kalerkantho

চুলোয় যাই, চল!

নাসরীন মুস্তাফা   

২০ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



চুলোয় যাই, চল!

আঁকা: মাসুম

চুলো মানে কী? যার ভেতরে আগুন জ্বলে, সেই তাপে রান্না হয়। তাহলে বুবু কেন বলেছিল, চুলোয় যা?

কথাটা বলেছে রবি।

ছোট খালার বড় ছেলের মেজো চাচার সেজো মেয়ের একমাত্র ছেলে। স্কুল ছুটি হলেই চলে আসে বেড়াতে। আমরা সবাই খুশি হয়ে উঠি। রবিও।

রবি ঠোঁট ফুলিয়ে জানতে চায়, কী করব চুলোয় গিয়ে? আমি কি নান্না করতে পারি?

আসল ঘটনা হলো ভরদুপুরে রবি বাইরে যাবে বলে জেদ করছিল। ওকে থামাতে বুবু বলেছে, বাইরে যাবে না রবি!

রবি তখন বলেছে, তাহলে আমি কুতায় যাব?

তখন বুবু আর কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে বলেছে, চুলোয় যা।

রবি চোখ পাকিয়ে বলে, আমি চুলোয় যাব। আমি চুলোয় চুলে যাব। এত্তু পলেই যাব।

আমি আর তাপু রবির দুই হাত ধরে দখল নিই। তাপু বলে, আমরাও চুলোয় যাব।

চল!

তার আগে চল, সব কিছু গুছিয়ে নিই। রবিও জানে, বেড়াতে যাওয়ার আগে গোছগাছ করতে হয়। চুলে যাওয়ার সময়ও তো গোছগাছ করতে হতে পারে।

কী কী নেওয়া হলো? পেনসিল, রুলার, খাবার গরম রাখার অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, শক্ত কাগজে বানানো পিত্জার বাক্সটা, মোটা টেপ, পুরু কালো কাগজ, খবরের কাগজ। মা চুলো থেকে গরম পাত্র নামাতে মোটা কাপড়ের দস্তানা পরে নেন হাতে, তাও নিলাম।

চুলে গেলেও খেতে হয়। তাই ওয়ান টাইম ব্যবহারের থালা, বিস্কুট আর বড়সড় চকোলেট বার নিতে হলো। রবির প্রিয় আলুভাজির জন্য তিনটি আলু। ছুরিও নিলাম। এই গোলগাল আছোলা আলু দেখে রবি খুব একটা ভরসা পেল বলে মনে হলো না। কিছু বললও না।

তাপু একটি থার্মোমিটারও নিল। বলল, গরম মাপতে হয় থার্মোমিটার দিয়ে। তাই না?

বুবুর মুখটায় ছায়া পড়ে। বলে, মাফ চাইছি। ‘চুলোয় যা’ তো একটা বাগধারা। এর মানেটা ভালো না। আমার বলা উচিত হয়নি। ওরে, তোদের কোথাও যেতে হবে না। রবির যদি জ্বর হয়!

হতে পারে। রবির জ্বর হতে পারে। ১০১, ১০২, ২৫০! তাপু এইটুকু বলে দরজা খুলল। আমাদের এখন চুলে যেতে হবে।

আমরা গেলাম ছাদে। ঝকঝকে রোদ আকাশে। সিঁড়িঘরের পাশে লম্বা হয়ে ছায়া পড়েছে। ওখানে বসলাম পাটি পেতে। শীতল পাটিটা সঙ্গে নিয়েছিলাম একেবারে শেষে। কোথায় না কোথায় ঘুমাতে হয়, সেই জন্য।

