kalerkantho


গল্পে গল্পে বিজ্ঞান

সবুজ মেয়ে নাসরীন মুস্তাফা

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সবুজ মেয়ে নাসরীন মুস্তাফা

অঙ্কন : মানব

ভোরবেলা। ঘুম থেকে জেগে ওঠে সবাই। জানালার কাছে এসে তাকায় বাইরে। এখনো আলো ফোটেনি। তবে ফুটবে এখনই। খুব ভালো লাগছে সব কিছু! সবাই এখনই বেরিয়ে পড়বে। ঘরের বাইরে। দেখবে সব কিছু। জানাবে শুভ সকাল সবাইকে। সব কিছুকে।

ঠিক তাই। সবাই সবাইকে বলে, চলো! বাইরে যাই। শুভ সকাল জানাই সবাইকে। সব কিছুকে।

শুভ সকাল! শুভ সকাল! শুভ সকাল সবাইকে।  শুভ সকাল সব কিছুকে।

আর সেই সময় জেগে ওঠেন এক রাজা। নাম তাঁর রবিরাজ। নিচে তাকিয়ে দেখেন সবাইকে, সেই গ্রামটাকে। খুব ভালো লাগে তাঁর। বলেন, আজ আলো দিয়ে সাজিয়ে দেব। গ্রামটা সাজবে রবির আলোয়। কী মজা যে হবে!

এই না বলে, রাজা উঠলেন হেসে। রবিরাজের আলো ছড়িয়ে গেল সবখানে, সবখানে, সবখানে।

রাজার যে রানি, তাঁর নাম আকাশ। আকাশরানি। গ্রামটার ঠিক ওপরে ভাসছেন। রবিরাজের আলো দেখে একটু হাসেন। আবার একটু কাঁদেন।

রবিরাজ জানতে চান, রানি! তুমি একটু হাসো। আবার একটু কাঁদো যে! কেন, বলো তো?

আকাশরানি বলেন, রবিরাজ! আপনার আলো তো অনেক রকমের। কিছু আলো সবার ভালো করে। সেই আলোদের কথা ভেবে আমি হাসি। আর কিছু আলো যে বড় বেয়াড়া। ওরা যে কারোর ভালো চায় না। সেই কথা ভেবে আমি কাঁদি। আমি যে সবাইকে, সব কিছুকে বড় ভালোবাসি।

তাইতো! রবিরাজও কী কম ভালোবাসেন সবাইকে, সব কিছুকে! ভালোবাসেন বলেই তো আলো দিয়ে সাজাতে চেয়েছিলেন। কিছু আলো সবার ভালো করে। আর কিছু আলো যে বড় বেয়াড়া। ওরা যে কারোর ভালো চায় না।

রবিরাজ ফেরাতে চান আলোদের। বলেন, ফিরে আয় তোরা। ফিরে আয়!

ফেরে না আলোরা। একবার ছুটতে শুরু করলে থামতে পারে না ওরা। কোথাও পড়বে বলে ছোটে। ছোটে বেয়াড়া আলোরা। এদের অনেক রাগ। যেখানে পড়বে, সেখানে পুড়িয়ে দেবে।

ছোটে ভালো আলোরাও। এদের মনে ভালোবাসা। সবার কাছে যাবে। সব কিছুকে ছুঁয়ে দেবে। গ্রামটাতে যাবে। এই খুশিতে ছোটে এরা।

রবিরাজ ভেবে পান না কিছুই। ওই যে নিচে গ্রামটা! ওই যে ওখানে সবাই হাসছে। হাসতে হাসতে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। কী হবে এখন?

আকাশরানিও ভাবনায় পড়েন। কী হবে এখন?

 

রবিরাজ বলেন, আকাশরানি! তুমি আরো নিচে নামো। ছড়িয়ে দাও তোমার চাদর। বেয়াড়া আলোদের ঠেকিয়ে দাও। ওরা যেন সবার কাছে যেতে না পারে।

আকাশরানি বলেন, তবে তা-ই হবে। আমি নিচে নেমে যাব। ছড়িয়ে দেব চাদর আমার। বেয়াড়া আলোদের যেতে দেব না সবার কাছে। কিছুতেই না।

ঠিক তাই। আকাশরানি নেমে আসেন নিচে। ছড়িয়ে দেন তাঁর নীল চাদর। ঘিরে রাখেন গ্রামটাকে। ঘিরে রাখেন সবাইকে। ঘিরে রাখেন সব কিছুকে।

আর তখন, বেয়াড়া আলোরা পড়ে যায় ঝামেলায়। এরা আটকে যায় চাদরে। টুকরো টুকরো হয়ে মিশে যায়। চাদরের ভাঁজে ভাঁজে মিশে যায়। ভালো আলোদের ঝামেলা হয় না। এরা চাদর ভেদ করে নেমে যায় নিচে। যেতে থাকে। যেতে থাকে।

আকাশরানির চাদরের কোথাও কোথাও ছিল ফাঁক। একটু বড় ফাঁক। আর তাতেই বেয়াড়া আলোদের কিছু বেরিয়ে যায়। যেতে থাকে নিচে। যেতে থাকে।

 

আকাশরানি কেঁদে বলেন, এখন কী হবে!

