kalerkantho


পাপেটের রাজ্যে

পুতুল নাচের পুতুলগুলো পরিচিত পাপেট নামে। আর পাপেট শো কিংবা পুতুল নাচ তোমাদের ভারি পছন্দ। এখন তোমাদের পাপেটের অবাক করা দুনিয়া থেকে ঘুরিয়ে আনবেন জুবায়ের আহম্মেদ

২৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পাপেটের রাজ্যে

আমি অনেক ছোট তখন। মেলায় গিয়েছি বাবার সঙ্গে। বাহারি সব পুতুল নিয়ে বসেছিল দোকানিরা। হঠাত্ নজর গেল মেলার একটি অংশে। চারদিকে পর্দাঘেরা। কিন্তু ভেতর থেকে বেশ হৈচৈ শোনা যাচ্ছে। বাবাকে চেপে ধরতেই নিয়ে গেলেন সেখানে। দেখি সে এক এলাহি কাণ্ড! পুতুলেরা কথা বলছে। শুধু তা-ই নয়, তারা হাঁটছে, গান গাইছে। বাবা আমাকে বললেন, এটা হলো পুতুল নাচ। এখনো পহেলা বৈশাখে মেলায় কিংবা বিভিন্ন উত্সবে পুতুল নাচ দেখানো হয়। তোমাদের অনেকে নিশ্চয়ই মেলায় ঘুরতে গিয়ে পুতুল নাচ দেখেছও।

পাপেটের শুরু

ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম পুতুল নাচের চল শুরু করেন বিপিন পাল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে থাকতেন বিপিন। বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি নিয়ে পুতুল নাচ দেখাতেন। আগেরকার দিনে রামায়ণ কিংবা মহাভারতের গল্পগুলো বলানো হতো পাপেট দিয়ে। পরে আরো নানা ধরনের কাহিনিতে পাপেট ব্যবহার করা হতে থাকে।

ঢাকা পাপেট থিয়েটারে একদিন

ঢাকা পাপেট থিয়েটারের অন্দরমহলে ঢুকতেই দেখা হলো ‘মিথ্যাবাদী রাখাল বালক’ গল্পের সেই রাখাল বালকের সঙ্গে। আমি তো রীতিমতো অবাক! ছোটবেলায় বইতে পড়া মিথ্যাবাদী রাখাল বালকটি এখানে কী করছে? কথা বলার জন্য এগিয়ে গেলাম। একি! এ তো মানুষ নয়! একটি পাপেট। জানতে পারলাম—কাগজ, লোহা, কাঠ, প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পাপেটের শরীরটা। তারপর নানা রং দিয়ে রঙিন করে সাজানো হয়েছে তাকে। মাথায় লাগানো হয়েছে চুল। তোমাদের মতো রাখাল বালক পুতুলটিও জামা পরে থাকে। ফলে দূর থেকে দেখতে মানুষের মতোই লাগে। তবে ওর আমাদের মতো মস্তিষ্ক কিংবা বুদ্ধির বালাই নেই। ক্ষুধাও নেই। পাপেটশিল্পীরা গল্প অনুযায়ী যেভাবে নড়াচড়া করান, ঠিক সেভাবেই নড়ে। শিশুদের আনন্দ দেওয়া ও বড়দের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাই ওর কাজ।

কিভাবে বানানো হয়

পাপেট শো করতে হলে আগে একটি মজার গল্প ঠিক করতে হয়। তারপর ভয়েস বা কণ্ঠ রেকর্ডিংয়ের পালা। এ জন্য স্ক্রিপ্ট নিয়ে চলে যাওয়া হয় একটি স্টুডিওতে। হুবহু গল্প অনুযায়ী রেকর্ডিং হলো। এবার দরকার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। গানের কাজও করা হয়। সিডি করে ফেলা হয় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকসহ পুরো রেকর্ডিং। পাপেট শোর সময় এই রেকর্ড বাজানো হয়। কখনো কখনো অবশ্য শোর সময় মানুষও পাপেটের হয়ে কণ্ঠ দেয়। এরই মধ্যে শিল্পীরা লেগে যান পাপেট বানাতে। দ্রুতই বানিয়ে ফেলেন বাঘ, রাখাল বালক, কাঠুরিয়া ও পরিবুবুর মতো চরিত্র। এবার সব কিছু অনুযায়ী স্টেজ তৈরি করা হয়। তারপর টানা বেশ কয়েক দিন চলে পাপেট রিহার্সাল। কখনো কখনো দু-তিন মাস লেগে যায়। শুধু ঠিকঠাক অনুশীলনের ফলেই পাপেট শোর জন্য সব কিছু উপযোগী হয়ে ওঠে।

