kalerkantho


যখন জেগে উঠল রংগুলো

নাসরীন মুস্তাফা

৩০ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



যখন জেগে উঠল রংগুলো

অঙ্কন : মানব

রাফির একজন দারুণ মামা আছেন। সেই মামাটা হা হা করে হাসতে পারেন। গা হিম করা ভূতের গপ্প বলতে পারেন। খেলতে বললে বড়দের মতো বলেন না, আমি তো বড় মানুষ, আমি কেন খেলব?

মামা রাফি আর ওর বয়সীদের সঙ্গে খেলেন। রীতিমতো টুর্নামেন্ট হয়ে যায়। গতবার তো রাফিদের পাড়া আর বাদলদের পাড়ার সঙ্গে ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট করলেন। মামা হলেন রেফারি-কোচ-বদলি খেলোয়াড়, অনেক কিছু।

মামাটা কেন যে দূরে থাকেন! তবে দূরে থেকেও মামা কিন্তু ওকে ভোলেন না। কিছুদিন পর পর চিঠি পাঠান। এই ই-মেইল আর মোবাইলের যুগে হাতে লেখা চিঠির খুব খারাপ সময় চলছে। কিন্তু মামা রাফিকে লেখেন। রাফিও লেখে মামাকে। সেই সব চিঠিতে থাকে দারুণ দারুণ খবর। মামা কবে আসবেন, সে খবরও থাকে। রাতে ঘুম থেকে জেগে মামা ঘরের ভেতর চাঁদের আলো কী দারুণ নকশায় পড়ে থাকতে দেখেছিলেন, সে খবর। কোন বইটা পড়ে একটুও ভালো লাগেনি, সে খবর। আজগুবি এক লোকের সঙ্গে দেখা হয়েছে, যার চোখের রং বেগুনি, সে খবর।

মামার চিঠি মানেই অন্য রকম একটা কিছু। এইবার মামা চিঠির সঙ্গে একখানা উপহারও পাঠালেন। লাল চকচকে কাগজে মোড়ানো একটা প্যাকেট। খুলে দেখে, ভেতরে একটা রঙের বাকসো। বাকসোর ভেতরে সাজানো বারোটা রঙের টিউব।

চিঠিতে লেখা, রাফিকে অনেক অনেক ছবি আঁকতে হবে। সব ছবি মামার কাছে পাঠাতে হবে। মামা নাকি এক্সিবিশন করবেন।

দারুণ খবর, সন্দেহ নেই। এমনিতেই রাফি অনেক ছবি আঁকে। এখন তো আরো বেশি আঁকতে লাগল। আঁকতে আঁকতে কাহিল হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে মেঝেতে। সারা ঘরে আঁকা ছবিগুলো। ক্লান্ত ভঙ্গিতে এর মধ্যেই ঘুমায় রাফি। তখন জেগে ওঠে ছবিরা। ছবি থেকে লাফিয়ে ওঠে রংধনু, সাগরের ঢেউ, সূর্য, হরিণ, ময়ূর, সার্কাসের ক্লাউন, বেদেনি, টিয়া পাখি, দোয়েল। এগুলো রাফিকে ঘিরে খেলতে থাকে। এদিকে ছবিগুলোর কাগজ হয়ে গেছে সাদা। পড়ে আছে শুধু।

তখন রাফিও শুরু করে খেলা। ওরা সবাই রংধনুর পিঠে ওঠে। গড়িয়ে যায়। গড়াতে গড়াতে যায় সাগরে। সাগরের ঢেউয়ের পিঠে উঠছে আর নামছে। একবার উঠতে উঠতে হলো কী, সাগরের ঢেউ তুলে দিল আকাশে।

কী মজা! কী মজা! আকাশের সূর্যটা হাসে। আকাশে উঠে যাওয়া পাখিরা, রাফি ও অন্যরাও হাসতে থাকে। রোদের আলোয় হাসে—হা হা। তখন?

তখন রোদের সোনালি আলো এসে ঢোকে ঘরের ভেতর। রোদের আদর পড়ে রাফির গায়ে। রোদ পড়ে আঁকা ছবিগুলোর ওপর। সকালের রোদ জাগিয়ে দেয় রাফিকে। জেগে ওঠা রাফি দেখে, তুলি হাতে আছে এখনো। আর ছবিগুলো ছবিই আছে। ওর চারপাশে ছবিগুলো। ওকে যেন বলছে—শুভসকাল, বন্ধু।

রাফিও বলে, শুভসকাল।

মামার কাছে চিঠি লিখতে বসেছে। কেমন করে ছবিগুলো জেগে উঠেছিল, জানাতে হবে। ও কত্ত মজা করেছে, জানাতে হবে। ছবিদের মাঝখানে বসেই রাফি চিঠি লিখছিল। আর ঠিক তখন তাপু হাজির।

রাফির বড় ভাই কাফির বন্ধু তাপু। খুদে বিজ্ঞানী তাপু নামেই সবাই চেনে ওকে। রাফির বড়ই পছন্দ তাপুকে। তাপুও ভালোবাসে রাফিকে। রাফি মানে আনন্দ। রাফি মানে গুলগুলাটা পুলপুলাটা টাটটু মাটটু কুটুম ছা!

