kalerkantho


গল্প

পলাশপুরে এলিয়েন

রিদওয়ান আক্রাম

৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



পলাশপুরে এলিয়েন

অঙ্কন : মানব

অঙ্কটা কোনোভাবেই মিলছে না। কলমের ক্লিপ চিবাতে চিবাতে ভাবছিল রাজু।

এমন সময় পিঠে খোঁচা। পেছনে তাকাল। কলম দিয়ে খুঁচিয়ে হাসছে রিন্টু, ‘কিরে পোটলা, খবর শুনেছিস। গতকাল রাতে তো গ্রামে একটা এলিয়েন এসেছে। ’

রাজুদের গ্রামের নাম পলাশপুর। চুপচাপ নিরিবিলি একটা গ্রাম। সব কিছু যেন পাঠ্য বইগুলোর মতো সরল-স্বাভাবিক। এমন গ্রামে এলিয়েন মানে ভিনগ্রহের বাসিন্দা হাজির! ভাবতেই হোঁচট খেল রাজু।

‘এলিয়েনটা উঠেছে গাবলুদের বাড়িতে।

’ বলল রিন্টু।

গাবলুর ভালো নাম গালিব। রিন্টুর বদ-অভ্যাস হচ্ছে বন্ধুদের নাম বিকৃত করা। এ নিয়ে প্রায়ই বকা শোনে। কিন্তু আপাতত ওসব নিয়ে ভাবছে না রাজু। গ্রামে এলিয়েন এসেছে এটাই হচ্ছে বড় খবর।

অঙ্ক স্যার চলে যেতেই ক্লাসরুমে গালিবকে খুেঁজ বের করল রাজু। ক্লাসের সবাই ওকে ঘিরে রেখেছে। বেশ ভাব বেড়েছে গালিবটার। এলিয়েনটা ওদের বাড়িতেই উঠেছে কিনা। সবাই এখন গালিবের সঙ্গে  খাতির জমানোর চেষ্টা করছে। যদি এলিয়েনটাকে একটু কাছ থেকে দেখা যায়? গালিবও সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে। সবার কাছ থেকে এটা-ওটা নিচ্ছে। এই যেমন নতুন বের হওয়া কমিকসটা প্রথমেই পড়তে দেওয়া হলো তাকে, কেউ দিল টিফিনের ভাগ, কেউ বা গল্পের বই। রাজুর কাছে একটা পুরনো ডাকটিকিট আছে। ওটা কয়েক দিন ধরে চাইছিল গালিব। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেটাই ওর হাতে তুলে দিল রাজু। ঠিক হলো যারা উপহার দিয়েছে স্কুল ছুটির পর  তাদের বাসায় নিয়ে যাবে গালিব।  

গালিবের দাদা আতিফ চৌধুরী পলাশপুর গ্রামের চেয়ারম্যান। তাঁর বাড়ির সামনে উত্সুক গ্রামবাসীর উপচে পড়া ভিড়। হৈ-হুল্লোড় দেখে খেপেই গেলেন গালিবের দাদা, ‘আরে কী ব্যাপার, তোমরা কি লোকটার লগে কথা কইতে দিবা না নাকি?’

‘লোকটা কেন? বলা উচিত এলিয়েনটা’ ভাবল রাজু। দাদার কথায় কাজ হলো। সবাই চুপ।

এলিয়েনটা মানুষের মতোই। দুটি হাত, দুটি পা, মাথাও একটি। চোখ, নাক, কান মিলিয়ে মানুষই বলা চলে। কিন্তু এমন কেন? সিনেমায়, বইয়ে কত রকমের এলিয়েনের ছবি দেখেছে রাজুরা। একটাও তো মানুষের মতো দেখতে না।

‘তা মিয়া, কও তোমার দেশের বাড়ি কই? আমাগো গেরামে আইলা ক্যামনে?’

‘জি, সেভাবে তো আমাদের কোনো গ্রাম নেই। দেশও নেই। আমরা যেখানে থাকি সেটার পুরোটাই আমাদের বাড়ি। ’

‘কও কী? তাইলে তো মহা ঝামেলা। বাড়িঘর আলাদা না থাকলে ভাগ-বাটোয়ারা হয় ক্যামনে?’

‘আলাদা দেশই নেই, আবার বাড়ি। এ জন্য আমাদের মধ্যে ঝগড়াও হয় না। ’

‘তা তোমার দেশের নাম কী?’

‘খিংখব্যকুরুঘানিতাকুব। ’

অদ্ভুত নামটা কেউ আর দ্বিতীয়বার শুনতে চাইল না।

‘তুমি আমগো গেরামে আইলা ক্যামনে?’

‘কিভাবে আবার! স্পেসশিপে করে। তবে আপনাদের গ্রামে কেন, এই গ্রহেই আসার ইচ্ছে ছিল না। এখানকার বাসিন্দারা বড়ই ঝগড়াটে। আমি যাচ্ছিলাম ফিংকত্যঝুতাখানিপাকুব গ্রহে, বরযাত্রী হয়ে। পথে একটু বিরতি দিতেই আপনার গ্রামে থামতে হলো। ’

‘তা তোমার প্লেনটা কোথায়? এত বড় উড়োজাহাজ তো কারো চোখে পড়ল না!’

