kalerkantho


গল্প

আণ্ডাপুরের ডাণ্ডা

আহমেদ রিয়াজ

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আণ্ডাপুরের ডাণ্ডা

অঙ্কন : মাসুম

ডাণ্ডাটা আণ্ডাপুরে আসতেই...। কী হলো? সেটা পরে বলছি।

আণ্ডাপুরে কেবল আণ্ডা আর আণ্ডা। ছোট-বড় মাঝারি—সব ধরনের আণ্ডারা থাকে। আর থাকে সবার আণ্ডা। হাতি, ঘোড়া, মহিষ, গরু, গাধা, ভেড়া, ছাগল, মুরগি, কাক, টিয়ে, কুকুর, বিড়াল—কার আণ্ডা নেই? সবার আণ্ডা আছে। হাতির আণ্ডা শুঁড় দুলিয়ে হেঁটে বেড়ায়। ঘোড়ার আণ্ডা টগবগ করে ছোটে। মহিষের আণ্ডা গুঁতা দেয় যাকে-তাকে। গরুর আণ্ডা হালচাষ করে, গাধার আণ্ডা...

থাক। সব আণ্ডার কথা কি আর বলতে হবে? বুঝেই নাও কোন আণ্ডা কী করে।

একদিন বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ ডাণ্ডাটা এসে হাজির হলো আণ্ডাপুরে। আণ্ডাপুরের কিছু কিছু আণ্ডা আবার বেজায় দুষ্টু।

সারা দিন কেবল ঝগড়া, চেঁচামেচি, হৈচৈ। আর কাদা-ছোড়াছুড়ি।

আর ভালো আণ্ডারা চুপচাপ ধরনের। চুপ করে অফিসে যায়, ব্যবসা করে, ইশকুলে যায়, কলেজে যায়। হাঁটেও যখন, চুপটি করে।

দুষ্টু আণ্ডাদের দুষ্টুমি বেড়ে যায় দিন দিন। কিছু ভালো আণ্ডা অনেক করে বলেছে, দেখো, আণ্ডা হয়ে এত দুষ্টুমি করা মানায় না। কখন ঠুসঠাস ফেটে যাস ঠিক নেই।

দুষ্টু আণ্ডাদের বয়েই গেছে এসব শুনতে; বরং যেসব আণ্ডা এসব কথা বলে, তাদেরই ওরা ফাটিয়ে দেয়।

ভালো আণ্ডারা তাই ভয়ে ভয়ে থাকে। আর দুষ্টু আণ্ডাদের এড়িয়ে চলে।

সবটুকু তো এড়ানো যায় না। পথ-ঘাট, হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত—সবখানেই দুষ্টু আণ্ডাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আণ্ডাপুর বলে কথা।

কিছুদিন ধরে আবার পচা আণ্ডাদের গা থেকে বাজে গন্ধ বেরোতে শুরু করেছে। ভালো আণ্ডাদের গা গুলিয়ে আসে ওই দুর্গন্ধে।

দুর্গন্ধ গায়ে আরো দুষ্টুমি বাড়িয়ে দিল পচা আণ্ডারা। উফ্! অসহ্য। পচা আণ্ডাদের জ্বালায় আর টেকা যাচ্ছে না আণ্ডাপুরে। কিন্তু আণ্ডাপুর ছেড়ে আর কোথায় যাবে ভালো আণ্ডারা? মানুষের দেশে গেলে টিকতে পারবে? পারবে না। জানই তো আণ্ডা দিয়ে মানুষ কী করে? হয় অমলেট, না হয় মামলেট। কেউ কেউ আবার সিদ্ধ করেও খায়। আণ্ডাপুরই তো ওদের ঠিকানা, দেশ। তবে উপায়? উপায়টা খুঁজতে থাকে আণ্ডাপুরের বুদ্ধিজীবী আণ্ডারা। অনেক উপায় বের হলো; কিন্তু কোনো উপায় সবাই মানতে চাইল না। সব আণ্ডার এক কথা—আমার বুদ্ধিটাই সেরা। এটাই মানতে হবে।

উফ্! আণ্ডাদের কথা আর কী বলব। একটা ঝামেলার জন্য অনেক বুদ্ধি—কোনটা মানা যায়? গুলিয়ে গেল আণ্ডাপুরের বুদ্ধিসুদ্ধি।

ঘোড়ার আণ্ডা বলল, আমার বুদ্ধিতেই আণ্ডাপুর চলবে। আমিই হব হর্তাকর্তা।

গাধার আণ্ডা বলল, আরে ধুৎ! আণ্ডাপুর চালানোর বুদ্ধি যদি কারো থেকেই থাকে, তবে আমারই আছে। তুই কে হে? অকাটমূর্খ অশ্বডিম্ব।

ঘোড়ার আণ্ডা বলল, খামোশ গাধাডিম্ব, গাধার মতো কথা বলিস না!