রবিরাজও আছেন মহাভাবনায়। এখন কী হবে?

শুধু ভাবনায় নেই সবুজ মেয়ে। সবার সবুজ মেয়ে। সব গাছের পাতায় পাতায় নেচে বেড়ায়। হেসে বেড়ায়।

সেই সবুজ মেয়ে সবুজ চুল ছড়িয়ে দেয়। সব গাছের পাতায় পাতায় সবুজ মেয়ের সবুজ চুল। নেচে ওঠে। হেসে ওঠে।

এদিকে বেয়াড়া আলোরা চলে এসেছে নিচে। গ্রামের সবাইকে, সব কিছুকে বুঝিয়ে দেবে মজা।

ঝাঁপিয়ে পড়বে এখনই।

 

কিন্তু না, বেয়াড়া আলোরা মোটেও ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে না। কেননা বেয়াড়া আলোরা জড়িয়ে যায় সবুজ মেয়ের চুলে। সবুজ মেয়ে গপগপ করে খেয়ে নেয় আলোদের।

রবিরাজ হাঁফ ছাড়েন। বলেন, বাঁচা গেল। সবুজ মেয়ে, ধন্যবাদ তোমাকে। বলো, তুমি কী চাও?

আকাশরানিও হাসেন। বলেন, সবুজ মেয়ে আমার! বাঁচালে, বাছা! ধন্যবাদ তোমাকে। তুমি কী চাও, বলো?

সবুজ মেয়ে হাসে খিলখিল। বলে, আমি চাই ভালো আলোদের। ওদের পেলেই খুশি আমি। আর কিছু চাইনে।

ভালো আলোরা এসে গেছে। গ্রামটাতে এসে গেছে। সবার কাছে এসে গেছে। সব কিছুকে ছুঁয়ে দিতে এসে গেছে। মনের খুশিতে এরা ছড়িয়ে পড়ছে।

বেগুনি আলো বসে যায় বেগুনি রঙের ফুলে। ছড়িয়ে দেয় ভালোবাসা।

নীল আলো ছড়িয়ে পড়ে পানিতে। সে যে কী সুন্দর আলো! দেখলেই মন ভরে যায় সবার। নেচে ওঠে মাছেরা। গেয়ে ওঠে গান।

আসমানি আলো আকাশজুড়ে থাকে। আকাশরানির চাদর হয়ে থাকে। ভালোবাসা বিলিয়ে দেয় আকাশ থেকে।

সবুজ আলো সবুজ মেয়েটার জামা হয়। জমকালো সেই জামা দেখে অবাক সবাই। সব পশুপাখি চোখ বড় বড় করে দেখে। এত সবুজ ওরা আর কখনো দেখেনি যে!

সবুজ আলো ছড়িয়ে পড়ে সব গাছে। ছুটে যায় আকাশরানির চাদরের ফাঁকে। ঠিক করে দেয় ফাঁক। আর আসবে না বেয়াড়া আলোরা। আটকে যাবে ঠিক।

হলুদ আলো ছড়িয়ে পড়ে মাঠে মাঠে। হলদে ফুলে ভরে যায় মাঠ। দারুণ সুন্দর সে মাঠ। না দেখলে বিশ্বাসই হয় না।

কমলা আলো রবিরাজের মায়া নিয়ে এসেছিল। আকাশের এক কোণে বসে থাকে সে। ভোরবেলায় রবিরাজ আকাশে আসতেই জেগে ওঠে। আবার সাঁঝের বেলায় রবিরাজকে বিদায় জানায়। আকাশে ছড়িয়ে পড়ে কমলা রং।

লাল আলোটা ছড়িয়ে গেল গাছে গাছে। ফুলের বনে লালের মায়া। ফলের গায়ে লালের ছায়া। খুব সুন্দর।

সব রং মিলেমিশে সাজায় সবাইকে। সাজায় সব কিছুকে। আর তাই সবাই তাকায় রবিরাজের দিকে। তাকায় আকাশরানির দিকে। তাকায় সবুজ মেয়ের দিকেও। সবাই একসঙ্গে বলে ওঠে, সব কিছুর জন্য ধন্যবাদ।

সবাই একসঙ্গে বলে, শুভ সকাল!

রবিরাজ বলেন, শুভ সকাল।

আকাশরানি বলেন, শুভ সকাল।

সবুজ মেয়ে হাসে সবুজ হাসি। সব গাছের গায়ে লেগে যায় হাসি। সবুজ হাসি। বলে, শুভ সকাল। শুভ সকাল।  

 



মন্তব্য