‘স্পেসশিপটাকে অদৃশ্য করে রেখেছি। এখানে তো আবার গরু-ছাগল অনেক। ওটাকে না আবার গুঁতিয়ে নষ্ট করে ফেলে। কদিন আগেই কিনেছি। এখন আবার গুঁতা খেয়ে দাগ পড়ে গেলে কী বিচ্ছিরি একটা ব্যাপার হবে বলুন!’

‘তা ঠিক। গরু তো আর উড়োজাহাজ বুঝব না। দুই একটা গুঁতা মারতেও পারে। ’

রাজুরা এসব গালগপ্পে মজা পাচ্ছিল না। এলিয়েন মানে তার বিশেষ ক্ষমতা থাকা চাই। শেষমেশ রাজু বলেই বসল, ‘আচ্ছা এলিয়েন ভাই, আপনার বিশেষ ক্ষমতা কী?’

‘এই হচ্ছে মানুষদের নিয়ে সমস্যা। সহজে কিছু বিশ্বাস করতে চায় না। খালি প্রমাণ চায়। আচ্ছা ঠিক আছে, দাঁড়াও একটা মজার জিনিস দেখাচ্ছি। ’ এই বলে পকেটে হাত দিয়ে কী যেন খুঁজতে লাগল এলিয়েনটা। ‘আরে এই পকেটেই তো রেখেছিলাম। গেল কোথায়?’

‘কী খুঁজতাছ?’

গালিবের দাদার প্রশ্নের উত্তরে এলিয়েনটা বলল, ‘ম্যাসগান। এটা দিয়ে যেকোনো জিনিসের ভর কমিয়ে-বাড়িয়ে দেওয়া যায়। এই ধরুন বিশাল ওজনের কোনো ট্রাকের ওপর এটা তাক করে ট্রিগার চাপলেই ওটার ওজন সঙ্গে সঙ্গে তুলার মতো হয়ে যাবে। একটা বাচ্চাও ১০ টনি ট্রাক টেনে নিয়ে যেতে পারবে। আরে কোথায় যে রাখলাম ওটা!’

হঠাত্ বৈঠকখানার বাইরে হট্টগোল। রাজুরা এক ছুটে বাইরে গেল। উঠানের মধ্যে বিশাল এক সাদা রঙের অ্যাম্বুল্যান্স হাজির। সাদা পোশাক পরা কয়েকজন লোক সোজা বৈঠকখানায় ঢুকল। কাউকে পাত্তা না দিয়েই লোকটার দিকে এগিয়ে গেল ওরা। শুধু জানাল, ওর নাকি মাথায় সমস্যা। মানসিক নিরাময় কেন্দ্র থেকে পালিয়েছে। তাকে নিয়ে যেতেই এসেছে তারা। কিন্তু এলিয়েনটা কিছুতেই যাবে না। বারবার বলছে, ‘আমার নাম রি। অনেক দূরের গ্রহে থাকি। ওরা আমাকে জোর করে আটকে রাখবে। আমাকে নিয়ে গবেষণা করতে চায়। আমাকে বাঁচান আপনারা!’

কে শোনে কার কথা? অ্যাম্বুল্যান্সে আসা লোকগুলো এক প্রকার জোর করেই নিয়ে গেল এলিয়েন কিংবা মানুষটাকে।

রাজুদের গ্রামে যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল তা যেন হুট করেই শেষ হয়ে গেল। আবার সেই একঘেয়ে জীবন। স্কুলের ক্লাস। লসাগুর অঙ্ক মিলছে না। পেনসিল কামড়ে অঙ্কের উত্তর নিয়ে আগের মতোই ভাবছে রাজু। সামনে রাশভারি অঙ্ক স্যার। এমন সময় পিঠে খোঁচা। তাকিয়ে দেখে রিন্টুর হাতে খেলনা পিস্তলের মতো একটা বস্তু।

‘কোথায় পেলি ওটা?

‘বাঁশঝাড়ের নিচে। দাঁড়া, মজা দেখাচ্ছি। ’ এই বলে পিস্তলের ট্রিগার চাপল অঙ্ক স্যারের দিকে তাক করে। চোখের পলকে স্যার যেন পাখির মতো হয়ে গেলেন। ধীরে ধীরে শূন্যে ভাসতে লাগলেন। একটু ভাসেন তো আবার পড়েন। স্যার যেন আগাগোড়া একটা তুলার মানুষ। আর্তচিত্কার করলেন, ‘ওরে, কে আছিস? ধর আমাকে। আমি উড়ে যাচ্ছি রে! আমার ওজন নাই রে!’ রাজু অবাক। রিন্টু চোখ টিপে বলল, ‘ওটা সত্যিই এলিয়েন ছিল রে!’

রাজু বলল, ‘তাকে তো বাঁচানো উচিত আমাদের। শত হলেও আমাদের অতিথি ছিল। ’

রিন্টু বলল, ‘হুম, ঠিক। কিন্তু কী করে বাঁচাব। আমরা তো ছোট। ’

রিন্টুর হাতের যন্ত্রটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল রাজু। বলল, ‘আমাদের হাতে এখন এলিয়েনের ক্ষমতা

আছে না!’


মন্তব্য