kalerkantho

গল্প

প্রতিচ্ছবি

ডিউক জন

১৮ মে, ২০১৮ ০০:০০



প্রতিচ্ছবি

অঙ্কন : মানব

আরো কয়েকবার গাড়িটা স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করল রহমত মিয়া। গোঁ গোঁ করে প্রতিবাদ জানাল ইঞ্জিন। চলবে না বলে পণ করেছে যেন।

শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিল ড্রাইভার। পেছন ফিরে তাকাল হতাশ চেহারায়।

একগাদা ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে বসে আছেন তৌফিক স্যার আর সোহানা ম্যাডাম।

‘কী! সমস্যা কী?’ জানতে চাইলেন তৌফিক উর রহমান।

‘বুঝবার পারতাছি না, ছার!’ কাঁচুমাচু করে বলল বাসচালক।

‘ধ্যাত্তেরি!’ নিখাদ বিরক্তি ঝরল সোহানা রহমানের কণ্ঠ থেকে। ‘কী করা এখন?’

‘চেকিংমেকিং কইরা দেহি, আপা!’

‘ঠিক আছে, ভাই,’ বললেন তৌফিক স্যার। ‘দেখেন, কী করা যায়। আপাতত নেমে পড়ি আমরা। কী বলেন, ম্যাডাম?’

‘হ্যাঁ, সেটাই বোধ হয় ভালো হবে।’ সায় জানালেন সোহানা ম্যাডাম।

‘আচ্ছা ভাই, আর কতখানি যেতে হবে আমাদের?’ জিজ্ঞেস করলেন স্যার।

‘তা ধরেন আরো ১০-১২ মাইল।’ মনে মনে হিসাব কষে জানাল বাসড্রাইভার।

‘ওহ! তাহলে তো অনেক দূর এখনো।’ বলে উঠলেন ম্যাডাম। ‘ওকে, বাচ্চারা! নেমে পড়ো সবাই।’

নতুন রং করা বাসটা থেকে নামল সবাই একে একে। মেরুন রঙের ব্যানার ঝুলছে ভাড়া করা গাড়িটার সামনের দিকে। সোনালি হরফে লেখা রয়েছে ওতে :

শিক্ষা সফর ২০১৮

লাল-সবুজ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়

ষষ্ঠ শ্রেণি, ‘খ’ শাখা

স্থান : মধুপুর ন্যাশনাল পার্ক

ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগল ছেলে-মেয়েরা। রইল অবশ্য বিগড়ে যাওয়া গাড়িটার আশপাশেই। স্যার-ম্যাডাম পইপই করে বলে দিয়েছেন, কেউ যাতে চোখের আড়াল না হয়।

কিন্তু ওসব শুনতে বয়েই গেছে ভাবনার। নামের মতোই মেয়েটা একটু ভাবুক গোছের। থাকে নিজের জগতে। দেখতে-শুনতে গোবেচারা হলে কী হবে, আসলে বেশ সাহসী। গোল ফ্রেমের চশমার ওপাশে চোখ দুটোয় বুদ্ধির ঝিলিক।

অন্যদের কাছ থেকে একটু দূরে সরে এলো ও সবার অলক্ষে।

বেশ জঙ্গুলে এই জায়গাটা। সারি সারি গাছগাছালি রাস্তাটার দুই ধারে। প্রায় জনবিরল একটা জায়গায় এসে বেঁকে বসেছে ওদের বহন করা গাড়িটা।

পায়েচলা একটা পথ আবিষ্কার করল মেয়েটা বড় রাস্তাটার পাশে। কোনো কিছু চিন্তা না করেই নেমে পড়ল পথটায়। হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে গেল প্রকৃতির কোলে।

হরেক রঙের নাম না জানা বুনো ফুল ফুটে রয়েছে এখানে-ওখানে। মন মাতানো গন্ধ বাতাসে। মৃদু শীতল হাওয়ায় সড়সড় করে উঠছে ঝোপঝাড়। আড়াল থেকে কেউ যেন ঝাঁকাচ্ছে ঝোপগুলোকে। সারা গায়ে কাঁটা নিয়ে জড়াজড়ি করে বেড়ে উঠেছে লতাগাছগুলো। রোদটাও তেমন কড়া নয় আজ।

