kalerkantho


ফিচার

রায়ার ললিপপ দাদু

আহমেদ রিয়াজ

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



রায়ার ললিপপ দাদু

অঙ্কন : মানব

দাদুকে দেখে তো রায়া অবাক। চোখ দুটো কপালে তুলে বলল, ‘দাদু, আপনি!’

দাদু মুচকি হেসে বললেন, ‘কেন, আসতে নিষেধ আছে নাকি?’

রায়া বলল, ‘সেটা তো বলিনি।

হুট করে চলে এলেন দেখে বললাম। ’

‘খুশি হওনি?’

‘খু-উ-ব। ’

রায়ার চোখ দুটো বুজে গেল। দেখে এত মায়া হলো দাদুর! রায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন, ‘তোমাকে দেখতে এলাম। ’

আরো অবাক রায়া। ‘আমাকে! কেন?’

‘কারণ অবশ্য একটা আছে। আজ জাতীয় শিশু দিবস, জানো নিশ্চয়ই। শিশু দিবসে আমার সবচেয়ে প্রিয় শিশুটিকে দেখতে আসব না, তাই কি হয়?’

শিশু দিবসের কথা রায়া জানে।

এদিন সরকারি ছুটি। আজ বাবারও ছুটি।

‘আচ্ছা দাদু, বাংলাদেশের মতো সব দেশেই কি শিশু দিবস আছে?’

‘আছে তো। দুনিয়ার অনেক দেশে বেশ ঘটা করে শিশু দিবস পালিত হয়। অনেক মজা হয়। যেমন ধরো অস্ট্রেলিয়ার কথা। অস্ট্রেলিয়ায় শিশু দিবস নয়, পালিত হয় শিশু সপ্তাহ। ’

‘শিশু সপ্তাহ!’ রায়ার চোখ আবার কপালে।

দাদু বললেন, ‘তবে আর বলছি কী। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের পুরোটাই ওরা শিশু সপ্তাহ হিসেবে পালন করে। যদিও সে দেশে ১৯৫৪ সাল থেকেই শিশু দিবস পালিত হচ্ছিল, তবে শিশু সপ্তাহ পালিত হচ্ছে ১৯৭৭ সাল থেকে। পুরো সপ্তাহ শিশুদের যত্ন-আত্তি করার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও প্রাদেশিক সরকার। একটা সময় অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময় শিশু দিবস পালিত হতো। তবে ১৯৮৪ সাল থেকে পুরো অস্ট্রেলিয়া একই সময়ে শিশু সপ্তাহ ও শিশু দিবস পালন করে। ওদিকে বুলগেরিয়ায় সচেতনতা তৈরির কাণ্ডটা আরো মজার। ওই দেশে শিশু দিবস পালিত হয় পয়লা জুন। এদিন পরিবারের কাছ থেকে বিশেষ আদর আর ভালোবাসা পায় শিশুরা। জন্মদিনের মতো বিভিন্ন উপহারও পায়। ’

মুখ খুলল রায়া, ‘বলছেন কী দাদু, বেশ মজার তো!’

দাদু বললেন, ‘আরো মজা আছে। দিনের বেলায় হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ি চালাতে শুনেছ?’

রায়া মাথা নাড়ল, ‘নাহ্। ’

দাদু বললেন, ‘বুলগেরিয়ায় কিন্তু দিন-রাত সব সময় হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ি চালানোর নিয়ম। শিশুদের আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার জন্যই এ নিয়মটা চালু হয়। অনেক আগে শুধু শিশু দিবসে নিয়মটা ছিল। এখন সারা বছর। বুলগেরিয়ায় শিশু দিবস পালিত হয়ে আসছে ১৯২৫ সাল থেকে। ’

রায়া বলল, ‘বাহ্! শিশু দিবসের এত মজার কাণ্ড-কারখানার কথা তো জানতাম না!’