পাপেট শো করার জন্য টিম ওয়ার্ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ধরো, ভালো গল্প তৈরি হলো। কিন্তু গল্পের চরিত্র অনুযায়ী পাপেট বানানো হলো না। তাহলে কী হবে। পাপেটগুলো দিয়ে সুন্দরভাবে গল্পটি উপস্থাপন করা যাবে না। আবার গল্প, পাপেট তৈরি—সব কিছু ঠিকঠাক হলো কিন্তু অডিও রেকর্ডিং ভালো হলো না। এতে করেও কিন্তু পাপেট শোটি সুন্দর হবে না।

টিভিতে পাপেট শো

টিভিতে পাপেট শো দেখার মজাই আলাদা। তবে টিভিতে দেখা এই পাপেটগুলোর কোনো কোনোটা কিন্তু মাপেট। এখন সিসিমপুর ছোটদের ভারি পছন্দ। সিসিমপুরের হালুমকে তো তোমরা সবাই চেনো। মজার কথা, হালুম হলো মাপেট। মানুষ যখন পুতুলের ভেতরে ঢুকে—মানে গায়ে পুতুলের পোশাক পরে পুতুলের মতো করে সাজে, তখন তাকে মাপেট বলে। একসময় বিটিভিতে আজব দেশে অনুষ্ঠানে ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ নামের দুটি চরিত্র তৈরি করে পাপেট শো দেখাতেন মুস্তাফা মনোয়ার। ওটা ছিল দর্শকদের ভীষণ পছন্দের।

নানা দেশে পাপেট শো

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাপেট অত্যন্ত পুরনো শিল্পকলা হিসেবে পরিচিত। ইউরোপে পুতুল নাচের সবচেয়ে প্রাচীন ধারক জার্মানি। মধ্যযুগে সুতা পাপেটের আবির্ভাব। তখনকার দিনে যার নাম ইতালিতে ছিল পুলসিনেলো আর ফ্রান্সে পলসিনেল। মিসর, কোরিয়া, চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমারসহ কয়েকটি দেশে পুরনো ও আধুনিক ধারার পাপেট শো টিকে আছে আজও। প্রাচীন গ্রিস ও রোমে সুতা পাপেটের প্রচলন ছিল। কাবুকি নামে জাপানে এক ধরনের পুতুল নাচ বেশ জনপ্রিয়। ভিয়েতনামে ওয়াটার পাপেট শো আবার অন্য পাপেট শোগুলো থেকে একেবারেই আলাদা। এতে পাপেটগুলো নাচ দেখায় পানির মধ্যে।

২ ও ৩ ফেব্রুয়ারি পাপেট ফেস্টিভাল

আগামী ২ ও ৩ ফেব্রুয়ারি—অর্থাত্ শুক্র ও শনিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ‘ঢাকা পাপেট থিয়েটার’ বাংলাদেশ মহিলা সমিতিতে আয়োজন করতে যাচ্ছে চিলড্রেন ফেয়ার অ্যাট পাপেট ওয়ার্ল্ড নামের একটি পাপেট উত্সব। চাইলে তুমিও দেখে আসতে পারো পাপেট শো। মেলায় রোড পাপেট, হ্যান্ড পাপেট, শ্যাডো পাপেট, মাপেট ড্রামা ও থ্রেড পাপেট শোসহ আরো নানা আয়োজন রয়েছে। পাবে পাপেটের স্টলও। সেখান থেকে ছোট ছোট পাপেট কিনতে পারবে। চাইলে সহজ কিছুু পাপেট তৈরিও করতে পারবে ওখানে। এদিকে পাপেট গ্যালারিতে নানা ধরনের পাপেট দেখার সুযোগও মিলছে। টিকিটের দাম পড়বে ৫০০ ও ৩০০ টাকা। টিকিট সংগ্রহের জন্য যোগাযোগ করবে ০১৯১১৪৯৬৭০২—এই নম্বরে। ইভেন্টটি নিয়ে জানতে চাইলে ফেসবুক পেজে (.িভধপবনড়ড়শ.পড়স/বাবহঃং/২০৬৮৯৯৬২৭৬৬৬৫৭০৬/) ঢু মারতে পারো।

নিজে বানাই

তুমি চাইলে নিজেই বাসায় বসে খেলার জন্য ফিঙ্গার পাপেট বানাতে পারো সহজেই। হয়তো এটা পাপেটশিল্পীদের বানানো পুতুলের মতো এতটা নিখুঁত হবে না। তবে তোমার কাজ ঠিকই চলে যাবে। এটা বানানোর জন্য কাগজ, কাঁচি আর রঙিন কলম হলেই হবে। কাগজকে কাঁচি দিয়ে কেটে বিভিন্ন আকৃতির করে তার ওপর কলম দিয়ে বিড়াল, ইঁদুর, সিংহ, খরগোশ, বাঘ ইত্যাদির চেহারা এঁকে আঙুলে ঢুকিয়ে দাও। ব্যস, হয়ে গেল ফিঙ্গার পাপেট। আবার কাপড় কেটে তা সেলাই করেও আঙুলে ঢুকিয়ে খেলা দেখাতে পারো। এ ছাড়া বাজারে বিভিন্ন রকমারি ফিঙ্গার পাপেট কিনতে পাওয়া যায়। এগুলো হাতের আঙুলে পরে নিজে নিজে অথবা বন্ধুর সঙ্গেও খেলা করতে পারবে।

কত্ত রকম পাপেট

পাপেট কিন্তু অনেক ধরনের হয়। এই ধরো রড পাপেট, গ্লাভস পাপেট, শ্যাডো পাপেট, ফিঙ্গার পাপেট আরো কত কিছু!

