kalerkantho


শেষপর্যন্ত এলিয়েনটা

ধ্রুব নীল   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শেষপর্যন্ত এলিয়েনটা

অঙ্কন : মানব

পুরান ঢাকার নারিন্দার লোকজন এর আগে এলিয়েন দেখেনি। তাই নাকুচু গ্রহের প্রাণীটাকে দেখে ভিড় জমিয়েছে সবাই। একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে।

‘তুমি কি আমেরিকা থেকে আইছ? তোমার দেশের নাম কী? তুমি কী খাও? দুপুরে খাইছ? তুমি শিরমাল রুটি খাওনি? গরুর ভুনা, নাকি হালুয়া দিয়া খাইবা?’

গ্রহের নামের মতোই আচরণ ভিনগ্রহের প্রাণীটার। নাকটা ভীষণ উঁচু! কারো কথার উত্তর দিচ্ছে, কারো কথার দিচ্ছে না। চারকোনা মাথা। সামনে-পেছনে দুই পাশে দুটি করে মোট আটটি চোখ। পেছনে দেখতে ঘাড় ঘোরাতে হয় না। হাঁটার সময় মাঝেমধ্যে মাটিতে পা পড়ে না। কারণ সে উড়তে জানে।

‘তোমরা মানুষরা এত খাই খাই করো কেন? আর কোনো কাজ নেই?’

‘না মানে, তুমি মেহমান মানুষ। অনেক দূর থিকা আসছ, খিদাটিদা লাগছে নিশ্চয়ই, এই জন্য’—এলিয়েনের কথার জবাব দিল চকবাজারের রেস্টুরেন্ট মালিক মতিন মিয়া। এলিয়েনটা ধীরগতিতে হাঁটছে আর মাঝেমধ্যে একটা পনিরের টুকরায় কামড় দিচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে, খাবারটা সে না পারতে গিলছে। একজন একটা শিক কাবাব এগিয়ে দিল। ওটা হাতে না নিয়েই বলল, ‘ওহ কি বাজে! আমাদের রাজ্যে এর চেয়ে হাজার গুণ স্বাদের আইটেম পাওয়া যায়। তোমরা খেতে চাও একটু?’

ছেলে-বুড়ো সবাই একযোগে মাথা ঝাঁকাল। এলিয়েনটা তার ঝোলা থেকে চারকোনা একটা যন্ত্র বের করল। কয়েকটি সুইচ চাপতেই পি পি শব্দ। যন্ত্রের ডালা খুলতেই সুঘ্রাণে ভরে গেল চারপাশ।

‘এই নাও, এটা হুলানচো। আমাদের গ্রহের অতি সাধারণ খাবার।’

খাওয়ার জন্য এগিয়ে এলো পাড়ার নেতাগোছের এক লোক। বলের মতো দেখতে খাবারটায় কামড় দিতেই হাঁ হয়ে গেল লোকটা। এরপর চোখ বুজে এমনভাবে খেতে লাগল যে তার আর হুঁশ রইল না। একে একে সবাই খেল ভিনগ্রহের খাবার। সবারই এক কথা, তাদের পূর্বপুরুষরাও জীবনে এত মজার খাবার খায়নি।

এলিয়েনটা হাঁটছে আর পুরান ঢাকার ঘরবাড়ি দেখছে। নাক সিটকাচ্ছে অনবরত। ‘তোমরা এমন বিশ্রী রকম বাক্সে থাক? কী ভয়ানক! নাকুচু গ্রহে প্রত্যেকের জন্য একটা করে জঙ্গল, একটা করে সমুদ্র আর আকাশ বরাদ্দ আছে। আমরা যখন যেখানে খুশি থাকতে পারি। যত খুশি মজা করতে পারি।’

‘আমাদেরও জঙ্গল আছে, সমুদ্র আছে।’

ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন মিনমিন করে বলল কথাটা। এটা শুনে এলিয়েনটা এমনভাবে চোখ কুঁচকে তাকাল যে তার পেছনের চোখ সাইডে আর সাইডের চোখ সামনে চলে আসার দশা।

‘বলছ কী! এখানে জঙ্গল-সমুদ্র? গাছই তো চোখে পড়ছে না। আর সমুদ্র তো মোটে একটা। তা তোমাদের যত জঙ্গল, সব এক করলে আমার নিজের বাগানের সমান হবে না। হা হা হা।’

কথাটা শুনে কয়েকজন তেড়ে আসতে চাইলেও সামলে নিল নিজেদের। নাকুচু গ্রহের প্রাণীটা সুপারম্যানের মতো উড়তে পারে। না জানি আর কী কী ক্ষমতা আছে। নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওটাকে সমীহ করে চলছে সবাই।

‘তা তোমাদের আছেটা কী! আমার তো এখানে আসাটাই মহাভুল হয়ে গেছে দেখছি।’

‘তুমি আমাগো মোবাইল ফোন দেখছ? এই দেখো আইফোন দশ।’

‘ছে ছে! এটা আবার প্রযুক্তি! আমাদের গ্রহে কাউকে যন্ত্র পকেটে নিয়ে ঘুরতে হয় না। মাথার পেছনে ছোট্ট ইলিবিলি বসানো আছে। তা তোমরা ইলিবিলি প্রযুক্তি চেন তো? নাকি ওটার নামই শোননি?’

