kalerkantho

জর্ডান রোমেরো

স্কুলের দেয়াল থেকে বিশ্বের চূড়ায়

২৫ মে, ২০১৮ ০০:০০



জর্ডান রোমেরো

২০০৫ সাল। তখন জর্ডান রোমেরোর বয়স ৯ বছর। ওর বাড়ি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায়। স্বাভাবিকভাবেই সেখানকার একটা স্কুলে ও পড়ত। সেই স্কুলের দেয়ালে একটা ছবি টাঙানো ছিল। ‘সেভেন সামিট’-এর ছবি। মানে সাত মহাদেশের সর্বোচ্চ সাত পর্বতশৃঙ্গের ছবি। প্রতিদিন সেই ছবিটি দেখত রোমেরো। আর ওর মনে একটা স্বপ্ন দানা বেঁধে উঠত। সাত মহাদেশের এই সর্বোচ্চ সাত চূড়া ওর জয় করা চাই-ই। আর স্বপ্ন যখন দানা বেঁধে উঠেছেই, তখন তো আর অপেক্ষা করার কোনো মানে নেই।

রোমেরো সত্যিই অপেক্ষা করল না। পাহাড়ে চড়ার কলাকৌশল শিখতে শুরু করে দিল। পূর্ণ সমর্থন পেল মা-বাবারও। শুধু সমর্থনই না, তাঁরাও রোমেরোর অভিযানগুলোতে সঙ্গী হলেন। অবশ্য এর আগেই ওর বাবা পল রোমেরো আর মা লেই অ্যান-ড্রেকের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। বাবা আরেকটা বিয়েও করেছেন। ক্যারেন লুন্ডগ্রেনকে। অভিযানগুলোতে বাবার পাশাপাশি ওর সঙ্গী সত্মাও। তারা তিনজন মিলে তার পরের বছর থেকেই বিভিন্ন মহাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া জয় করতে শুরু করে দিল। ২০০৬-এ জয় করল আফ্রিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কিলিমাঞ্জারো। তার পরের বছর ইউরোপের এলব্রাস আর দক্ষিণ আমেরিকার একোংকাগুয়া। ২০০৮-এ উত্তর আমেরিকার, মানে তার নিজ মহাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া দেনালি। আর ২০০৯-এ ওশেনিয়া, মানে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের কার্সটেনজ পিরামিড। তার পরের বছরই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটা নিল রোমেরো। হ্যাঁ, এশিয়ার তথা বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টকে পদানত করার পরিকল্পনা করল। সে জন্য বাবা ও সত্মাকে সঙ্গে নিয়ে আস্তানা গাড়ল নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুতে। এভারেস্টে পাড়ি দেওয়ার জন্য তিনজন গাইডও নেওয়া হলো। তিন শেরপা—আং পাসাং শেরপা, লামা দাওয়া শেরপা ও লামা কার্মা শেরপা। কিন্তু বাদ সাধল নেপালের আইন। তাতে পরিষ্কার লেখা আছে, ১৬ বছরের নিচে কেউ এভারেস্টে চড়তে পারবে না।

তখন খোঁজ নিয়ে জানা গেল, নেপালে এমন নিয়ম-কানুনের কড়াকড়ি থাকলেও ওপাশে চীনে এমন কোনো বিধি-নিষেধই নেই। কাজেই তারা বেস ক্যাম্প নেপালের বদলে বসালেন তিব্বতে। সেদিক দিয়েই, মানে এভারেস্টের চীনের দিকের অংশ দিয়ে রোমেরো রওনা হলো এভারেস্ট জয় করতে। সঙ্গে বাবা, সত্মা আর তিন শেরপা। এভারেস্ট জয় করতে যা যা জিনিসপত্র দরকার, সেগুলো তো নিলই, সঙ্গে আরো নিল একটা জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস আর একটা স্যাটেলাইট ফোন। এভারেস্ট চূড়ায় যাওয়ার পথে ১৮ হাজার ৭০০ ফুট উঁচু থেকে একটা সাক্ষাৎকারও দিল।

২০১০ সালের ২২ মে। এভারেস্ট চূড়ায় পা রাখল জর্ডান রোমেরো। সঙ্গে সঙ্গে এভারেস্ট জয়ের ইতিহাসের একটা পাতা আবার নতুন করে লিখতে হলো। এত দিন সবচেয়ে কম বয়সে এভারেস্ট শৃঙ্গজয়ীর তকমাটা ছিল ২০০৩ সালে ১৫ বছর বয়সে এভারেস্ট জয় করা নেপালি মেয়ে মিং কিপার দখলে। এদিকে নেপালের ছেলে তেম্বা শেরি ২০০১ সালের ২৪ মে যখন এভারেস্ট জয় করেছিল, তখন তার বয়স ছিল ১৬ বছর ১৪ দিন। আর রোমেরো জয় করল ১৩ বছর ১০ মাস ১০ দিন বয়সে। ইতিহাসের পাতায় অদল-বদল ঘটিয়েই ও সঙ্গে আনা স্যাটেলাইট ফোন দিয়ে মাকে ফোন করল। বলল, ‘মা, পৃথিবীর চূড়া থেকে আমি তোমাকে ফোন করেছি।’

তখনো অবশ্য রোমেরোর সেভেন সামিট জয় করা সম্পন্ন হয়নি। অ্যান্টার্কটিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ভিনসন ম্যাসিফ তখনো বাকি। তার জন্য ওকে এক বছরের বেশি অপেক্ষা করতে হয়। কারণ সেখানে যাওয়াটাই তো ভীষণ দুরূহ আর বিপুল খরচের ব্যাপার। পরের ডিসেম্বর, ১৫ বছর পাঁচ মাস ১২ দিন বয়সে রোমেরো সেটিও জয় করে। তার মধ্য দিয়ে সে পর্বতারোহণের ইতিহাসে আবারও অদল-বদল ঘটায়। সবচেয়ে কম বয়সে সেভেন সামিটজয়ী পর্বতারোহী হিসেবে নাম লেখাল রেকর্ড বুকের পাতায়। এ যাত্রায় পেছনে ফেলে জর্জ অ্যাটকিনসনকে। এই অভিযানগুলো নিয়ে ছোটদের জন্য ও একটা বইও লিখেছে। নাম ‘নো সামিট আউট অব সাইট’।



মন্তব্য