kalerkantho


বাংলাদেশের হরিণ

অদ্ভুত সুন্দর এক প্রাণী হরিণ। বাংলাদেশেও হরিণের কয়েকটি জাতের বাস। এদের গল্পই তোমাদের শোনাবেন ইশতিয়াক হাসান

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বাংলাদেশের হরিণ

চিত্রা হরিণ ছবি : মনিরুল খান

হরিণ

কয়েক বছর আগের এক রাতের কথা। শুয়ে ছিলাম কাপ্তাইয়ের রাম পাহাড় বিট অফিসের একটা কামরায়। হঠাৎ উল্টো পাশের সীতা পাহাড়ের দিক থেকে ভেসে এলো একটা প্রাণীর তীক্ষ ডাক। বন বিভাগের চাকুরে মামা বললেন, সাম্বার ডাকছে। শিহরিত হলাম। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হরিণ এই সাম্বার। এ হরিণ লম্বায় ছয় ফুট আর উচ্চতায় চার ফুট হয়। শিং ৪০ ইঞ্চির মতো লম্বা। গায়ের রং গাঢ় ধূসর। তবে কাদা মাখা অবস্থায় কালচে দেখায়।

ছাড়া ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে এদের পাওয়া যায়। এদের দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। বিশেষ করে শিকারের কারণে সংখ্যায় অনেক কমে গিয়েছে। তবে সিলেট বিভাগের কয়েকটি বনে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি বনে এখনো আছে এরা। ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স নামের বন্য প্রাণী নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠন ক্যামেরা ট্র্যাপ ব্যবহার করে পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্বারদের বেশ কয়েকটি ছবি তুলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকার অনেক আদিবাসী গ্রামেই সাম্বারের শিং ঝুলতে দেখবে। আমি যেমন দেখেছিলাম সাজেকের এক বাড়িতে।

 

হরিণ

 

বা গাঢ় বাদামি, গায়ে সাদা সাদা ফোটার এই হরিণরাই তোমাদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত। বইয়ের পাতায়, টিভিতে আর চিড়িয়াখানায় এদের দেখেছ। বাঘ আর চিত্রা হরিণ নিয়ে গল্পও নিশ্চয় পড়েছ বিস্তর।

পছন্দের খাবার তালিকায় এক নম্বরে ঘাস। কচি গাছের পাতা কিংবা গুল্মেও আপত্তি নেই। সুন্দরবনের হরিণেরা কেওড়া, বাইন, গেওয়া, গর্জন প্রভৃতি গাছের চারা, পাতা, ছাল খায় মজা করে। বানর আর হনুমানরা কখনো কখনো গাছের পাতা, ডালপালা, ফল নিচে ফেলে দেয়। আর চিত্রা হরিণরা মহানন্দে তা খায়। অনেক সময়ই চিত্রা হরিণ পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে গাছের নিচের ডাল থেকে কচি পাতা ছিঁড়ে খায়। একেকটা চিত্রা হরিণ উচ্চতায় তিন ফুটের মতো হয়। পুরুষ হরিণের সুন্দর শিং গজায়। শিং সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ ইঞ্চি লম্বা হতে পারে। অবশ্য কোনো কোনো হরিণের শিং আরো বেশি লম্বাও হতে পারে। কখনো কখনো শিং পড়ে গিয়ে আবার গজায়। আবার কখনো দুটি হরিণ শিং দিয়ে তুমুল লড়াইয়ে মেতে ওঠে। এই লড়াইয়ে শিং ভেঙে এমনকি খসে পড়ার ঘটনাও ঘটে।

, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশে এই হরিণের দেখা মেলে। আবার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই হরিণ ছাড়া হয়েছে। বাংলাদেশে একসময় অনেক বনেই চিত্রল ছিল। কিন্তু এখন এদের দেখা মেলে মূলত সুন্দরবনে। সেখানে কখনো অনেক বড় বড় পালেও ঘুরে বেড়তে দেখা যায় এদের। কোনো কোনো দলে ১০০ হরিণও চোখে পড়ে। আবার নিঝুম দ্বীপেও ছাড়া হয়েছে চিত্রা হরিণ। এখন সেখানে আছে বেশ ভালো সংখ্যাতেই।

হরিণের সবচেয়ে বড় শত্রু বাঘ। কারণ সুন্দরবনের বাঘের প্রিয় খাবার যে এ হরিণ। অবশ্য চিত্রলরা খুব দ্রুত দৌড়াতে পারে। বাঘ আসার খবর আগেভাগে টের পেলে দেয় ভোঁ-দৌড়।

হরিণ কিন্তু দারুণ পোষ মানে। তবে চাইলেই যে কেউ এদের পুষতে পারে না। এ জন্য বন বিভাগের অনুমতি লাগে।

 

হরিণ

 

ছোট্ট এক বন সাতছড়ি। আর সাতছড়িতে ঘুরতে গিয়েই সেবার হঠাৎ রাস্তার পাশেই জঙ্গলের ধারে একটি জায়গা থেকে শুনতে পেলাম একটা প্রাণীর ডাক। আবার ডাকতেই বুঝে ফেললাম একটা মায়া হরিণ আশ্রয় নিয়েছে ওখানে। খুব সাবধানে কাছে গেলাম। ধীরে ধীরে ডাকটা আরো স্পষ্ট শুনতে পেলাম। যখন হরিণটা থেকে ১০-১২ ফুট দূরে এ সময় টের পেয়ে ফেলল প্রাণীটা। ঝোপ-জঙ্গল ভেঙে দৌড়। অবশ্য সেবার দেখতে না পেলেও চট্টগ্রামের বনে ঠিকই দেখেছি মায়া হরিণ।

