kalerkantho

গল্প

পেটুক ভূত

আহমেদ সাব্বির

১০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পেটুক ভূত

অঙ্কন : মানব

সন্ধ্যা হতেই নিঝুমপুর গ্রামের সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। শিয়ালের হুক্কাহুয়া, বাগডাশের গোঁ গোঁ কিংবা পেঁচার কান্না তাদের কানে পৌঁছায় না। সেদিনও নিঝুমপুরে মানুষ গভীর রাতে ঘুমে মগ্ন। ঠিক তখনই গাঁয়ের উত্তর দিকে প্রচণ্ড জোরে ধপ্পাস শব্দ। বিকট সেই শব্দে গ্রামবাসী জেগে উঠল। এমন শব্দ কেউ আগে শোনেনি। আতঙ্কে সবাই বেরিয়ে এলো। কারো হাতে বল্লম, কারো হাতে খন্তা। সবাই হৈহৈ করতে করতে ছুটে গেল উত্তরের ঝিলে।

সেদিন ছিল পূর্ণিমা রাত। রুপালি থৈথৈ জোছনায় নিঝুমপুর ভেসে যেতে লাগল।

গ্রামবাসী জোছনার আলোয় দলবেঁধে ছুটে এলো। উত্তরের ঝিলে, ধানক্ষেতে, বাঁশঝাড়ে তন্নতন্ন করে ধপ্পাস শব্দের উৎস খোঁজা হলো। কিছুই পাওয়া গেল না। অথচ শুনে মনে হয়েছিল আকাশ ভেঙে পড়েছে। গ্রামবাসী হতাশ। ঢুলুঢুলু চোখে সবাই ফিরে গেল নিজ ঘরে। ঢলে পড়ল বিছানায়।

আসলে ওই দিন রাতে ভূতরাজ্য থেকে পেটুক ভূত গপগপাংকে পৃথিবীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ভূতের রাজা কিপ্টং পেটুক ভূতের খাবার জোগান দিতে পারছিল না। দিন দিন রাজ্যের সব খাবার একাই সাবাড় করে ফেলছিল। ওর কারণে রাজ্যে খাদ্য সংকট দেখা দিল। শেষমেশ রাজা মন্ত্রীদের হুকুম দিলেন পেটুককে রাজ্য থেকে বের করে দাও। পৃথিবীর এমন এক দেশে ওকে ফেলে দাও, যেখানে খাবারের সংকট আছে। কেউ তিনবেলা ঠিকমতো খেতে পায় না। তাতে ওর একটা শিক্ষা হবে।

পেটুক ভূত গপগপাংকে নিঝুমপুরের উত্তর দিকের একটা জঙ্গলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হলো। মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেটুক ভূত ধড়ফড় করে উঠে বসল। খুব খিদেও পেয়েছিল। কিন্তু চারদিকে  জঙ্গলের লতাপাতা আর ঝিলের পানি। খাওয়ার মতো কিচ্ছু নেই। মনে মনে ভাবল, এখানে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে। মাথা কুটলেও খাবার পাওয়া যাবে না। তাই মানুষের রূপ ধরে থাকতে হবে। তাতে ক্ষুধা কম লাগবে।

প্রথমে একটা থুত্থুড়ে বুড়োর রূপ ধরল পেটুক ভূত। সকালবেলা লাঠিতে ভর দিয়ে ঠুকঠুক করতে করতে হাজির হলো চেয়ারম্যান বাড়িতে। চেয়ারম্যান হোঁদল শেখ। বিশাল ধনী। প্রচুর ধনসম্পদ। কিন্তু স্বভাবে হাড়কিপ্টে।

সাতসকালে দরজায় অচেনা বুড়ো ভিক্ষুক দেখে তাঁর মেজাজ চড়ে গেল। ছদ্মবেশী পেটুক বলল, বাবা, তিন দিন না খেয়ে আছি। যদি সকালে কিছুটা খেতে দাও, তাহলে প্রাণটা বাঁচে। চেয়ারম্যান বললেন, না, হবে না। ভিক্ষা নিতে চাইলে বুধবারে আমার পরিষদে আসবে। সেখানে দেওয়া হবে। বুড়োটা কত কান্নকাটি করল, হাতে-পায়ে ধরল, কিন্তু কাজ হলো না। শেষমেশ মনের দুঃখে মেঠোপথের ধারে বসে রইল। সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল এক মানুষ ভিক্ষুক। পেটুক ভূতকে দেখে বলল, তোমাকে তো এ গাঁয়ে আগে দেখিনি। বাড়ি কোথায়? পেটুক তখন আসল পরিচয় লুকিয়ে একটা নকল পরিচয় দিল। বলল, আমার বাড়ি ভিনদেশে। আর বলল, সে খুব ক্ষুধার্ত। পেটুক ভূতের কথা শুনে বুড়ো ভিক্ষুকের মায়া হলো। সে তার ঝোলা থেকে একটা রুটি বের করে দিয়ে বলল, এটা খাও। আমার সঙ্গে আসতে পারো। আমি একা মানুষ। সারা দিন ভিক্ষা করে যা পাই তাই দিয়ে কোনো মতে চলে যায়। তুমি থাকলে তোমারও চলে যাবে। পেটুক ভাবল না থেকে আর উপায় কী? বুড়োর কথা না শুনলে না খেয়েই মরতে হবে। সে ভিক্ষুকের সঙ্গে থাকতে রাজি হয়ে গেল।

