুর

১৯ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০




ম্যান বুকার পেলেন আনা বার্নস

২০১৮ সালের ম্যান বুকার পুরস্কার পেলেন উত্তর আয়ারল্যান্ডের কথাসাহিত্যিক আনা বার্নস। বার্নসের পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাসের নাম ‘মিল্কম্যান’। এ উপন্যাসের পটভূমি তৈরি হয়েছে ১৯৭০-এর দশকের উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আবহে। গোত্ররেষ, রাষ্ট্রচালিত সন্ত্রাস, সামাজিক বিভাজন, রাজনৈতিক ও যৌন নির্যাতনের মতো বিষয় নিয়ে তৈরি হয়েছে এ উপন্যাস। বুকারের বিচারকরা মনে করেন, এ উপন্যাসটিতে ভয়াবহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বিষণ্ন রসের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়েছে।

উত্তর আয়ারল্যান্ডের প্রথম লেখক হিসেবে আনা বার্নস পেলেন ম্যান বুকার পুরস্কার। তাঁর আগে আয়ারল্যান্ডের জন বানভিল, এন অ্যানরাইট ও রডি ডোয়েল বুকার পুরস্কার পান। ২০১৩ সালের পর তিনিই প্রথম নারী লেখক এই পুরস্কার পেলেন। সে বছর এলিনর ক্যাটন ২৮ বছর বয়সে তাঁর ‘দ্য লুমিনারিস’-এর জন্য বুকার পেয়েছিলেন। উত্তর আয়ারল্যান্ডের দ্বন্দ্বমুখর উত্তপ্ত সময়ের পটভূমিতে ১৮ বছরের এক বালিকার অভিজ্ঞতায় এক ধরনের যৌন হয়রানির বিষয় নিয়ে লেখা হয়েছে এ উপন্যাস। ‘মিল্কম্যান’ আনা বার্নসের তৃতীয় উপন্যাস। উপন্যাসের বয়ানের দায়িত্ব পালন করে প্রধান চরিত্র, যার ব্যক্তিগত নাম নেই; তবে তাকে ‘মিডল সিস্টার’ বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। বিচারকদের প্রধান কুয়ামে অ্যান্টনি আপিয়াহ উপন্যাসটিকে ‘অবিশ্বাস্য রকমের মৌলিক’ বলেছেন।

পুরস্কার ঘোষিত হওয়ার মুহূর্তে আনা বার্নস বাগ্রুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরে প্রেস কনফারেন্সে তিনি বলেন, তাঁর লেখার কাজটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ। চরিত্ররাই তাঁকে নিজেদের গল্প বলবে, সে জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০০১ সালে উপন্যাস ‘নো বোনস’ উইনিফ্রেড হল্টবি মেমোরিয়াল পুরস্কার পায়; বছরের শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক উপন্যাসের মর্যাদা দেয় যুক্তরাজ্যের রয়াল সোসাইটি অব লিটারেচার। সেই উপন্যাসটি ২০০২ সালে অরেঞ্জ প্রাইজের তালিকায়ও স্থান পায়। সুতরাং ‘মিল্কম্যান’ নিয়ে এত দূর আসতে বেশ দীর্ঘ সময় পার করেছেন তিনি।

‘মিল্কম্যান’ উপন্যাসে চরিত্রদের নাম ব্যবহার করা হয়নি। একজনের সঙ্গে আরেকজনের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে হয়তো কারো নাম হতে পারে। যেমন—মিল্কম্যানের নাম ‘হতে পারে ছেলেবন্ধু’; সমাজে কারো অবস্থান অনুসারেও কারো নাম হতে পারে। যেমন—‘যে লোকটা কাউকে ভালোবাসেনি’। কিংবা ‘ট্যাবলেট মেয়েরা’। আনা বার্নস বলেন, ‘চরিত্ররা আমার কাছে এসে তাদের গল্প বলে। তাদের ওপর আমার খুব একটা নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আমি তাদের কথার রেকর্ড রাখি। যদি কখনো রেকর্ড না রাখি তাহলে তারা অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে থাকে না। সুতরাং রেকর্ড করেই রাখি।’

