kalerkantho

ভূতের আয়না

জ্যোৎস²ালিপি

১ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ভূতের আয়না

অঙ্কন : মানব

খোকা মায়ের কাছে ধরেছে বায়না, কিনে দিতে হবে আয়না। এ কি আর যে সে আয়না! একেবারে ভূতের আয়না। নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হওয়ার জোগাড়। মায়ের কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর সারাক্ষণ—সকাল-দুপুর-রাত। মা এবার খোকনকে বলে—খোকনসোনা, রাগ করে না/তোমায় আমি দেব কিনে/মামদোভূতের ছানা/খোকন শুনে মাকে বলে/তা হবে না তা হবে না/আমায় দিতে হবে কিনে/ভূতের আয়না/কী আর করা খোকনের বায়না! কোথায় পাওয়া যাবে ভূতের আয়না!

মা গালে হাত দিয়ে বারান্দায় বসে ভাবতে থাকে। কী করা যায়! কী করা যায়! কোনো বুদ্ধি মাথায় আসে না। কিন্তু খোকনের যে বায়না! একটা বুদ্ধি তো বের করতেই হবে। হঠাৎ চোখ চলে যায় বারান্দার এক কোণে—যেখানটায় একটু আগেই খোকন বসে খেলছিল একটা খালি হওয়া পাউডারের কৌটা নিয়ে। মায়ের ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে ওঠে। এবার সে আলমারি থেকে নতুন একটা পাউডারের কৌটা বের করে এবং ঘুমিয়ে থাকা খোকনের বালিশের পাশে রাখে। তারপর মা ঘুমিয়ে পড়া খোকনকে পাউডার দিয়ে সাজিয়ে দেয়। মাটির প্রদীপে কাঁঠালপাতায় সরিষার তেল মেখে কাজল পেড়ে নেয়। সেটি দিয়েও খোকনকে সাজায়। খোকনের বড় বোন মিমি ভাইয়ের জন্য মেলা থেকে আলোজ্বলা দুটি খেলনা শিং কিনেছিল—সেটি এখন সে চুপি চুপি খোকনের মাথায় পরিয়ে দেয়। খোকন ঘুমের ঘোরে বলতে থাকে—ভূতের আয়না... ভূতের আয়না...।  সবাই প্রস্তুত থাকে বাজার থেকে কিনে আনা গোল আকৃতির আয়না নিয়ে। যে আয়নায় চেহারা কয়েক গুণ বড় দেখাবে। অলসতা ভেঙে খোকা ঘুম থেকে জাগে। জেগেই সেই বায়না—এবার সবার মুখে হাসি! চলে খোকনের বায়না। মিমি বলে—ভাই, ভূতের আয়না দেখে ভয় পাবে না তো? খোকন মাথা নেড়ে জানায়, ভয় পাবে না। মা বলে, ভয় পেলে কিন্তু ভূত রাগ করবে। খোকন বলল, সে ভয় তো পাবেই না, উল্টো ভূতকে কামড়ে দেবে। মা এবার আয়নাটা খোকনসোনার সামনে তুলে ধরে। খোকন আয়নার দিকে একবার তাকিয়ে চিত্কার করে মাকে জড়িয়ে ধরে।

মা বলে, কী হলো তোমার। মা, মা ভূত! ভূত! মা এবার বলে, তুমি তো বলেছিলে ভূতের আয়না নেবে। তাই তো ভূতের দেশ থেকে তোমার জন্য ভূতের আয়না এনে দিয়েছে তোমার বাবা।

না, না, আমি ভয় পাই। আমি ভূতের আয়না নেব না!

কোনো ভয় নেই বাবা, আর একবার তাকাও আয়নার দিকে।

না, না, আমি তাকাব না। ভূত আমাকে মারবে। মিমি এবার খোকনের একটা হাত ধরে বলে, এই আমার হাত ধরে চোখ খোলো, ভাই। দেখবে, কেউ তোমাকে মারবে না!

