kalerkantho


ফাইজা আর চড়ুই মশাই

রিদওয়ান আক্রাম

২৯ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ফাইজা আর চড়ুই মশাই

অঙ্কন : মানব

জানালা দিয়ে আকাশ দেখছিল ফাইজা। ঠিক আকাশ বললে ভুল হবে। আকাশে উড়তে থাকা বিমানটাকেই দেখছিল ও। এমন সময় বলা নেই কওয়া নেই, একটা চড়ুইপাখি সোজা এসে গোত্তা খেল ওর জানালায়। ধরাম! ব্যথাটা যে বেশ পেয়েছে বোঝা গেল। মাথা ঝাঁকিয়ে, ডান পাটাকে খানিকটা বাঁকিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হলো ওটা। ধপাস! না, ওটাকে সাহায্য করতেই হচ্ছে। কাচের জানালাটা খানিকটা খুলে চড়ুই পাখিটাকে ভেতরে ঢুকাল ফাইজা। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে কয়েক দিন বিশ্রাম নিতে হবে ছোট চড়ুইটাকে। শেষ পর্যন্ত ফাইজার ভাবনাই সত্যি হলো। কয়েক দিন বিশ্রাম নিয়ে দিব্যি সুস্থ-সবল হলো ওটা। ঘরের মধ্যে ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়াতে লাগল, বের হওয়ার কোনো নাম-গন্ধটি পর্যন্ত নেই। পুরো এক দিন তো উত্তরের জানালাটা খোলাই পড়ে রইল। তাতেও বিকার নেই ছোট পাখিটার। ওর জন্য ফ্যানও ছাড়া যাচ্ছে না। কখন না আবার ফ্যানের পাখা লেগে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যায়। এদিকে গরমও পড়ছে বেশ। শেষে একদিন তো রেগে গিয়ে চড়ুইবাবুকে বলেই বসল ফাইজা, ‘খুব

যে ঘরের ভেতরেই উড়ে বেড়াচ্ছ। তা তুমি বাইরে যাচ্ছ না কেন?’

‘আমি তো চলেই যেতে চাই। কিন্তু দুষ্টু বাজপাখিটার জন্যই তো বের হতে পারছি না। আমাকে খাওয়ার জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে যে। ঘর থেকে বের হলেই খপ করে ধরে ফেলবে। আর কয়েকটা দিন তোমার ঘরে থাকতে দাও না আমাকে।’

‘সে না হয় থাকলে, কিন্তু তার পরেও যদি বাজপাখিটা তোমাকে ধরার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, তাহলে?’

সত্যিই তো, ফাইজা তো ঠিকই বলেছে। বাজপাখিটা সত্যিই পাজির পা ঝাড়া। কয়েক দিন ধরে ফাইজার ঘরের জানালার পাশে রুটিন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু তাই নয়, তীক্ষ স্বরে চিৎকার করে নিজের উপস্থিতির জানানও দিচ্ছে। এসব দেখে ফাইজা মনে মনে বলল, ‘এভাবে তো বেশি দিন চলা যাবে না। এর একটা হেস্তন্যস্ত করতেই হচ্ছে।’

‘আচ্ছা চড়ুই মশাই, এখন তো তুমি বেশ সুস্থ। এক উড়ালে কি বাজপাখিকে পেছনে ফেলে পালিয়ে যেতে পারবে না?’

‘এটা কী বললে ফাইজা? এত বড় পাখির সঙ্গে আমার তুলনা চলে? ডানা দুটি মেলে দিলেই কত্ত বিশাল দেখায় ওকে। ওর সঙ্গে কি উড়ালের পাল্লা দেওয়া যাবে?’ এই বলে নিজের ছোট্ট দুটি ডানা মেলে দেখাল চড়ুই। 

‘ঠিকই বলেছ। এখন উপায়? এবার তুমি বরং আমাকে দু-একটা দিন সময় দাও। দেখি কোনো বুদ্ধি বের করা যায় কি না?’

এরপর কয়েক দিন ধরে ফাইজাকে বেশ ব্যস্ত দেখা গেল। স্কুলেও গেল না। নিজের ঘর থেকে বের হওয়াও বন্ধ করে দিল। দিনে কয়েকবার করে ঘরে উঁকিও দিয়ে গেলেন ওর মা-বাবা। কোনো অসুখ-বিসুখ করল না তো মেয়েটার?

‘কিরে ফাইজা, তোর পেটব্যথা করছে না তো? স্কুলে যাচ্ছিস না কেন রে?’