কেউ কিছু বলছে না। নাম শোনেনি বললে এলিয়েনটা আবার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে পারে এই ভয়ে।

‘তা এলিয়েন ভাই, তুমি আমাদের জামাকাপড় নিশ্চয়ই পছন্দ করবা। তোমার শরীরে দেখতেছি একরঙা একটা স্টিলের জামা। এটা তো সুন্দর না।’ হরিপদ দরজির কথায় আশা ফিরে পেল উপস্থিত জনতা। কিন্তু হায়, এবারও মুচকি হাসল এলিয়েনটা। সুইচে চাপ দিতেই তার স্টিলের মতো জামাটা ধুম করে বদলে একটা শেরোয়ানি হয়ে গেল। আবার চাপ দিতেই হয়ে গেল চকচকে স্যুট।

‘জামাকাপড় নিয়ে আমরা বিশেষ ভাবি না। ইলিবিলি প্রযুক্তি দিয়ে আমরা মুহূর্তের মধ্যে যা খুশি পরতে পারি।’

‘কিন্তু তোমার ইলিবিলি কি আমাদের পেস্তা বাদামের শরবত বানাইতে পারবে?’ আবারও খাবারের প্রসঙ্গে চলে গেলেন মতিন মিয়া। এলিয়েনটা বিরক্তই হলো এবার। ওভেনের মতো দেখতে যন্ত্রটায় সুইচ টিপে বের করে আনল একটা পানীয়। বাড়িয়ে দিল মতিন মিয়ার দিকে। ভয়ে ভয়ে চুমুক দিলেন মতিন মিয়া। এক ঢোকে পুরোটা সাবাড়। তারপর চোখ বন্ধ করে দিলেন ছুট। ছুটতে ছুটতে বলছেন, ‘আহা! মধু! মধু! আহা!’

উপস্থিত জনতার মধ্যে গুঞ্জন, ‘আমারেও একটু দিয়েন।’

দুপুর গড়াতেই এলিয়েনটা বলল, ‘এবার যেতে হবে। আর থাকা চলবে না। তোমাদের এই গ্রহে লেনদেন করার মতো কিছু পেলাম না।’ পাড়ার কিশোর-কিশোরীরা রাগ করে বলল, ‘যাও যাও! তোমার পিছে ঘুর ঘুর করনের টাইম নাইক্কা। মেলায় যাইতে অইব।’

‘মেলা? এটা কি উৎসব?’

‘হ, অনেক বড় উৎসব। তাড়াতাড়ি না গেলে পরে আবার ফিরতে দেরি হইব।’

‘তা সেটা একটু দেখে আসলে মন্দ হয় না।’ নাকি সুরে বলল এলিয়েনটা।

ভিনগ্রহের অতিথি বলে কথা। বাধ্য হয়েই তাকে নিয়ে বইমেলার দিকে রওনা দিল পাড়ার কিশোর-কিশোরীরা।

মেলার গেট দিয়ে ঢুকতেই এলিয়েনটা থমকে দাঁড়াল। ছেলেমেয়েরা এলিয়েনকে নিয়ে এখন খুব একটা মাথা ঘামাচ্ছে না। কে কোন বই কিনবে সে আলাপে ব্যস্ত। এলিয়েনটা খুক খুক করে কাশি দিয়ে কী যেন বলতে চাইল।

‘ইয়ে, মানুষ শিশুরা, শোনো একটা কথা।’

‘কী কইবেন কন।’

‘এই বই জিনিসটা কী? কাগজ আর কালি তো চিনি। কিন্তু বই কী?’

‘এলিয়েন সাহেব কয় কী! মাথা ঠিক আছেনি!’

এলিয়েনের সঙ্গে আসা অবাক সবাই। নিজেদের কানকে বিশ্বাস হচ্ছে না।

‘আপনে বই চিনেন না? গল্পের বই পড়েন নাই জীবনে?’

‘না তো? গল্পের বই দিয়ে কী হয়? এক মিনিট!’

যন্ত্রের সুইচ অনেক চাপাচাপি করেও লাভ হয়নি। চোখ বন্ধ করে ইলিবিলি ইলিবিলি করল কিছুক্ষণ। কিন্তু হতাশ এলিয়েন। কোনো প্রযুক্তিতে কাজ হচ্ছে না।

‘বই মেশিনে বানায় না, বুজলেন এলিয়েন ভাই। এটা মানুষে লেখে। অনেক মজার মজার গল্প। না পড়লে পুরাই মিস। যান কয়েকটা পাতা উল্টাইয়া দেখেন।’

এলিয়েনটা একটা বইয়ের পাতা ওল্টাতে লাগল। আট চোখ দিয়ে একটা বই পড়তে তার বেশিক্ষণ লাগল না। একটার পর একটা পড়েই যাচ্ছে। স্টলের লোকজন রীতিমতো বিরক্ত।

এদিকে পুরান ঢাকার কিশোর-কিশোরীরা এই প্রথম ভিনগ্রহের প্রাণীটার মুখে একই সঙ্গে হতাশা আর আনন্দের ছাপ দেখল। হতাশার কারণ, তার নাকুচু গ্রহে বই বলে কিছু নেই। আনন্দের কারণ, সে তার গ্রহে নিয়ে যাওয়ার মতো একটা কিছু পেয়েছে।

‘আমার এখানকার সব বইয়ের একটা করে কপি চাই। আমার স্পেসশিপে জায়গার অভাব নেই। কিন্তু একটা সমস্যা। আমার কাছে এই টাকা বস্তুটি নেই।’

কিশোর-কিশোরীরা একে অন্যের দিকে তাকাল। এর মধ্যে একজন বুদ্ধিটা দিল, ‘এক কাম করেন, রাস্তায় খাড়াইয়া আপনার ওই হুলানচো বেচেন কিছুক্ষণ। তারপর টাকা জমলে বই কিনবেন। একটা হুলানচো দশ টেকা করে বেচেন।’

বুদ্ধিটা পছন্দ হলো ভিনগ্রহের প্রাণীটার। বইমেলার শেষ দিন পর্যন্ত পৃথিবীতে থাকার সিদ্ধান্তটা নিয়েই নিল।

 

 

 



মন্তব্য