উপন্যাসটির সহজ পঠনে কারো কারো কাছে আপাত বিরক্তিকর মনে হতে পারে চরিত্রদের ব্যক্তিগত নাম ব্যবহার না করার এ কৌশলটি। চরিত্রদের সুস্পষ্ট অবয়ব দাঁড় করানোর জন্য, তাদের পরিবর্তিত চেহারার চিত্রকল্প দাঁড় করানোর জন্য হয়তো কারো কাছে এ কৌশলটি বিড়ম্বনার মতো মনে হতে পারে। তবে এটিকে আবার একটি সহায়ক কৌশল হিসেবেও গণ্য করা যেতে পারে : বর্ণনাকারীর নিজের শহর বেলফাস্টের ওই সময়ের আবহ যথাযথ তুলে ধরার জন্য এ রকম একটা আবছা আবরণ তৈরি করেছেন ঔপন্যাসিক। এ প্রসঙ্গে বার্নস নিজে বলেন, ‘নাম ব্যবহার করলে কেমন বেমানান লাগে। উপন্যাসের আবহ ও শক্তি যেন কমে যায়; মনে হয়, নাম ব্যবহার করলে এটা অন্য একটা বই হতো। আগে আমি কয়েকবার নাম ব্যবহার করে দেখেছি; কিন্তু বইটা সফল হতে পারেনি। আখ্যান ভারী হয়ে যায়, প্রাণহীন হয়ে যায়। মনে হতো, নাম বাতিল না করা পর্যন্ত সামনে এগোতে পারছে না। মাঝে মাঝে মনে হতো, বইটা নিজেই চরিত্রদের বাইরে ফেলে দিচ্ছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, উপন্যাসটির সময় এবং চরিত্রদের সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানের সঙ্গে নাম ব্যবহারের বিষয়টি মানানসই হয় না বলেই লেখক এমন কৌশল অবলম্বন করেছেন।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের একটা প্রিয় অভ্যাস হলো, যেখানেই যাক, সে হাঁটতে হাঁটতে বই পড়ে। বেনামি যে শহরে তার বাস, মানে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে, সেখান থেকে নিজেকে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা তার। উদ্দেশ্য : অসহ্য পরিবেশ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এক পক্ষের মানুষ আরেক পক্ষকে আক্রমণ করছে; এক দিকের মানুষ অন্যদের ওপর কড়া নজর রাখছে তাদের গতিবিধি লক্ষ করার জন্য; চারদিকে কঠোর আইন। এ রকম সামাজিক উত্তপ্ত অবস্থা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার জন্য সে উপন্যাসে ডুবে থাকতে চায়, বিশেষ করে উনিশ শতকের উপন্যাসে। কিন্তু সে নিজেকে চারপাশের জগত্ থেকে আড়াল করে রাখতে পারে না। একদিন চলার পথে খেয়াল করে, তার সঙ্গে গায়ে পড়ে আলাপ জমাতে আসছে একজন লোক; সমাজে তার পরিচয় আছে মিল্কম্যান নামে। আর সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, প্যারামিলিটারি গ্রুপের সঙ্গে লোকটার যোগাযোগ আছে বলে জানে সবাই। তার পর থেকেই চারপাশের মানুষের চোখে সন্দেহ জাগতে থাকে তাকে ঘিরে। মিল্কম্যান এবং তাকে নিয়ে কল্পনাচর্চা শুরু হয়ে যায়।

‘মিল্কম্যান’ উপন্যাসের চিত্র আসলে দেখায়, জীবনের স্বাভাবিক বিষয় চাপের নিচে কী অবস্থায় পতিত হয়। নিষ্ঠুর, নির্বোধ ও অন্ধকার আবহে মানুষের স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা তাদের মনের ভেতর কেমন টানাপড়েন তৈরি করে, সেটাই দেখানো হয়েছে এখানে। এ উপন্যাসের উপস্থাপনা পাঠককে সহজে পাত্র-পাত্রীদের নিকটে পৌঁছে দেয়। তাদের অবস্থা নিজের মধ্যে অনুভব করতে পারে পাঠক। উপন্যাসের কথকের পরিবার, সমাজ এবং বন্ধুজন যারা আছে, তারা সবাই তাকে এক বিশেষ ধরনের ব্যক্তি হিসেবে দেখে। কারণ একটাই : তার জীবনের সঙ্গে অযাচিতভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে একটা ঘৃণ্য বদমাশ ধরনের মানুষ। এই বিষাক্ত আবহ থেকে মুক্তি পাওয়াই একমাত্র আরাধ্য বিষয় তার।

আনা বার্নস এ উপন্যাসে যতটা ইতিহাস এনেছেন, তার চেয়ে বেশি এনেছেন মনস্তত্ত্ব ও সমাজতত্ত্ব। এখানকার চরিত্ররা যেকোনো জায়গার চরিত্র হতে পারে। আসলে বেলফাস্টের পটভূমিতে আনা বার্নসের এ উপন্যাসের কাহিনি গড়ে উঠলেও এটা আসলে সব জায়গার জন্যই উপযুক্ত। এখানকার সমাজের পরিসরে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে তলস্তয়, শেখভ কিংবা তুর্গেনেভের জগতের ছায়া দেখা যায়।

আনা বার্নসের জন্ম ১৯৬২ সালে আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে। ১৯৮৭ সালে তিনি লন্ডনে আসেন। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নো বোনস’ তৈরি করেছেন বিশ শতকের শেষের দিকের উত্তর আয়ারল্যান্ডের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা একটা মেয়ের কাহিনি নিয়ে। আয়ারল্যান্ডের যেসব উপন্যাসে সে সময়ের উত্তপ্ত অবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে সেগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘নো বোনস’। বেলফাস্টের মানুষদের প্রাত্যহিক জীবনের ভাষা ব্যবহারের দিক থেকে তাঁর এই উপন্যাসটিকে জেমস জয়েসের ‘ডাবলিনার্স’-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়।

 



মন্তব্য