দাদু বললেন, ‘কানাডায় যেদিন শিশু সুরক্ষা আইন নামে একটি আইন পাস হলো, সেই দিনটিকেই ওরা শিশু দিবস পালন করে। তারিখটা হচ্ছে ২০ নভেম্বর। চিলিতে শিশু দিবসের দিন শিশুদের খেলনা উপহার দেওয়ার রেওয়াজ চালু আছে। ওরা শিশু দিবস পালন করে আগস্টের দ্বিতীয় রবিবার। চীনের শিশুরাও শিশু দিবসে উপহার পায়। তবে উপহারটা দেয় সরকার। সব শিশুকে পয়লা জুন শিশু দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়ে সরকার উপহার পাঠায়। তবে সেটা যাদের বয়স ১৪ বছর পর্যন্ত তাদের জন্য। চীনে শিশু দিবস পালন শুরু ১৯৪৯ সাল থেকে। ওই সময় শিশু দিবসে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আধাবেলার পর ছুটি হয়ে যেত। ১৯৫৬ সাল থেকে পুরো দিনের ছুটির রেওয়াজ চালু হয়। এদিন কোনো প্রবেশমূল্য ছাড়াই চীনের ঐতিহ্যবাহী রাজকীয় প্রাসাদ ফরবিডেন সিটির সদর দরজা সব শিশুর জন্য খোলা থাকে। ইসরায়েলের শিশু দিবসে কী হয় জানো?’

শিশু দিবসের গল্প শুনতে বেশ লাগছিল রায়ার। জানতে চাইল, ‘কী হয়?’

দাদু বললেন, ‘ইসরায়েলের বড়রা এদিন শিশুদের মতো সাজগোজ করে, আর শিশুরা বড়দের মতো। ভেবে দেখো, তুমি আমার মতো সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছ আর আমি তোমার মতো ললিপপ মুখে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ’

বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন দাদু।

রায়া বলল, ‘তোমারও ললিপপ প্রিয়, দাদু? জানতাম না তো?’

দাদু লাজুক হাসি দিলেন। বললেন, ‘কী করব বলো, দাঁত তো নেই যে চিবিয়ে খাব। তাই মাঝে মাঝে লুকিয়ে লুকিয়ে ললিপপ...’

পুরোটা বলতে দিল না রায়া। চট করে একটা ললিপপ দিল দাদুর হাতে। বলল, ‘এটা তোমার জন্য। ’

দাদু খুশিতে আটখানা। ললিপপটা পাঞ্জাবির পকেটে রেখে দিয়ে বললেন, ‘পরে খাব। আগে আরো কিছু দেশের কথা বলে নিই। জাপানে শিশু দিবস পালিত হয় বছরে দুই দিন। একদিন ছেলেশিশু দিবস, আরেক দিন মেয়েশিশু দিবস। মেয়েশিশু দিবসের দিন আবার পুতুল উৎসবও হয়। মার্চের ৩ তারিখ মেয়েশিশু দিবস আর মার্চের ৫ তারিখ ছেলেশিশু দিবস। দক্ষিণ কোরিয়ায় শিশু দিবস পালিত হয় ৫ মে। সরকারি ছুটির দিন। মা-বাবারা শিশুদের সঙ্গে সময় কাটান। শিশুদের নিয়ে ঘুরতে বের হন। চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, শিশু পার্কগুলো এদিন শিশুদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে। ওদিকে মালদ্বীপেও বেশ ঘটা করে শিশু দিবস পালিত হয়। স্কুলে স্কুলে নানা রকম খেলা ও প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকে, যাতে শিশুরা তাদের জন্য নির্দিষ্ট দিবসটি পালনের কথা মনে রাখে সারা জীবন। মেক্সিকোতেও একইভাবে শিশু দিবস পালন করা হয়; যদিও মালদ্বীপের মতো অতটা ঘটা করে নয়। থাইল্যান্ডের শিশু দিবসকে ওরা বলে ওয়ান ডেক। ওয়ান ডেক পালিত হচ্ছে ১৯৫৫ সাল থেকে জানুয়ারির দ্বিতীয় শনিবার। থাইল্যান্ডের রাজা এদিন শিশুদের জন্য উপদেশমূলক ভাষণ দেন। সরকারি বাসভবন, সংসদ ভবন, বিভিন্ন মিলিটারি সংস্থাসহ শিশুদের ঘুরে বেড়ানোর জন্য এদিন থাইল্যান্ডের বিভিন্ন সরকারি অফিস খোলা থাকে। রাজকীয় থাই এয়ারফোর্স এদিন বিভিন্ন এয়ারক্রাফট দেখার জন্য শিশুদের বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানায়। আমন্ত্রিত শিশুদের বই, খাতা, পেনসিলও উপহার দেয়। চিড়িয়াখানা খুলে দেওয়া হয় প্রবেশমূল্য ছাড়াই। বাসে চড়তেও শিশুদের ভাড়া দিতে হয় না এ দিনটায়। থাইদের কথা হচ্ছে, শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। বুদ্ধিমান শিশুরা দেশের সম্পদ। ’

