kalerkantho


ইদুরছানার নতুন বাড়ি

নাসিমূল আহসান

৫ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



ইদুরছানার নতুন বাড়ি

অঙ্কন : মানব

এক ছিল ইঁদুরছানা। যেমন মিষ্টি, তেমন আদর আদর। থাকত বনের ধারে। ছোট্ট গর্তে। একা। ছোট্টবেলায় মা-বাবাকে হারিয়েছে। কোনো আত্মীয়ও নেই। তবু বেশ হাসিখুশি দিন ছিল ওর। সাতসকালে ঘুম ভাঙলে চারপাশে কী এক বিস্ময়কর পৃথিবী প্রতিদিন। বনের মধ্যে হাতি বন্ধু। কুমড়ো ফুলের নাচ। চড়ুই পাখির গান। নদী আর পাহাড়ের সঙ্গে আড্ডা।

কিন্তু হঠাত্ই বর্ষাকাল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। মেঘের গর্জন। হুট করে পানি ঢুকে পড়েছে ওর ছোট্ট বাড়িতে। কী মুশকিল! প্রিয় আশ্রয়টুকু না ছাড়লে আর চলছে না। ইঁদুরছানাকে বের হতে হবে নতুন বাড়ির সন্ধানে। মন মানছে না।

বৃষ্টি কিছুটা হালকা হলে ইঁদুরছানা নতুন বাড়ি খুঁজতে বের হলো। বনের মধ্যে দেখা মিলল, ছোট্ট মিষ্টি এক টিয়া পাখির। সে ভরাট গলায় ডাকল, ও ইঁদুর মামা, তুমি আমার ঘরে থেকে যাও। ইঁদুরছানা রাজি হয়ে গেল। কিন্তু টিয়ার ঘরে ঘুমিয়ে মোটেই মজা নেই। সারা রাত কী সব দুঃস্বপ্ন দেখল সে।

ভোর হতেই ইঁদুরছানা ছোট্ট টিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে ছুটল নতুন ঘরের খোঁজে। পথে দেখা মিলল হাতি বন্ধুর। হাতি বলল, তুই আমার কাঁধে উঠে বোস। আমি যেখানে যাব, তুই সেখানেই যাবি। তোর ঘোরাও হলো, থাকার জায়গাও মিলল। ইঁদুর তো মহাখুশি। কচুপাতা দিয়ে বানাল ছাতা। শুঁড় বেয়ে উঠল হাতির কাঁধে। কিন্তু কী বিপদ! দিন-রাত হাতির কাঁধে বসে থাকা ভারি যন্ত্রণার। এত দুলুনি হয়। উপায় না পেয়ে হাতি বন্ধুকেও বিদায় জানাতে হলো।

পরদিন আবার নতুন উদ্যমে নতুন বাড়ির খোঁজ। হাঁটতে হাঁটতে সারা। বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরিয়ে বনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছল সে। আর সেখানে সন্ধান মিলল ছিমছাম সুন্দর এক বাড়ির। শুধু কি বাড়ি? মিলে গেল ছোট ফায়ারপ্লেসও। ভেজা শরীর শুকানো যাবে ভেবেই ইঁদুরছানা আহ্লাদে আটখানা।

আগুন তো পোহানো হলো। ঘরের কোথায় কে আছে, এবার সেটি দেখার পালা। ভয়ে হাত-পা কাঁপছিল ইঁদুরছানার। ফায়ারপ্লেস থেকে একটু দূরে, ঘরের এক কোণে দেখা মিলল এক বৃদ্ধের। সাদা ধবধবে জামা আর গোলগাল চশমা পরা। টেবিলে ঝুঁকে কিছু একটা লিখছে সে। একটু এগিয়ে গিয়ে ইঁদুরছানা ওকে ডাকতে লাগল, ‘বুড়ো বন্ধু, ও বুড়ো বন্ধু! আমি ওই দূরের বন থেকে এসেছি। আমার থাকার জায়গা নেই। তুমি আমায় আশ্রয় দেবে? ছোট্ট ইঁদুরছানার আদুরে আবদার শুনে তিনি রাজি হয়ে গেলেন। ইঁদুরছানাকে হাতের মুঠোয় ধরে বুকশেলফে রাখলেন। এরপর নরম সুরে বললেন, তুমি এই বুকশেলফের মধ্যেই থাকবে। কিছু মজার মজার বই আছে, চাইলে পড়েও দেখতে পারো। কিন্তু খবরদার, বইয়ের পাতা কাটাকুটি করা যাবে না।

এসব কথা শুনে ইঁদুরছানা তো মহাখুশি। বইয়ের পাতা কাটাকুটি না করার শর্ত সে মেনে নিল। 

হ্যাঁ, বুকশেলফই হলো ইঁদুরছানার নতুন বাড়ি। বুড়ো ইঁদুরছানার জন্য নরম তুলতুলে বিছানা আর একটা ভীষণ সুন্দর টেবিল গড়ে দিলেন।

এখন সারা দিন, মাঝেমধ্যে ফায়ারপ্লেসে ওম নেওয়া আর চেয়ারে বসে বই পড়াই ইঁদুরছানার একমাত্র কাজ। ইদানীং বই পড়তে পড়তে ওর মনে হয়, বুকশেলফই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো বাড়ি। আর বই পড়া হলো সবচেয়ে সুখের কাজ।

 

(মিশেল ফ্রাইর গল্প অবলম্বনে)



মন্তব্য