ওর পায়ের আওয়াজে ছুটে লুকিয়ে পড়ল একটা বেজি। নাকি কাঠবিড়ালি? এখন আর দেখা যাচ্ছে না ওটাকে।

কোথায় যেন উদাস করা মিষ্টি সুরে গাইছে একটা পাখি। কী পাখি ওটা? আগে কখনো শোনেনি ভাবনা মধুর ওই আওয়াজ। আহা! ঢাকা শহরটা যদি সবুজ হতো আরেকটু! হরেক পাখির মেলা বসত নগরীতে।

স্বপ্নের শহরটার কথা চিন্তা করতেই একরাশ প্রশান্তি এসে ভর করল ভাবনার চোখে-মুখে। কল্পনায় দেখতে পেল ও, রাজধানীর নিত্যদিনের নাগরিক সমস্যাগুলো আর নেই, দূর হয়ে গেছে যেন জাদুমন্ত্রের বলে। সত্যিকারের তিলোত্তমা নগরী হয়ে উঠেছে ঢাকা।

সত্যিই যদি এমন হতো!

কতক্ষণ ডুবে ছিল ভাবনায়, বলতে পারবে না। সচকিত হলো আচমকা। সামনের ঝোপটার আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে কে ওটা?

একটি মেয়ে।

একটি হার্টবিট মিস করল ভাবনা। অবিকল ওরই মতো দেখতে মেয়েটি! আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে আসছে ওর যমজ—ধড়াস করে লাফ মারল ভাবনার কলজেটা। নিজের অজান্তেই ঝুলে পড়ল চোয়াল। দুই চোখ বস্ফািরিত।

এ-ও সম্ভব!

শুধু চেহারায় নয়, কী আশ্চর্য মিল পরনের কাপড়চোপড়েও! নীল-সাদা ইউনিফর্মের ওপর লেবু রঙের কার্ডিগান। একই রকম জুতা, এমনকি গোল ফ্রেমের চশমাটা পর্যন্ত! আপাদমস্তক কার্বন কপি!

ঢোক গিলল ভাবনা। গলার ভেতরটা শুকিয়ে শিরিষ কাগজ যেন। কে এই মেয়ে? ও কি এই জগতের কেউ? নাকি—

চমকে উঠল হর্নের বিচ্ছিরি বাতাসচেরা আওয়াজে। শব্দের উেসর দিকে ঝট করে ঘুরে গেল ঘাড়।

হাঁক ছাড়ছে ড্রাইভারের সহকারী। ঠিক হয়ে গেছে নাকি গাড়ি?

নিজের নকলের দিকে তাকাল ভাবনা। বিচিত্র এক টুকরা হাসি খেলা করছে রহস্যময় মেয়েটির ঠোঁটে। কিন্তু যমজ রহস্য উদ্ঘাটনের সময় নেই আর। ফিরতে হবে এক্ষুনি। আশা করা যায়, ওর অনুপস্থিতি খেয়ালই করেনি কেউ।

তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে বাসটির কাছে ফিরে

চলল ভাবনা।

ডান হাতে দমাদম বাসের বডি পেটাচ্ছে হেলপার। সব কয়টি দাঁত বেরিয়ে পড়েছে ছেলেটার। বুঝতে কষ্ট হয় না, এ তো আনন্দের কারণটা। ইঞ্জিনের আওয়াজ মধুর সংগীতের মতো লাগল ওদের কাছে।

‘ওঠো ওঠো, উঠে পড়ো, বাচ্চারা!’ তাড়া লাগালেন তৌফিক স্যার আর সোহানা ম্যাডাম।

গন্তব্যের পানে ছুটে চলল গাড়ি। গান ধরেছে সবাই মিলে। স্যার-ম্যাডামও গলা মেলাচ্ছেন ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে। একজন ছাড়া। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ—কার কথা বলছি?

যদি বলি, নিজের সিটে ভাবলেশহীন চেহারায় বসে থাকা মেয়েটি আসলে ভাবনা নয়,

তাহলে?



মন্তব্য