না, না, আমি চোখ খুলব না। ভূত দেখতে খুব পচা।

মা মুখ টিপে হাসে আর বলে—না, না, ভূত কত সুন্দর! কত আদরের! মা ভূতকে খুব ভালোবাসে। মিমি বলে, আমিও তাকে খুব ভালোবাসি। এর মধ্যে বাবা এসে বলে, আমিও ভূতকে খুব ভালোবাসি।

মা, তুমি পচা, বাবা তুমিও আর মিমিন তুমিও। মিমিকে খোকন মিমিন বলে ডাকে।

খুব অভিমান হয় খোকনের! শেষ পর্যন্ত তাকে বাদ দিয়ে আয়নার মধ্যে থাকা ভূতকে সবাই ভালোবাসবে! সেটি হবে না। খোকন বলে—মা, আমার ভূতের আয়না লাগবে না। মা জবাব দেয়, এখন তা বললে তো হয় না। একবার যে বাড়িতে ভূতের আয়না আসে, সেটি আর ভূতেরা ফিরিয়ে নিয়ে যায় না।

বাবা, তুমি ভূতদের বলো ওদের আয়না যেন ওরা নিয়ে যায়, আর দুষ্টু যে ভূত বাচ্চাটা আয়নার মধ্যে দেখা যায় তাকেও। বাবা বলে—তুমি এক কাজ করো, খোকন—ভূত বাচ্চাটার সঙ্গে কথা বলো। দেখো সে কী বলে। আমার ভয় করে! বাবা খোকনকে ভরসা দিয়ে বলে, কিচ্ছু হবে না! তাকাও তাকাও। খোকন এক চোখ খোলে এবং সে দেখতে পায়, ভূতের বাচ্চাটাও এক চোখ খুলেছে। দেখেছ মা, কেমন দুষ্টু এই ভূতের বাচ্চা, আমি এক চোখ খুলেছি বলে সে-ও এক চোখ খুলেছে।

আহা! তোমার সঙ্গে সে মজা করছে, বুঝতে পারছ না, দুই চোখ খোলো এবার তুমি। খোকন দুই চোখ খোলে।

মা বলে, এবার ভূতের বাচ্চার সঙ্গে কথা বলো। তুমি ওর নাম জানতে চাও? খোকন এবার নাম জানতে চায়—তোমার নাম কী ভূতবাচ্চা? ভূতবাচ্চাও বলে, তোমার নাম কী?

দেখেছ মা, ভূতবাচ্চা আমার নাম জানতে চায়। ঠিক আছে, ভূতবাচ্চাকে তোমার নাম বলো। খোকন সাহস করে এবার গলার জোর বাড়ায়। বলে, আমার নাম খোকন। ভূতবাচ্চাটাও একইভাবে বলে, আমার নাম খোকন। খোকনের এবার রাগ হয়, সে মাকে বলে—মা, ভূতের বাচ্চাটার নামও নাকি খোকন। সেটি হবে না! ওর মা কেন ওর নাম খোকন রাখল। আমার নাম ভূতবাচ্চার হবে কেন! মা বলে, তাহলে ওর নাম কী হবে? খোকন এবার মজা পেয়ে যায়, বলে—ওর নাম হবে মিমিন। মা হাসে! মিমি ভেংচি কাটে!

আচ্ছা, তুমি আরো অনেক কথা বলো ভূতবাচ্চাটার সঙ্গে। তা না হলে তো অনেক রাগ করবে ও। তোমার জন্যই তো ও এসেছে। আচ্ছা, ঠিক আছে বলে গল্প জুড়ে দেয় খোকন; কিন্তু সে যে গল্প বলে, ভূতবাচ্চাও একই গল্প বলে। এবার খোকনের বিরক্ত লাগে। সে মাকে বলে—মা, ভূতের আয়না ভালো না। সে আমার মতো করে কথা বলে। মা এবার খোকনকে আদর করে কোলে তুলে নেয়। বলে—খোকনসোনা, আসলে ভূতের আয়না হয় না। এই আয়নার মধ্যে যাকে দেখছ, সে আসলে তুমি। এরই মধ্যে জল আর সাবান নিয়ে আসে মিমি। মা যত্ন করে মুখের পাউডার, কাজল ঘষে ঘষে তুলে দেয় আর মাঝে মাঝে খোকনকে আয়না দেখায়। এবার ভালো করে আয়নার দিকে তাকাতে বলে খোকনকে। খোকন আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে। বলে—মা, এটা তো তোমার খোকন। আমি। ভূত কোথায় গেল? মা বলে, ভূত বলে কিছু নেই। মা তোমাকে তোমার গায়ে মাখা পাউডার আর কাজল দিয়ে ভূত বানিয়ে দিয়েছিল। তুমি আসলে তোমাকেই দেখেছ আয়নায়। এবার সবাই মিলে একটা বড় আয়নার মধ্যে নিজেদের চেহারা দেখে। খোকন বলে, আমরা সবাই ভূত। আমার নাম খোকন ভূত। আর মিমিনের নাম—মিমিন ভূত। হি হি!



মন্তব্য