kalerkantho


সাগরের বিস্ময় মেন্টিস শ্রিম্প

অমর্ত্য গালিব চৌধুরী

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সাগরের বিস্ময় মেন্টিস শ্রিম্প

মেন্টিস শ্রিম্পের নাম শুনে ভুল করলে চলবে না। আদতে কিন্তু এরা শ্রিম্প বা চিংড়ি নয়। অবশ্য কাঁকড়া বা চিংড়ির দূর সম্পর্কের জ্ঞাতি মেন্টিসরা। বিচিত্র এই প্রাণীগুলোর কোনো কোনো প্রজাতির আছে হাতুড়ির মতো দুটি অঙ্গ, এগুলো দিয়ে শিকারকে পিষে ছাতু করে ফেলতে পারে নিমিষে। আঘাতের তীব্রতার সঙ্গে তুলনা করা যায় পয়েন্ট ২২ ক্যালিবার বুলেটের। এহেন আঘাত সামলে টিকে থাকার মতো ক্ষমতা কোনো শিকারের থাকার কথাও নয়।

মেন্টিস শ্রিম্পের প্রজাতির সংখ্যা শুনলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। দুনিয়ায় মোট ৫৫০ প্রজাতির মেন্টিস শ্রিম্প পাওয়া যায়। এগুলোর কোনোটা এক ইঞ্চি লম্বা, আবার কোনোটা এক ফুট। তবে প্রজাতিভেদ করা হয় মূলত শিকারের ধরনের ওপর ভিত্তি করে। কেউ বর্শার মতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে শিকার করে, আবার কেউ বা জোরে ‘ঘুষি’ মেরে। বর্শাওয়ালা মেন্টিস শ্রিম্পরা অবশ্য ‘ঘুষি’ মেরে যারা শিকার করে, তাদের তুলনায় কম ক্ষিপ্র। আবার এক ধরনের মেন্টিস শ্রিম্পের শরীরে ময়ূরের মতো ফোঁটা ফোঁটা চিহ্ন আছে। এগুলো পরিচিত ময়ূর মেন্টিস শ্রিম্প নামে।

সব থেকে ক্ষুরধার দৃষ্টিশক্তির প্রাণীদের মধ্যে মেন্টিস শ্রিম্প অন্যতম। প্রত্যেকটি চোখে এদের ১২টি করে ফটোরিসেপ্টর থাকে (মানুষের থাকে মাত্র তিনখানা)। এ কারণে এদের কাছে আশপাশের সব কিছু অনেক বেশি রঙিন আর আকর্ষক।

নানা রঙের বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে মেন্টিসরা একে অন্যের সঙ্গে ভাব আদান-প্রদান করে থাকে। এত কিচ্ছা-কাহিনি শুনে মনে হতেই পারে যে ওরা বুঝি পৃথিবীর অ্যাকোয়ারিয়ামগুলোতে নিয়মিত প্রদর্শিত হয়, আসলে ব্যাপারটা তেমন নয়। প্রচণ্ড শক্তিশালী এই প্রাণীগুলো কাচের দেয়াল ভেঙে ফেলতে পারে। এ ছাড়া গভীর সাগরের এই প্রাণীদের ধরাও খুব কঠিন। এদের বেশি পাওয়া যায় প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরে।

মেন্টিস শ্রিম্পদের অবাক করা স্বভাবের অন্ত নেই। এরা আবার গর্জনও করতে পারে। গভীর জলে নেমে এদের ওপর গবেষণা চালিয়ে জানা গেছে, মেন্টিসরা নিচু স্বরে গর্জন করে, বিশেষ করে ভোরে আর সন্ধ্যায়, যখন শিকারে বেরোয়। বিপরীত লিঙ্গের শ্রিম্পদের আকৃষ্ট করার জন্যও কখনো কখনো গর্জন করে।

এদের দেহ পুরু, শক্ত খোলসে মোড়া থাকে। দারুণ কার্যকর এই খোলস দেখে বিজ্ঞানীরা বিমান বানানোর মজবুত অথচ হালকা উপাদান কিভাবে বানানো যায়, তার একটি সূত্র পেয়েছেন। অদূরভবিষ্যতে মেন্টিস শ্রিম্পদের খোলসের উপাদানের আদলে বিমান বানানো হলে তাই অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আবার এরা পারিবারিক দিক দিয়ে অনেকটা আমাদের মতো। বেশির ভাগ মেন্টিস শ্রিম্প সারা জীবনের জন্য জুটি বাঁধে।  দুর্ঘটনায় বা বয়স হয়ে কারো মৃত্যু না হলে সচরাচর বিচ্ছিন্ন হয় না।

এত সব জানার পর মনে হতেই পারে, মেন্টিস শ্রিম্পরা এই হরেক রকমের বৈশিষ্ট্য কিভাবে অর্জন করল! সত্যি বলতে কী, আজকে ম্যান্টিস শ্রিম্পদের এই অবস্থানে আসার পেছনে আছে ৪০ কোটি বছরের বিবর্তন। একটি উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হবে এরা কতটা পুরনো। পৃথিবীতে ডায়নোসরের উদ্ভবই ঘটেছে ১৭ কোটি বছর আগে। ডায়নোসর বিলুপ্ত হয়ে গেছে; কিন্তু বহালতবিয়তে টিকে আছে সাগরের বিস্ময় মেন্টিস শ্রিম্প।



মন্তব্য