kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

স্বপ্ন ও চিন্তার অবাধ আনাগোনা ট্রান্সট্রোমারের কবিতায়

দুলাল আল মনসুর   

১৯ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



স্বপ্ন ও চিন্তার অবাধ আনাগোনা ট্রান্সট্রোমারের কবিতায়

২০১১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান সুইডেনের কবি, মনস্তাত্ত্বিক ও অনুবাদক টমাস ট্রান্সট্রোমার। ট্রান্সট্রোমারকে স্ক্যান্ডিনেভীয় অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী কবিদের অন্যতম মনে করা হয়। পনেরোটির বেশি কবিতার বই প্রকাশ করেছেন। ষাটটির বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর লেখা।

টেক্সটের মধ্যে তাঁর বিশেষ পর্যায়ের ধারণা উপস্থাপন করার কারণে কঠিন, তবে ছাঁট দেওয়া শব্দের শৈলীতে ট্রান্সট্রোমার যে ভাষা ব্যবহার করেন, সেটি সহজে গ্রহণ করার মতো হলেও ভাষার স্বচ্ছতা ও ব্যাকরণগত অর্থোদ্ধার সহজ নয়। তাঁর কবিতা প্রায়ই পার্থিব সাধারণ পটভূমি ও কাজকর্মের বর্ণনা দিয়ে শুরু হয়। কিন্তু পরক্ষণেই কবিতায় চলে আসে তাঁর প্রিয় বিষয় স্বপ্ন ও চিন্তার অনিয়ন্ত্রণযোগ্য আনাগোনা। এক মুহূর্তে তিনি স্বাভাবিক নিয়মের প্রতি মনোযোগী, পরের মুহূর্তেই দিক পরিবর্তন করে পরাবাস্তবতার দিকে চলে যান। তাঁর শেলি সম্পর্কে ২০১১ সালে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ কবি ডেভিড অর বলেন, ‘ট্রান্সট্রোমারের কবিতা মানেই সেখানে থাকবে জটিল সারল্যের চর্চা। নগণ্য ভাষাও লক্ষণীয় গভীরতা অর্জন করে তাঁর কবিতায়। প্রতিটি শব্দই যেন মিলিমিটারে পরিমাপ করে ব্যবহার করা হয়।’

১৯৭০-এর দশকে অন্য কবিরা তাঁর প্রতি অনুযোগ তোলেন তিনি নিজের যুগ থেকে দূরে সরে আছেন বলে। কারণ, তিনি তখন তাঁর সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিজের কবিতায় খোলাখুলিভাবে তুলে ধরেননি। তবে সত্যটা কিছুতেই ভুলে যাওয়ার মতো নয়। তাঁর কাজের অবস্থান ও পরিধি তো আধুনিক ও পরাবাস্তববাদের পরিমণ্ডলের বাইরে নয়। তাঁর কবিতার ভাষা ২০ শতকের কবিতার ভাষা। তাঁর আঁকা দৈনন্দিন জীবন ও প্রকৃতির আপাত-সহজ চিত্র আসলে তো চিরন্তন মানুষের সর্বজনীন অন্তরের মরমি চিত্র তুলে ধরে। 

উচ্চাকাঙ্ক্ষী পুরনো শৈলীর প্রকৃতিঘনিষ্ঠ কবিতা থেকে শেষের দিকে তাঁর কবিতায় জীবনের অন্ধকার বিষয়াদি এবং ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ আসতে থাকে। অজানাকে জানার এবং আয়ত্তে নিয়ে আসার কসরত ও প্রবল ইচ্ছা ব্যক্ত করা হয় তাঁর কবিতায়। ‘দি আউটপোস্ট’ কবিতায় তিনি উচ্চারণ করেন, ‘সৃষ্টি যেখানে নিজের নিয়মে চলে/আমি তেমনই একটা জায়গা।’ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইদানীং আমার কবিতার এখানে-ওখানে এ রকম ধর্মীয় ধারণাদি বারবার আসছে। বর্তমানের মধ্যে নিজের উপস্থিতি জানানো, বাস্তবতাকে ব্যবহার করা, বাস্তবতা থেকে অভিজ্ঞতা নেওয়া এবং বাস্তবতা থেকে কিছু একটা তৈরি করা—এ সবই আমার কাছে অর্থপূর্ণ।

ট্রান্সট্রোমার আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় পড়াশোনা করেন। ১৯৬০-এর দশকে রবার্ট ব্লাইয়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব তৈরি হয়। দুজনের মধ্যে পত্রবিনিময় চলে দীর্ঘদিন। রবার্ট ব্লাই ট্রান্সট্রোমারের কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ২০০১ সালে ট্রান্সট্রোমারের প্রকাশক বনিয়ার্স তাঁদের দুজনের চিঠিপত্রের সংকলন ‘এয়ারমেইল’ প্রকাশ করেন। ১৯৬৫ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ব্যক্তিগত এবং সমসাময়িক সাহিত্য নিয়ে তাঁদের মতামত প্রকাশ পেয়েছে ওই সব চিঠিতে। চিঠিগুলোতে তাঁদের অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের কথাও রয়েছে। অন্যদিকে ট্রান্সট্রোমারের নাম-যশ আরববিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সিরিয়ার কবি অ্যাডোনিস কবিতা পাঠের বিভিন্ন আসরে ট্রান্সট্রোমারকে সঙ্গ দেন।

১৯৯০ সালে মাত্র ৫৯ বছর বয়সে তিনি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। শরীরের ডান পাশ অবশ হয়ে যায় এবং তখনই তিনি বাকশক্তি হারান। তবে থেমে যাননি। আগের চেয়ে কম হলেও এই শতকের প্রথম দশকের কয়েক বছর পর্যন্ত তাঁর সৃষ্টি বহমান ছিল। কবি ট্রান্সট্রোমারের সঙ্গে সংগীতের নিবিড় সম্পর্ক দেখতে পাওয়া যায়। সারা জীবন তিনি কি-বোর্ড বাজিয়েছেন। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হওয়ার পর শুধু বাঁ হাত দিয়ে বাজিয়েছেন। এভাবে পিয়ানো বাজানো বেঁচে থাকার প্রয়াস বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মেয়ে কনসার্টে গান করেন এবং ট্রান্সট্রোমারের কবিতার ওপর ২০১১ সালে অ্যালবামও তৈরি করেছেন। জাঁ গার্রারেক, মরিস কার্কফ, ফ্রেডরিক জ্যাকবসনসহ আরো অনেক সংগীতজ্ঞ তাঁর কবিতায় সুর দিয়ে গান তৈরি করেছেন।

ট্রান্সট্রোমার নিজের দেশে জীবদ্দশায় জনপ্রিয় ছিলেন এবং এখনো জনপ্রিয়। তাঁকে সুইডেনের রবার্ট ফ্রস্ট বলা হয়। তাঁর কবিতার ব্যাপক অনুবাদের কারণে ইংরেজিভাষী পাঠক ও অন্যান্য ভাষার পাঠকদের কাছে তিনি সুপরিচিত, সুপঠিত।

 



মন্তব্য