রড পাপেট

রড পাপেট কিভাবে বানানো হয়, সে গল্পটি আমাকে শুনিয়েছেন ঢাকা পাপেট থিয়েটারের দলনেতা আর্থার ব্যাক্টিষ্ট মুক্ত। তোমরা নিশ্চয়ই মাটির মূর্তি দেখেছ! পাপেটশিল্পীও ঠিক তাঁর কল্পনার চরিত্রে মুখের আকার—অর্থাত্ ঠোঁট, চোখ, নাক ইত্যাদি প্রথমে মাটি দিয়ে করে থাকেন। মাটির ওপর কাগজ দিয়ে তৈরি করে ফেলেন আকৃতি। তারপর একটু একটু করে ছুরি বা কাঁচি দিয়ে কেটে ভেতরের মাটি ফেলে দেন। মাটি ফেলে দেওয়ার পর ওপরের খোলসে একটি গড়ন চলে আসে। এর পেছনের দিক দিয়ে মেরুদণ্ডের নিচে একটি রড লাগানো হয়। এই রডটি থাকে পাপেট পরিচালনাকারীর ডান হাতে। তিনি ডান হাত দিয়ে এই রডটির মাধ্যমে পাপেটের ঘাড় নাড়ানো, মাথা ঘোরানো, মুখ, চোখ, ঠোঁট ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করেন। পাপেটের দুই হাতে দুটি স্ট্রিং বা সুতা থাকে। পাপেট নিয়ন্ত্রণকারী বাঁ হাত দিয়ে এ দুটি ধরে নড়াচড়া করান।  পাপেটটিকে চরিত্র অনুযায়ী সাজসজ্জাও করা হয়।

গ্লাভস পাপেট

এটি গ্লাভসের মতো করে বানানো হয়। সাধারণত কাপড়, ফোমসহ নানা ধরনের নরম জিনিস দিয়ে তৈরি করা হয়। চালনার সময় হাতে পরে নিতে হয় গ্লাভস পাপেট।

ছায়াপুতুল বা শ্যাডো পাপেট

ছায়াপুতুল তৈরি করা হয় চামড়া, কাঠবোর্ড, টিন, প্লাস্টিক প্রভৃতি দিয়ে। একটি সাদা পর্দার ওপাশে থাকা পুতুলের নড়াচড়া পর্দার ওপর বিভিন্ন ছায়া—অর্থাত্ শ্যাডো তৈরি করে। এটিই শ্যাডো পাপেট। অবশ্য কখনো পুতুল ছাড়াই পর্দার গায়ে সাদা, কালো বা রঙিন রঙের ছায়া ফেলে এই শো করা হয়।

সুতা পাপেট

সুতার পুুতুল তৈরি করা হয় কাপড়, কাঠ, কাদা মাটি, লোহার তার ইত্যাদি দিয়ে। সুতা দিয়ে আটকানো থাকে পুতুলের হাত, পা, মাথা ও কোমর। পুতুল নাচিয়ের—অর্থাত্ শিল্পীর সামনে একটি কালো পর্দা টানানো থাকে। তিনি স্টেজের ওপাশ থেকে সুতা নাড়িয়ে এটি পরিচালনা করেন। গল্প অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পোশাকও পরানো হয় পাপেটটিকে।

ফিঙ্গার পাপেট

হাতের আঙুল দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে এর নাম ফিঙ্গার পাপেট। এর সঙ্গে অবশ্য গ্লাভস পাপেটের কিছুটা মিল পাবে। তবে ফিঙ্গার পাপেটে প্রতিটি আঙুলেই একটা করে আলাদা পাপেট থাকে। চাইলে তুমি নিজেও বানিয়ে নিতে পারো এই পাপেট।

কাজ করছে যারা

আমাদের দেশে অনেক প্রতিষ্ঠানই পাপেট নিয়ে কাজ করে। এর মধ্যে আছে পাপেট থিয়েটার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার অব বাংলাদেশ, ঢাকা পাপেট থিয়েটার, জলপুতুল, ইনভেন্টরস পাপেট। এদিকে বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী এই পাপেটশিল্প জনপ্রিয় করতে দারুণ ভূমিকা রেখেছেন চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর তত্ত্বাবধানে ‘এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ পাপেটশিল্পী সৃষ্টি, প্রশিক্ষণ, পাপেট প্রদর্শন—এমনই নানা কাজ করছে।


মন্তব্য