পিত্জা বাক্সটাকে বের করি। এর চারপাশ থেকে সমান এক ইঞ্চি জায়গা মেপে নিয়ে রুলারের পাশে পেনসিলে টান দিই। ছুরি দিয়ে দাগ মতো কেটে নিলাম তিন পাশ দিয়ে। বাক্সের ভেতর গর্ত মতো জায়গা হলো। একপাশ কাটলাম না। সে পাশটা তাপু এমনভাবে ভাঁজ করল, যাতে এটা সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। ওটার গায়ে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল সেঁটে দেওয়া হলো। তাপু টেপ দিয়ে আরো আঁটসাঁট করে। তারপর পিত্জা বাক্সের নিচে কালো কাগজ লাগিয়ে দেয়। টেপ দিয়ে পিত্জা বাক্সের সব কটা ধার বুজে দেয়। খবরের কাগজ মুড়িয়ে চারপাশের ধার আটকায়।

এত সব খাটাখাটুনি করে আমরা দম নিলাম। রবি মুখ শুকনো করে বলে, ‘খিদে পেয়েছে’।

বিস্কুট আর চকোলেটবার এগিয়ে দিই। তাপু বলে, এভাবে কেন খাবে? চুলোয় গেলে এভাবে খেতে নেই।

তাপু হাসে মুচকি হাসি। তিনজনের জন্য তিনটি বিস্কুট থালায় রাখে। বিস্কুটের ওপর টুকরো চকোলেট। রান্না হবে।

রবি তো অবাক! এটা কি চুলো নাকি?

এটা চুলো। রবির চুলো।

রবির মুখে আলো নাচে। হাসি ফোটে। বলে, আমার চুলো?

তুমি রবি, তোমার চুলো। ওই যে আকাশে সূর্য। ওর নামও রবি। আকাশভরা রবির আলো। সেই আলোতে শক্তি আছে। এর নাম তাপ শক্তি। এই শক্তি গরম করতে পারে। যেখানে পড়বে, সেখানটা গরম হবে। আলো বারবার কোন তলে ফেলে ছড়িয়ে পড়তে দিলে শক্তিটা অনেকগুণ বাড়ানো যায়। তখন গরম হওয়ার মাত্রাও বাড়ে। আর তাই অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল মুড়ে দিয়েছি। এ রবির আলোকে ছড়িয়ে দেবে।

বাহ্!

বাক্সের ভেতরের চারপাশ ভালোভাবে মুড়ে দিয়েছি, যাতে বাতাস ঢুকে বাক্সের গরম কমিয়ে দিতে না পারে। মুড়ে দেওয়া খবরের কাগজ আর কালো কাগজ দিয়েছি তাপ আটকানোর জন্য। কালো রং তাপ আটকে রাখতে পারে সবচেয়ে বেশি।

সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত রবির তাপশক্তি বেশি থাকে। তখন রান্না হয় জলদি। বাসাবাড়ির চুলোর মতো অত জলদি গরম হয় না রবির চুলো। তাতে কী? একটু দেরি হলেও হয় তো!

চকোলেট কী সুন্দর গলে গেছে গরম গরম বিস্কুটের ওপর! সত্যি বলছি, এত মজার খাবার আমি এর আগে খাইনি। তাপুও না।

রবিও না।  

আর তাই রবির ইচ্ছায়ই বুবুকে ডেকে আনতে হলো। রবির চুলোয় আবারও বিস্কুট-চকোলেট রান্না করা হলো। বুবু খেয়ে কী বলবে, চোখ বুজে শুধুই বলছিল, মজা মজা!

এরপর আমরা পিকনিক করলাম। বুবু ছুরি দিয়ে আলু ছিলে কেটে দিল। চুলোয় বসিয়ে আমরা গান গাইতে শুরু করলাম। ‘আকাশভরা সূর্য তারা’ নামের গানটা রবিঠাকুর যা ভালো লিখেছিলেন! বুবু গায়ও খুব ভালো। ওর সঙ্গে আমরাও গাইলাম। গাইতে গাইতে আলু রান্না হয়ে গেল। আহা, সে কী স্বাদ!

সেই স্বাদ চাইলেই আমরা চুলোয় চলে যাই। রবির চুলোয়। রান্না করি। এই রান্নায় গ্যাস পোড়ে না। বিদ্যুত্ খরচ হয় না। সত্যি বলতে কি, পরিবেশের কোনো ক্ষতিই হয় না। কী মজা, তাই না!


মন্তব্য