ভিক্ষুক থাকত একটা কুঁড়েঘরে। ঘরটা ভাঙাচোরা। আসবাব কিছুই নেই। শুধু একটা চাটাই আর মাটির কিছু হাঁড়ি। পেটুক ভূত জিজ্ঞেস করল, তোমার এই অবস্থা কিভাবে হলো? ভিক্ষুক তখন তার দুঃখের কাহিনি খুলে বলতে লাগল—

চেয়ারম্যান হোঁদল শেখ দুষ্টু লোক। গ্রামের দরিদ্র মানুষের ধনসম্পদ আত্মসাৎ করে আজ তাঁর এত বাহাদুরি। আমার বেশ কিছু আবাদি জমি ছিল। চারটা গরু ছিল। একটা নৌকা ছিল। কিন্তু হোঁদল সব কেড়ে নিয়েছেন। শুনে পেটুক ভূত বলল, দুঃখ করো না ভাই। তোমার অভাব একদিন ঘুচে যাবে। ভিক্ষুক বলল, কিভাবে? পেটুক ভূত বলল, তুমি অনেক দয়ালু আর উদার। যারা দয়ালু আর পরোপকারী হয়, তাদের অভাব একদিন দূর হয়।

সাত দিন পরেই চেয়ারম্যান হোঁদল শেখের মেয়ের বিয়ে। গোটা গ্রামের সবাইকে ভূরিভোজের দাওয়াত করা হয়েছে। উদ্দেশ্য সামনে নির্বাচন। ভোটারদের মন রক্ষায় তাঁর এই কৌশল। চেয়ারম্যান বাড়ির সবাই ছোটাছুটিতে ব্যস্ত। হোঁদল শেখ বিশাল বজরানৌকা নিয়ে গঞ্জে গেল। বজরা ভরে চাল-ডাল-সদাইপাতি কিনে আনল।

ভিক্ষুক আর পেটুক ভূত সারা দিন পাশের গাঁয়ে ভিক্ষা করে। সারা দিন পর সামান্য চাল-ডাল যা পায় তা দিয়ে কোনোমতে পেট চলে। কিন্তু দুদিন যেতেই পেটুক হাঁপিয়ে উঠল। সে ভাবল, নাহ, এভাবে চললে সে অনাহারে মারা পড়বে। তিনবেলা ঠিকমতো না খেতে পেয়ে সে অনেকটা শুকিয়ে গেল।

অপরদিকে ভূত রাজ্যের সবার পেটুকের জন্য মন খারাপ। ভূত রাজারও মায়া হলো। সে তার ভুল বুঝতে পারল। মনে মনে বলল, গপগপাং একটু বেশি খায়। তাই বলে তাকে পৃথিবীতে ফেলে দেওয়া উচিত হয়নি। তাই রাজা ঠিক করল পেটুককে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজ্যের ভূত প্রজারাও রাজার কথায় খুশি। এ কথা চলে গেল পেটুক ভূতের কানেও।

চেয়ারম্যান বাড়ির সামনে বিশাল ডেকচিতে ভোজ রান্নার আয়োজন শুরু হয়ে গেল। কুড়িটা গরু, চল্লিশটা খাশি, তিন শত মুরগি আর দশ মণ রুই মাছ রান্না হবে। হোঁদল শেখ নিজে থেকেই রান্নার সব আয়োজন তদারকি করতে লাগলেন। দুপুর হতে চলল। সুস্বাদু পোলাও-মাংসের খুশবুতে গোটা গ্রাম ম ম করতে লাগল। পেটুক ভূত সুস্বাদু খাদ্যের ঘ্রাণ পেয়ে অস্থির হয়ে পড়ল। ওর পেটের মধ্যে গুড় গুড় শব্দ শুরু হয়ে গেল। সে ভাবল এই সুযোগ। চেয়ারম্যান ভিক্ষুকের জমি কেড়ে নিয়েছে। তাকে একবেলা খেতেও দেয়নি। প্রতিশোধ নেওয়াই যায়।

দুপুর হলো। গ্রামবাসী চেয়ারম্যান বাড়ির সামনের মাঠে জড়ো হলো। চেয়ারম্যান ভাষণ দিতে মাইকের সামনে দাঁড়ালেন। এমন সময় পেটুক ভূত হাজির। দিন-দুপুরে বিশালাকার ভূত দেখে সবাই ছোটাছুটি শুরু করল। পেটুক ভূত বলল, আমি একমুঠো খাবার চেয়েছিলাম। তুমি দাওনি। তুমি এ গাঁয়ের অনেকের সম্পদ লুট করে আজ ধনী হয়েছ। এখন তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু চেয়ারম্যান ভূতের কথা মানতে রাজি হলো না। উল্টো বন্দুক তাক করে গুলি করতে গেল। পেটুক ভূত তখন এক ঝটকায় হাতের মুঠোয় চেয়ারম্যানকে তুলে নিল। আর অন্য হাতে নিল খাবারের ডেকচি। ধীরে ধীরে আকাশে উঠে যেতে লাগল সে। গ্রামবাসী হাঁ করে দেখতে লাগল। পেটুক ভূত বলল, আমাকে রাজা ফিরে যেতে বলেছে। আমি ফিরে যাচ্ছি। সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি দুষ্টু লোভী চেয়ারম্যান হোঁদল শেখকে। তোমরা তোমাদের সব সম্পদ ভাগ করে নাও। আমি মাঝেমধ্যে খেতে আসব তোমাদের গ্রামে। তোমাদের রান্না আমার খুব ভালো লেগেছে। আর এই রাক্ষস হোঁদলকে উচিত শিক্ষা দেব। সে বন্দি থাকবে ভূত রাজ্যে।


মন্তব্য