গাধার আণ্ডাও রেগে গেল। তুমুল রাগ। দলবল নিয়ে তেড়ে গেল ঘোড়ার আণ্ডার দিকে।

ঘোড়ার আণ্ডাও বসে থাকার ডিম্বটি নয়। দলবল কি তারও কম আছে? আর ডাকলে তারা কেউ সাড়া না দিয়ে পারে? তার এত ভয় কিসের? তেড়ে গেল ঘোড়ার আণ্ডাও।

আণ্ডাপুরের দুই দল আণ্ডা একেবারে মুখোমুখি।

শান্তিপ্রিয় আণ্ডারা আতঙ্কে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। হায় হায়! কী শুরু হলো আণ্ডাপুরে! শান্তির আণ্ডাপুরে অশান্তি কেন? আণ্ডার কোন দলটা হারে, আর কোন দলটা জেতে বলা মুশকিল। মাঝখানে কিছু আণ্ডাহারা হবে আণ্ডাপুর। হলেই কি! কিছু পচা আণ্ডা কমবে। কিন্তু পচা আণ্ডার সঙ্গে যে কিছু ভালো আণ্ডাও ফেটে যাবে, সেটার কী হবে?

আর তখনই একদিন হঠাৎ, হুঁ হঠাৎ একদিন ডাণ্ডাটা এলো আণ্ডাপুরে। আর ডাণ্ডা আসতেই আণ্ডা বনাম আণ্ডার লড়াই গেল থেমে।

ডাণ্ডাটা লম্বায় দুই হাত। ইয়ামোটা, আর ভীষণ ভারী। সারাক্ষণ কেবল তিড়িংবিড়িং লাফায়। যখন তখন ছোটাছুটি করে। যেখানে সেখানে। এমন ডাণ্ডা দেখেই ভয় পেল ভালো, পচা, সব আণ্ডা। জানটাই খোলস থেকে বেরিয়ে যায় যায় অবস্থা।

ডাণ্ডাটাও যা শুরু করল! যেখানেই আণ্ডা দেখে, টোকা দেয়। ডাণ্ডার টোকায় আণ্ডা টাস-ফেটে যায়। ডাণ্ডারও যা স্বভাব, ভালো-মন্দ বাছে না। নাকি চেনে না, কে জানে! আণ্ডা দেখলেই টোকা, আণ্ডা দেখলেই টাস। আণ্ডাপুরে কেবল টাস টাস আর টাস। টাস টাসের ত্রাস তৈরি হলো।

তবে ডাণ্ডাবাড়িতেও মোটা খোলসের কিছু আণ্ডা ফাটল না। কেবল এখানে ওখানে খানিকটা চিমসে গেল। ও কিছু না। বিদেশে চিকিৎসা করালেই ঠিক হয়ে যাবে। কিছু পচা আণ্ডা পালাল। কিছু আণ্ডা নিয়ে রাখা হলো খাঁচার ভেতর। আর কিছু আণ্ডা ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হলো, পচেছে কি না।

একটা মাত্র ডাণ্ডা, আণ্ডাপুরে এসেই কেমন বদলে দিল সব। মাত্র কদিনেই। কিছু আণ্ডা সমর্থন করল ডাণ্ডাকে। আণ্ডাপুরকে নিমেষে ঠাণ্ডা করায় অভিনন্দন জানাল। আর ডাণ্ডা?

আণ্ডাপুরে চলছে ডাণ্ডা শাসন। আর চলছে টাস টাস। কখন যে কোন আণ্ডার গায়ে টাস করে ডাণ্ডাবাড়ি পড়ে, ঠিক নেই। খোলসের ভেতরে ফুঁসে উঠছে আণ্ডারা। একজোট হয়েছে ঘোড়া আর গাধার আণ্ডাও। আণ্ডাপুরের প্রায় সব আণ্ডার একটাই চাওয়া—ডাণ্ডামুক্তি। আর ডাণ্ডা?

আণ্ডাপুরে কিন্তু বেশ মজায় আছে ডাণ্ডাটা। কত্ত রকমের মজা! আণ্ডা ফাটাতে মজা, আণ্ডাদের ভয় দেখাতে মজা। আরো কত শত মজা যে আছে, আণ্ডাপুরে না এলে বুঝতেই পারত না। এমন মজার আণ্ডাপুর ছেড়ে কোথায় যাবে? কোথাও গেল না।

ওদিকে বড়সড় আণ্ডারা তো ডাণ্ডার ভয়ে অস্থির। ভয় পেল না খুদে খুদে আণ্ডা। ওরা ছিল ঘুণে পোকার আণ্ডা। কোত্থেকে এসে যেন ঢুকে পড়ল ডাণ্ডার ভেতর। বাসা বানাল। ঘুণে পোকার আণ্ডা থেকে বেরোল আরো অনেক খুদে আণ্ডা। ডাণ্ডার আরো অনেক জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল ওরা। তারপর আরো। তারপর আরো। কদিন পর ডাণ্ডার ভেতরটা ঘুণে পোকার ডিমে গমগম করতে লাগল। কেবল খুদে আণ্ডা আর খুদে আণ্ডা। আর এই খুদে আণ্ডার ভারে হঠাৎ একদিন ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ল ডাণ্ডাটা। বিশাল ডাণ্ডাটা হয়ে গেল গুঁড়া গুঁড়া। ব্যস, তারপর আণ্ডাপুর হয়ে গেল ডাণ্ডামুক্ত।


মন্তব্য