kalerkantho


পুকুর আর ছোট মাছ

হাসনাত আমজাদ   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পুকুর আর ছোট মাছ

অঙ্কন : মানব

পুকুরটা নাচছে।

থালা নাড়ালে থালার মধ্যে পানি যেভাবে নাচানাচি করে, পুকুরটা ঠিক সেভাবে নাচছে।

আনন্দে নাচছে সে। চারদিকে পানি থৈথৈ করছে। বৃষ্টির পানি। বর্ষার পানি। আজ দশ দিন ধরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। বাঁধ ভেঙেছে আকাশের। সেই বাঁধ ভেঙে জোয়ারের মতো পানি ঢুকছে পুকুরে। খালের পানি। মাঠের পানি। রাস্তার পানি। কত পানি তার বুকে। পুকুরের আনন্দ দ্যাখে কে। হাসছে সে। আনন্দের হাসি। প্রাণখোলা হাসি।

একটা মাছ টুপ করে লাফ দিয়ে আবার ডুব দিল। ছোট্ট তিতপুঁটি মাছ। আবার লাফ দিল। ভেসে উঠল মাঝখানে।

তিতপুঁটি বলল, ও পুকুর, তোমাকে কদিন থেকেই হাসিখুশি দেখছি। বলি, ব্যাপার কী? এত খুশি কিসের?

পাশ থেকে এগিয়ে এলো আরেকটা মাছ। ছোট্ট খলশে। চকচকে রঙিন খলশে। এই পুকুরের সবচেয়ে সুন্দর মাছ। অনেক দিন দেখা যায়নি, হঠাৎ চোখে পড়ছে। কোত্থেকে যেন ভেসে এসেছে। একটা টেংরাও এসে দাঁড়াল পাশে। সঙ্গে ছোট পাবদা। একটা টাকিও আছে। আছে কই।

ওরা সবাই একসঙ্গে বলল, হ্যাঁ গো পুকুর, এত খুশি কিসের? মেয়ের বিয়ে দিচ্ছ নাকি?

পুকুরটা লজ্জা পেয়ে হাসল। বলল, দূর, কী যে বলো তোমরা! কত দিন শুকনো ছিলাম আমি। এট্টুকু জল ছিল আমার ঠিক মাঝখানে। জলের অভাবে কত দিন কেঁদেছি। আকাশকে বলেছি, ও আকাশ, তুমি জল দাও, জল দাও আমার বুকে। এখন আমার বুকে কত পানি। ডাইনে পানি। বাঁয়ে পানি। সব দিকে পানি। পানি এসেছে বলে তোমরাও এসেছ। তোমরা না থাকলে কি আমার ভালো লাগে, বলো? এখন আমি আছি, তোমরাও আছ। খুশি হব না, বলো?

তিতপুঁটি বলল, ঠিক। একদম ঠিক কথা। খলশেও বলল, হ্যাঁ, ঠিক। আর মাছেরাও একসঙ্গে বলে উঠল, ঠিক বলেছ, ঠিক। একবারে মনের কথা বলেছ তুমি। পুকুর আছে, পানি নাই। সেই পানিতে মাছ নাই, তা-ও কি কখনো হয়? কত মাছ ভেসে ভেসে এসেছে এখন তোমার এখানে। আমরাও এসেছি। এখন আমরা সবাই তোমার বন্ধু, কী বলো?

পুকুর হাসল। বলল, হ্যাঁ, ঠিক। একেবারে ঠিক।

মুখে যতই বন্ধু বলুক, আসলে মাছগুলোকে নিজের সন্তানের মতো মনে হয় পুকুরের। ওরা হাসে, ওরা খেলে। কেমন ছুটে বেড়ায় ওর বুকে। ওরাই তো ওর ছেলে-মেয়ে। মাছেরা ছাড়াও পুকুরের ধারে ধারে বাস করে কিছু শেওলা, কচুরিপানা, সবুজ ঘাস আর লতাপাতা। বেশ আনন্দে দিন কাটছে পুকুরের। এর মধ্যে পানি আরেকটু বেড়েছে। আরো কিছু মাছ ভেসে এসেছে। প্রতিদিনই আসছে। একটা শোল মাছও এলো সেদিন। সঙ্গে একঝাঁক লাল লাল পোনা। শোল মাছ যেখানেই যায়, সঙ্গে একঝাঁক পোনা। পুকুরের চার কোণ ঘুরে বেড়ায় ওরা। পোনাগুলোকে সবাই বেশ আদর করে। এখান থেকে বেশ কিছুটা দূরে এক পুকুরে থাকত শোলটা। বর্ষার পানিতে ভেসে ভেসে এখানে চলে এসেছে।

দক্ষিণ কোণের শেওলারা হঠাৎ করে একদিন নালিশ জানাল পুকুরকে।

 —ও পুকুর, তোমার কাছে নালিশ আছে আমাদের।

পুকুর অবাক হয়ে বলল, নালিশ? কিসের নালিশ গো তোমাদের আমার কাছে?