‘মা, আমি ঠিক আছি। একটা কাজ করছি। ওটা শেষ হয়ে গেলেই আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করব।’

সত্যিই বেশ ব্যস্ত সময় যাচ্ছে ফাইজার। নাওয়াখাওয়া ভুলে রংপেনসিল আর কাগজপত্র নিয়ে পড়ে থাকল অনেকটা সময় ধরে। হাতে-মুখে রং লেগে ওর অবস্থা হলো দেখার মতো। চড়ুই মশাই তো মনে মনে ভাবতে লাগল, ‘আহা, মেয়েটাকে কী বিপদের মধ্যেই না ফেলে দিলাম!’ শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে প্রশ্ন করেই বসল, ‘আচ্ছা ফাইজা, সব কিছু ছেড়ে কী নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছ?’

‘এসব নিয়ে তোমাকে আর চিন্তা করতে হবে না চড়ুই মশাই। তোমাকে শিগগিরই এই ঘর থেকে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। তুমি শুধু দেখে যাও। তবে তোমার কয়েকটা পালক লাগবে। একটু কষ্ট করে সেগুলোর একটা ব্যবস্থা তোমাকে করে দিতে হবে।’

সেটা কোনো সমস্যা নয় চড়ুইয়ের জন্য। মানুষের চুলের মতোই প্রত্যেক দিন কিছু না কিছু পালক নিজে থেকেই ঝরে যায় পাখিদের গা থেকে। চড়ুইয়ের ক্ষেত্রেও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা নিজের পালকগুলো ছোট ঠোঁটে করে এক জায়গায় জড়ো করল। সেসব নিয়ে ফাইজা আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এসব দেখে চড়ুইটা বাম পা দিয়ে নিজের মাথা খানিকটা চুলকে বলতে লাগল, ‘কী জানি বাপু মেয়েটা যে কী সব করছে? কিছুই তো বুঝতে পারছি না!’ আসলে একটা ফন্দি এসেছে ফাইজার মাথায়। গত বাণিজ্য মেলায় ঘুরতে গিয়েছিল মা-বাবার সঙ্গে। ওখান থেকে একটা খেলনা পাখি কিনেছিল। চমৎকার সেই পাখিটা। একদম সত্যিকারের পাখির মতোই পাখা ঝাপটে উড়তে পারে। ওটাকেই কয়েক দিন ধরে চড়ুই মশাইয়ের মতো করে সাজানোর কাজ করছে ফাইজা। চড়ুইয়ের ঝরে যাওয়া পালক, কাগজ আর রংপেনসিলের সাহায্যে খেলনা পাখিটা একটা চড়ুইপাখির মতোই দেখতে হলো। তবে নকল পাখির আকারটা চড়ুই মশাইয়ের চেয়ে একটু বড়ই হয়েছে। সেটা বোধ হয় তেমন একটা সমস্যা হবে না। দূর থেকে দুষ্টু বাজপাখিটা বুঝতেই পারবে না এটা যে নকল চড়ুই। চড়ুই মশাইও সায় দিল, ‘আরে করেছ কী, এটা দেখতে তো একদম আমারই মতো মনে হয়েছে। তোমার ফন্দিটা কি বলো তো?’

‘এখন তো রাত হয়ে গেছে। আমরা আগামীকাল সন্ধ্যার একটু আগে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজটা করব।’

এর পরের দিনের বিকেল পর্যন্ত সময়টা কাটল ওদের বেশ উত্তেজনায়। কী হবে কী হবে ভাবতে ভাবতে। উত্তরের জানালা খুলতেই বাজপাখিটাকে দেখা গেল আমগাছে বসে থাকতে। সত্যিই হাল ছাড়ার পাত্র নয় দুষ্টু পাখিটা। চড়ুই মশাইকে দিয়ে নিজের উদরপূর্তি করার পণ করেছে যেন ওটা।

দিনের আলো কমে আসতেই ফাইজা বলে উঠল, ‘ঠিক আছে চড়ুই মশাই, প্রস্তুত তো?’

‘প্রস্তুত।’

ফাইজা এবার নকল পাখিটি নিয়ে গায়ের জোরে ছুড়ে মারল খোলা জানালা বরাবর। নকল চড়ুইটা দিব্যি পাখা ঝাপটে উড়ে গেল বাইরে। দূর থেকে এটা দেখে বাজপাখিটাও খুশিতে আটখানা। আহা! কয়েক দিন ধরে কষ্ট করার ফলটা অবশেষে সে পেতে যাচ্ছে। আবছা আলোতে ও খেয়ালই করল না, চড়ুই পাখিটা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বড়। এত সব ভাবনাচিন্তা করার সময় কোথায় ওর? বিশাল দুই ডানা ঝাপটে ছুটে চলল নকল চড়ুইটাকে ধরতে। আর এই সুযোগে ফাইজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে চড়ুই মশাইও দিল অন্যদিকে ছুট। দ্রুত গতিতে ওটা উড়ে চলে গেল দুষ্টু বাজপাখির নাগালের অনেক বাইরে। আর বাজপাখিটা যখন বুঝতে পারল ওকে বোকা বানানো হয়েছে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। চড়ুই মশাই পৌঁছে গেছে নিজের বাড়িতে।



মন্তব্য