kalerkantho

যুদ্ধের গল্প

খ্যাপা দাসু

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



খ্যাপা দাসু

অঙ্কন : মানব

অরুণ কুমার বিশ্বাসনিত্যনতুন গল্প শোনাতে গিয়ে এখন দাদুকে হিমশিম খেতে হয়। তাও নিস্তার নেই। ময়না নাছোড়বান্দা।

 

‘ঠিক আছে বলো, কী গল্প শুনতে চাও আজ?’ ফোকলা দাঁতে মায়াবী হেসে দাদু বলেন।

 

‘যে গল্প আগে কখনো বলোনি।’ চটপট জবাব ময়নার।

 

‘তবে শোনো খ্যাপা দাসুর গল্প। একাত্তর সালের কথা। তখন বয়স আর কত হবে—এই ধরো দশ-বারো। দুনিয়ায় ওর আপন কেউ ছিল না। দাসুর স্বভাবটা ছিল একটু খ্যাপাটে গোছের। সারাক্ষণ আপন মনে থাকে, তবে কেউ তাকে চটালে আর রক্ষে নেই। আঁচড়ে-কামড়ে, ঢিল ছুড়ে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে।

 

‘বলো কী দাদু! ঘরদোর ছিল দাসুর? খেতই বা কোথায়?’ ময়নার চোখে রাজ্যের বিস্ময়।

 

‘কুঁড়েঘর একখানা ছিল। চারপাশে ভেন্নাপাতার বেড়া আর মাথার ওপর শুকনো খড়ের চাল। বৃষ্টির দিনে চাল চুইয়ে পানি পড়ত।’

 

‘সারা দিন বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। আপন মনে গায়। সবাই ভাবে ছেলেটার মাথা গেছে। তাই সবাই ডাকতে শুরু করল খ্যাপা দাসু নামে।

 

একদিন শুরু হলো যুদ্ধ। লাখ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।’

 

‘যুদ্ধ কাদের সঙ্গে হয়েছিল দাদু?’ প্রশ্ন ময়নার।

 

‘এক দল পাকিস্তানি দানবের সঙ্গে। ওরা আমাদের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করত। আমাদের দেশের ওপর চালাত লুটপাট। কেড়ে নিত আমাদের সব। যেন আমাদের জন্মই হয়েছে ওদের ফাইফরমাশ খাটার জন্য। আমাদের দাস বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল ওরা। কিন্তু যখন বাগে আনতে পারল না, হায়েনার মতো রাতের আঁধারে লাখ লাখ মানুষ মেরেছে।

 

তো একদিন বিকেলে সারা গাঁয়ে শোরগোল—যে যেখানে পারো পালাও। শহর থেকে মিলিটারি আসছে। আর অমনি ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। আমরা দেখলাম, সত্যিই মেঠো রাস্তা ধরে আসছে সারি সারি জলপাই রঙা মিলিটারি জিপ। একটানা বাজছে সাইরেন। মেশিনগান হাতে কয়েক শ পাকি সেনা আসছে গাঁয়ের দিকে।

 

সবার মাথায় লোহার টুপি, পরনে খাকি পোশাক, পায়ে ভারী বুট আর ঠোঁটে রক্তলোলুপ হায়েনার হাসি। ওদের হাসি শুনে আঁতকে ওঠে বুক, রক্ত হিম হয়ে যায়!’

 

‘তারপর, তারপর কী হলো! দাসু কী করল?’ অবাক চোখে তাকায় ময়না। ভয় পেয়েছে ভীষণ।

 

‘সেই কথাই তো বলছি। মাটির রাস্তায় ধুলার ঝড় উড়িয়ে ধেয়ে আসছে মিলিটারি জিপ, ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে মানুষ। কিন্তু খ্যাপা দাসুর হেলদোল নেই, নেই প্রাণের ভয়। সে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে দেখে জিপ গাড়ির সারি।

 

জিপ এসে থামল স্কুলঘরের সামনে। পাশেই গভীর খাল। খালে তখন টলটলা পানি। খাল পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা একটাই। শুকনো কচুরিপানার একটা বাঁধ। উঠবে কি উঠবে না—এ নিয়ে ওরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। আশপাশে কাউকে দেখে না তারা। দাসু তখন পায়ে পায়ে এগিয়ে আসে। পাকিস্তানি সেনার হাতে বন্দুক দেখেও ভড়কে যায়নি।

 

গাঁয়ের মানুষকে কিছুতেই মরতে দেবে না দাসু। নিজের জীবন দিয়ে হলেও তাদের বাঁচাবে। দাসুকে দেখে একজন এগিয়ে এলো। সে ছিল বাঙালি। তবে অন্য গ্রামের। পাকি সেনাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে এসেছে। লোকটা ছিল রাজাকার।’

 

‘রাজাকার কী দাদু?’

 

‘ওরা দেশের মানুষের সঙ্গে বেইমানি করেছে। ওরাও ওই পাকি হানাদারদের মতো খারাপ। যাকগে, তারপর কী হলো শোনো। মিচকে শয়তান লোকটা দাসুকে জিজ্ঞেস করল, খাল পার হওয়ার উপায় কী?

 

ব্যস, মওকা পেয়ে গেল দাসু। সে জানত ওই কচুরিপানার ভাসমান বাঁধে পায়ে হেঁটে গেলে সমস্যা নেই। তবে বাঁধের মাঝখানটা বেশ নাজুক। ভারী কিছু উঠলে নির্ঘাত দেবে যাবে।

 

দাসু বলল, সে আর এমন কী কঠিন! বাঁধের ওপর দিয়ে জিপ নিয়ে গেলেই হয়। এর আগেও কত জিপ এলো-গেল। কথাটা মনে ধরল মাথামোটা পাকি সেনাদের। দাসুর কথা মেনে কচুরিপানার বাঁধের ওপর দিয়ে অমনি চালিয়ে দিল জিপ। যা হওয়ার তাই হলো। মাঝপথে আসতেই আটখানা জিপ দেবে যায়। পরে কাত হয়ে গড়িয়ে পড়ে খালের পানিতে।’

 

‘তারপর কী হলো! বলো না দাদু!’ ময়নার চোখে হাসি।

 

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন দাদু। কেমন যেন মন খারাপ তার।’

 

গভীর খালে বেকায়দায় আটখানা জিপ পড়ে অনেক পাকি সেনাই সেদিন অক্কা পায়। কিন্তু খালের এ পারে দুটি জিপ রয়ে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে ওরা ভয়ে ঝড়ের বেগে উল্টো পথে ছুট লাগায়। কিন্তু যাওয়ার আগে বন্দুকের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়ে যায় আমাদের খ্যাপা দাসুর বুক। সেই থেকে খ্যাপা দাসু মরেও অমর। বেঁচে আছে আমাদের সবার হূদয়ে।’

 

সব শুনে একটু মন খারাপই হলো ময়নার। ভাবল, খ্যাপা দাসুকে একটিবার যদি দেখতে পেত!


 


মন্তব্য