গায়ের রং লালচে বাদামি। আকারে একটা বড় ছাগলের সমান। পুরুষ হরিণের শিং থাকে, আর ওগুলো ছয় ইঞ্চির মতো লম্বা। এরা ভোরে আর সন্ধ্যার দিকে তত্পর হয়ে ওঠে। এ সময় ঘাসসহ নানা ধরনের গুল্ম, লতাপাতা খায়। বনের ধারের বা বনের মাঝখানের ঘাসবহুল ফাঁকা জায়গা এদের ভারি প্রিয়।

পেলে কিংবা শিকারি প্রাণীর দেখা পেলে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। তাই এদের ইংরেজি নাম বার্কিং ডিয়ার। কেউ কেউ কাকর নামেও চেনে। সাধারণত বনে বাঘ বা চিতাবাঘ শিকারে বেরোলে সতর্ক সংকেত দিতে থাকে মায়া হরিণ। আর এতে সতর্ক হয়ে যায় অন্য প্রাণীগুলো। এমনকি বিখ্যাত মানুষখেকো বাঘ শিকারি কেনেথ এন্ডারসন তাঁর বইয়ে মায়া হরিণের ডাক শুনে সতর্ক হয়ে যাওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, চীন, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে এদের দেখা পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সিলেট বিভাগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রামের অনেক বনেই এরা এখনো আছে। এমনকি টাঙ্গাইলের মধুপুরের জঙ্গলেও অল্পবিস্তর এই হরিণের দেখা মেলে। সুন্দরবন চিত্রা হরিণের জন্য বিখ্যাত হলেও সেখানেও অল্প কিছু মায়া হরিণ আছে।

 

হরিণ

 

প্যারা হরিণের দেখা পাওয়া যেত সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম এমনকি সুন্দরবনেও। কিন্তু অনেক দিন এদের দেখা না পাওয়া যাওয়ায় মাঝখানে ভাবা হয়েছিল বাংলাদেশ থেকে বুঝি বা এরা বিলুপ্তই হয়ে গেছে। তার পরই খাগড়াছড়িতে এদের দেখা মেলে। পাবর্ত্য চট্টগ্রামের আরো কোথাও কোথাও এরা আছে—এমন খবরও মিলেছে।

ছাড়া এই হরিণের দেখা মেলে ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায়।

নাম হগ ডিয়ার। উচ্চতা সর্বোচ্চ আড়াই ফুট, ওজন ৫০ কেজি। পাগুলো তুলনামূলক ছোট।

 

 

 

সাম্বার হরিণ

প্যারা হরিণ

মায়া হরিণ

বারসিঙ্গা

 

খুব সুন্দর এক জাতের হরিণ। এদের আরেক নাম সোয়াম্প ডিয়ার। একসময় সুন্দরবনে ঘুরে বেড়াত এই বারসিঙ্গারা। এখন আর সুন্দরবনে নেই। নেই বাংলাদেশের কোথাও। এখনো আছে ভারত ও নেপালে। এই হরিণদের শিংগুলো ১০-১২টি মাথায় বিভক্ত। আর তাই এদের নাম বারসিঙ্গা। এরা বেশ বড় আকারের হরিণ। লম্বায় ছয় ফুটের মতো, আর কাঁধ পর্যন্ত সাড়ে তিন থেকে পৌনে চার ফুট। সাধারণত একদলে আট থেকে ২০টা বারসিঙ্গা থাকে। তবে কোনো কোনো দলে আরো বেশি সংখ্যায়ও থাকতে পারে।

 

হরিণ আছে ৬০ প্রজাতির বেশি।

ইয়াকুশিমা দ্বীপে বানরদের হরিণের পিঠে চড়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে দেখা যায়। বিনিময়ে বানররা হরিণের লোম পরিষ্কার করে এবং নিজেদের খাবারের ভাগ দেয়।

লাফে ১৫ ফুট পর্যন্ত পেরিয়ে যেতে পারে কোনো কোনো প্রজাতির হরিণ।

এখন যেসব হরিণ আছে, এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মুজ হরিণ। তবে একসময় দুনিয়ার বুকে বিচরণ করত এদের চেয়ে অনেক বড় অতিকায় আইরশ জায়ান্ট ডিয়ার। এদের শিংয়ের দৈর্ঘ্য বারো ফুট পর্যন্ত হতো।

হরিণের এমন একটি প্রজাতি আছে, যারা আগে কাঁটাতারের বেড়া ছিল—এমন একটি জায়গা কখনো অতিক্রম করে না। অথচ বিশ বছর আগেই ওই বেড়া তুলে ফেলা হয়েছে।

নিরামিষভোজী হলেও কোনো কোনো বিজ্ঞানীর ধারণা, এরা কখনো কখনো মাংস খায়। যেমন একজন স্কটিশ জীববিদ দাবি করেন, শিং গজানোর প্রয়োজনীয় প্রোটিনের জোগান পাওয়ার জন্য রেড ডিয়ার সামুদ্রিক পাখি খায়।

টেইলড বা সাদা লেজের হরিণদের লেজের ভেতরের অংশ সাদা। যখন বিপদের আশঙ্কা করে তখন ওই সাদা অংশটা দৃশ্যমান হয়।

মাদী বা স্ত্রী হরিণের শিং না থাকলেও মাদী বল্গা হরিণের শিং থাকে।



মন্তব্য