একনাগাড়ে বলে হাঁপিয়ে গেলেন দাদু। থেমে একটু দম নিলেন। তারপর শুরু করলেন আবার, ‘ভারতের শিশু দিবস পালিত হয় চাচা নেহরুর জন্মদিনে। চাচা নেহরুর মানে হচ্ছে জওহরলাল নেহরু। ১৪ নভেম্বর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরুর জন্মদিন। ১৯৬৪ সাল থেকে পালিত শিশু দিবসে ভারতের সরকারি ছুটির দিন। স্কুল, বিভিন্ন অফিস ও প্রতিষ্ঠান নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে শিশু দিবসে। নানা জায়গায় শিশু চলচ্চিত্র দেখানোরও উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় সরকার। অন্যদিকে পাকিস্তানের শিশু দিবস পালিত হয় শোক পালনের মধ্য দিয়ে। ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুলে ১৫০ জন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মারা যায়। তাদের স্মরণে পালিত হয় শিশু দিবস। এর আগে অবশ্য ১ জুন শিশু দিবস পালিত হতো। জানো নিশ্চয়ই, পাকিস্তানের কাছ থেকেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের জাতির পিতা। তাঁর জন্মদিনটাই এ দেশের জাতীয় শিশু দিবস। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে কিন্তু জাতীয় শিশু দিবস ছিল না। ১৯৯৭ সাল থেকে ১৭ মার্চ পালিত হচ্ছে জাতীয় শিশু দিবস। বঙ্গবন্ধু কিন্তু শিশু বয়স থেকেই ছিলেন পরোপকারী। অসহায় দরিদ্র শিশুদের জন্য কাজ করেছেন স্কুলে পড়া অবস্থায়ই। সবচেয়ে বড় কথা, এ দেশের শিশুদের জন্য তিনি একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন। তবে এ দেশে শিশু দিবসটি আরো জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করা দরকার। আরো মজা, আরো আনন্দ। একেবারে শিশুদের মতো করে। শিশুরা যা পছন্দ করে, যা খেতে ভালোবাসে—সব এদিন শিশুরা পাবে। নিজেদের ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে পারবে। ’

হঠাৎ রায়া খেয়াল করল দাদুর পেছনে কিছু একটা। দাদুর সঙ্গে গল্প করতে করতে এতক্ষণ খেয়ালই করেনি। বলল, ‘ওটা কী, দাদু?’

হাসতে হাসতে দাদু বললেন, ‘তোমার প্রিয় একটা জিনিস। বলো তো কী?’

অত ভাবতে বয়েই গেছে রায়ার। বলল, ‘জানি না। ’

‘মিষ্টি। তুমি তো মিষ্টি খেতে পছন্দ করো। তাই তোমার জন্য এনেছি। এবার আমার সামনে বসে বসে মিষ্টি খাও। ’

বলেই রায়ার হাতে মিষ্টির প্যাকেটটা দিলেন দাদু।

আরে! দাদুর পেছনে আরেকটা কী যেন। জানতে চাইল, ‘ওটা কী, দাদু?’

মুখটা ভার করে দাদু বললেন, ‘নাহ্, কিছুই আড়ালে রাখা যায় না দেখছি। ’

তারপর ফিক করে হেসে একটা পুুতুল তুলে দিলেন রায়ার হাতে। পুতুল পেয়ে রায়া আরো খুশি।

দাদু বললেন, ‘আরো আছে। ’

আরেকটা প্যাকেট দিলেন রায়ার হাতে। রায়া বলল, ‘এটা কী?’

‘বই। ’

‘বই!’

‘হুম্, বই। শিশুরা বই পড়বে। নিজেকে জানবে। সমাজকে জানবে। দেশকে জানবে। দুনিয়া জানবে। বই না পড়ে জানবে কেমন করে?’

এবার যেন রায়ার খুশি উপচে পড়ছে। বই পড়তে ওর দারুণ লাগে। খুশিতে সেই আগের মতো চোখ দুটো বুজে গেল ওর। বলল, ‘বাহ্, এবারের শিশু দিবসটা তো বেশ মজার দেখছি। ’

আর দাদু? রায়ার দেওয়া ললিপপটা মুখে পুরে বললেন, ‘আওয়ার আছেও অ-য়ে-ক বদার। ’

মানে ‘আমার কাছেও অনেক মজার। ’

ললিপপ মুখে দিয়ে কথা বললে কি আর বোঝা যায়? দাদুটা কবে যে এটা বুঝবে কে জানে।

 


মন্তব্য