আজকেও তা-ই বলছিল তাপু। ছবিগুলো দেখে তো তাপু একদম হাঁ। এত সুন্দর ছবি! মনে হচ্ছে এখনই বুঝি জেগে উঠবে। তাপুর মুখে এ রকম কথা শুনে রাফি শুরু করল কাল রাতের গল্প। ও তো ভেবেছিল, ছবিগুলো বুঝি সত্যিই জেগে উঠেছে। ঘুম থেকে জেগে উঠে বুঝল, ও স্বপ্ন দেখেছিল।

রাফি বলে, তাপু ভাই, তুমি তো বিজ্ঞানী। ছবি আঁকব আর ওরা জেগে যাবে, বিজ্ঞান কী এমন জাদু জানে?

তাপু পড়ে গেল ভাবনায়।

রাফি ভাবল, তাপু ভাইকে বলেছি। এবার একটা উপায় হবেই হবে। তাপুর গলা জড়িয়ে ধরে বলে, জেগে যাবে এমন ছবি আঁকব। জাদুর ছবি আঁকব। উপায় বলে দাও না!

এক দিন সময় নিতে হলো তাপুকে। ভাবনার জন্য কিছু সময় তো দরকার। তাই না?

জাদুর ছবি আঁকতে হলে জাদু জানতে হবে। তাপু ভাই কি জাদু জানে?

রাফি ভাবনায় পড়ে গেল। তাপু মুচকি হেসে বলে, জাদু-ই তো হবে রে পাগলা!

খুব খুশি রাফি। তাপু ভাই জাদু জানে!

কী জাদু করবে তাপু ভাই?

আয়োজন শুরু হলো। কাফিও যোগ দিল জাদুর আয়োজনে। এমনকি রাফির মা-ও যোগ দিলেন। ট্রেতে তাপুর জন্য নাশতা সাজিয়ে এনে বললেন, দেখি তো কেমন জাদু!

তাপু নাশতা নামিয়ে রেখে ট্রে নিয়ে নিল। ট্রেটার চারপাশে রেলিং দেওয়া, বারান্দার মতো। রেলিং চারটায় কোনো ফাঁক নেই। ওর দরকার খাবারে দেওয়ার রং। মা তা-ও দিলেন। লাল, হলুদ, কমলা, বাদামি, নীল, সবুজ। গোলাপিও।

এবার দরকার দুধ। খাঁটি গরুর দুধ। থুক্কু, গাভির খাঁটি দুধ। আর দরকার থালাবাসন পরিষ্কার করার তরল সাবান। তা-ও দেওয়া হলো।

ট্রের ভেতর দুধ ঢেলে দিল তাপু। ট্রের তলা আর দেখা যাচ্ছে না, দুধে দুধে ছয়লাপ হয়ে গেছে। দুধে দুধে ছয়লাপ! কী বলা যায় একে? দুধলাপ নাকি? কী জানি!

দুধের ভেতর ছয়-সাত ফোঁটা করে সব রং দিল তাপু। সবাই দম বন্ধ করে দেখছে। শব্দ হচ্ছে, টুপ্!

এর ভেতর তরল সাবান দেওয়া হলো পাঁচ ফোঁটা। শব্দ হলো, টুপ্!

এরপর শুরু হলো খেলা। জাদুর খেলা। রংগুলো জেগে উঠল। নেচে উঠল। আহা, সেকি নাচ! জেগে উঠলে বুঝি এভাবেই জাগতে হয়!

কেন জেগে উঠল রংগুলো? নেচে উঠল! নতুন নতুন ছবি বানিয়ে ফেলল।

তাপু বলেছিল, আসল জাদুকর দুধ আর তরল সাবান। দুধে আছে ফ্যাট বা চর্বি। তরল সাবানের মূল কাজ হলো ফ্যাট ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেওয়া। থালায় ফ্যাট লেগে থাকলে সাবান সেই ফ্যাটকে টুকরো টুকরো করে দেয়। এরপর পানি দিলেই চলে যায় ফ্যাটের টুকরোরা। থালা হয় ঝকঝকে চকচকে ফকফকে।

দুধের ফ্যাটকেও টুকরো করতে চাইল তরল সাবান। কাজটা করতে গিয়ে ওকে দুধের ভেতর থাকা রংকেও ঠেলা-ধাক্কা দিতে হলো। আর তখন নড়ে উঠল রঙের দলা। মনে হলো জেগে উঠল। নেচে উঠল। হয়ে গেল রঙের নাচ দেখানোর ছবি। জাদুর ছবি।

তাপু বলল, এই দুধ কিন্তু কিছুতেই খাওয়া যাবে না।

রাফি দুধ খুব পছন্দ করে। এই দুধ খাওয়া যাবে না শুনে ভাবে একটু। তারপর নিজেই বলে, জাদু মিশে গেছে, তাই না তাপু ভাই? ঠিক আছে। এই দুধ খাব না। যে দুধে জাদু নেই, সেই দুধই খাব।

কী যে ভালো এই রাফিটা! সাধে কী তাপু ওকে এত আদর করে! বলে, গুলগুলাটা পুলপুলাটা টাটটু মাটটু কুটুম ছা!



মন্তব্য