শেওলা বলল, নালিশ ওই শোল মাছ আর ওর পোনাদের বিরুদ্ধে। আমার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আরামেই বাস করছিলাম। কিন্তু শোল আর ওর পোনারা আমার বাড়িঘর সব ভেঙে দিচ্ছে। একসঙ্গে দল বেঁধে আসে আমার বাড়িতে। একবার-দুবার নয়, প্রতিদিন পাঁচ-ছবার করে আসে। যখনই আসে, আমার বাড়িঘর সবাই মিলে উল্টেপাল্টে দেয়। অন্য কোনো মাছ এমন করে না। এভাবে ছানাপোনা নিয়ে একসঙ্গে দল বেঁধে ঘোরে না। তুমি ওদের বলে দিয়ো তো।

পুকুর হাসে। বলে, অবোধ শিশু ওই ছানাপোনাগুলো। ওদের ওপর রাগ করতে আছে? ওরা ছোট, কিছু দুষ্টুমি তো করবেই; কিন্তু ওরা যখন দল বেঁধে সারা পুকুর ঘুরে বেড়ায়, তখন তোমার কি দেখতে ভালো লাগে না, বলো?

শেওলাও এবার হাসে। বলে, তা ঠিক। তুমি ঠিকই বলেছ। আচ্ছা, ওদের কিছু বলার দরকার নেই। ওরা ওদের মতো খেলে বেড়াক।

এভাবেই দিন যায়। মাস যায়। বর্ষাও একসময় চলে যায়। শরৎ আসে। পুকুরের পানি আস্তে আস্তে কমতে থাকে। শরৎ যায়। হেমন্ত আসে। পানি কমতে কমতে একসময় আবার ছোট হয়ে আসে পুকুরটা। যে শোল মাছটা তার ছানাপোনা নিয়ে সারা পুকুর ঘুরে বেড়াত, তাকে আর দেখা যায় না। ছোট্ট তিতপুঁটি মাছ আর আগের মতো আনন্দে লাফ দিয়ে ভেসে ওঠে না। সুন্দর রঙিন খলশে কোথায় যে হারিয়ে গেছে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কয়েকটা টেংরা, টাকি, শিং আর মাগুর দেখা যায় মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওদের সঙ্গী-সাথিরা কেউ নেই। জেলেরা কিছু মেরে নিয়ে গেছে। কিছু হারিয়ে গেছে।

হঠাৎ একদিন সকালে বেশ কজন মানুষ দেখা গেল পুকুরের পাশে। পুকুরের মালিকও রয়েছে তাদের সঙ্গে।

মালিক বলল, শোনো, এই ছোট ছোট দেশি মাছ আর পুকুরে রাখব না। এদের রেখে বেশি লাভ হয় না। পুকুরে এখন আমি বড় বড় বিদেশি মাছের চাষ করব। এতে অনেক বেশি লাভ হবে। সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, থাই কই, নাইলটিকা—এসব মাছের চাষ করব। পুকুরে এখন অল্প পানি। এই পানি শুকিয়ে গেলে তোমরা মেশিনে পানি দেবে। পুকুর ভরে ফেলব পানিতে। এরপর নতুন করে ছাড়ব নতুন নতুন মাছ।

পুকুর অবাক হয়ে ওদের কথা শোনে। নতুন নতুন মাছ, সে আবার কী? গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে সে নতুন কিছু দেখার জন্য।

ঠিক এক মাস পরের কথা।

পুকুর আবার ভরে গেছে পানিতে। বৃষ্টির পানি নয়, মেশিনের পানি।

মাছে ভরে গেছে পুকুর। অচেনা সব মাছ। অচেনা ওদের চলাফেরা। অচেনা ওদের সব কিছু। ওরা অচেনা সব খাবার খায়। মালিকের লোক এসে খাবার ছিটিয়ে দেয়। ওদের অচেনা লাগে পুকুরের। পুকুরের সঙ্গে ওরা কথা বলে না। পুকুরের সঙ্গে গল্প করে না। মারামারি বা ঝগড়া হলে ছুটে আসে না নালিশ নিয়ে পুকুরের কাছে। কেন জানি পুকুরের মনে আজ আর সুখ নেই। নেই আনন্দ। সে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। বৃষ্টির দিকে। স্বপ্ন দেখে। আবার বৃষ্টি হবে একটানা দিনের পর দিন। বর্ষা আসবে। ভাসবে খাল-বিল। ভাসবে চারদিক। পুকুরের বুকে আবার ভেসে ভেসে আসবে ওর প্রিয় তিতপুঁটি, ভেসে আসবে ওর চেনা রঙিন খলশে, টেংরা আর কই। ভেসে আসবে শোল মাছ তার ছোট ছোট লাল পোনা নিয়ে। পুকুরের এক কোণে থাকবে কচুরিপানা। আর এক কোণে সবুজ শেওলা। সে আবার আগের মতো মা হবে। সেই সব মাছের মা, পুকুর মা।


মন্তব্য