kalerkantho

গল্প

গভীর বিপদে কবি

নাসরীন মুস্তাফা

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গভীর বিপদে কবি

অঙ্কন : বিপ্লব

রাজা বলেছিলেন, শীত তো চলে এলো। পৌষ আর মাঘ এই দুই মাস শীতকাল।

এখন তো শীতের কবিতা লিখতে হবে হে।  

কবি কম্বল গায়ে জড়িয়ে, হাতে কলম নিয়ে, খাতায় লিখতে বসলেন কবিতা। শীতের ভাব কবিতা হয়ে বের হবে—এই তাঁর আশা। পৌষ মাস পেরিয়ে গেল। শীত খুব একটা জমেনি। তাই কবিতাও নামেনি। মাঘ মাস এসে গেল। কবিতা হতেই হবে, তাই হালকা শীতেই আনতে হলো এক লাইন—

‘শীত এলো রে শীত এলো’

এর পরের লাইন ভাবতে বসেন কবি। গায়ের কম্বল পড়ে গেল মেঝেতে, কবির খেয়াল হলো না।

কপালে ঘাম জমছে।

দূর থেকে ভেসে এলো ‘কুহু কুহু’ ডাক। কোকিল ডাকছে। শীতের পাখি তো নয় কোকিল, তবে কেন ও মাঘ মাসে ডাকছে? ও কি জানে না, মাঘ মাস হচ্ছে শীতকালের মাস? ও কি জানে না, শীতকালে কোকিলদের ডাকতে নেই? কোকিলদের ডাকতে হয় তো বসন্তকালে। কোকিল কি জানে না?

কবি উঠে বসলেন। কোকিলের ডাক শুনে তাঁর ভাব ছুটে গেছে। শীতের কবিতার পরের লাইনটা হারিয়ে গেল যে! রাগে-দুঃখে কবির কাঁদতে ইচ্ছা হলো। মনের ভেতর রাগ নিয়ে ছুটলেন রাজার দরবারে।

রাজা জানতে চান, কবিতা কই?

লেখা হয়নি।

কেন রে কবিতা লেখা হয়নি?

কেন যে কোকিল ‘কুহু কুহু’ ডাকল!

রাজা জানতে চান, কেন রে কোকিল ‘কুহু কুহু’ ডাকলি?

কোকিল সাফ বলে দিল, বসন্ত এসে গেছে, তাই ও ডেকেছে। বসন্ত এসে গেছে, কেননা পলাশ ফুলও ফুটেছে।

রাজা তলব করেন পলাশ ফুলকেও। কেন রে মাঘ মাসে ফুটলি?

পলাশ ফুলও দায় নেয় না। বলে, বাতাসে বসন্তের ভাব এলেই ওকে নাকি ফুটতে হয়। তাই ও ফুটেছে। আগাম ফুটেছে বলে ওর কোনো দোষ নেই। দোষ বসন্ত বাতাসের।

বসন্ত বাতাসকে তলব করা লাগল না। রাজার গায়ে লাগছে মন পাগল করা বাতাস। গান গাইতে মন চায়। নাচতে মন চায়। বাতাসের মধু ভাব রাজার গলায় রাগ ফুটতে দেয় না। তবু রাগ রাগ ভাব করে বলেন, কেন রে বাতাস বসন্তের হলি?

কেন যে শীত কমে গেল!

মাঘ মাসে শীত কেন কমে গেল? হিমেল ভাব নেই। গরম গরম লাগছে।

ডাক ব্যাটা সূর্যকে।

রাজার হুকুমে সূর্যকে ডাকা হয়। সূর্য আকাশ থেকে যেই না একটু নেমে আসে, গরম আরো বেড়ে যায়। রাজা হাঁসফাঁস করতে থাকেন। বলেন, সূর্যকে নিচে নেমে আসার দরকার নেই। যেখানে আছে সেখানেই থাক। যা জানতে চাই তার জবাব দিলেই চলবে।

সূর্য মুচকি হেসে বলে, জো হুকুম, মহারাজ!

রাজা জানতে চান, মাঘ মাসে কেন সূর্য এত গরম দিচ্ছে।

মাফ করবেন মহারাজ। আমি পৌষ আর মাঘ মাসে দূর থেকে আলো দিই। কাত হয়ে দিই। রোদ পড়ে তেরছা। এবারও তো তা-ই করেছি। দূর থেকে আলো দিয়েছি। কাত হয়ে দিয়েছি। তেরছা পড়েছে রোদ। দিন ছিল ছোট। রাত ছিল বড়।  

তা তো ছিলই।

তবে যে গরম ভাব চারদিকে, তার জন্য আমার কেন দোষ হবে? তা ছাড়া অনেক দিন তো ময়লা মেঘ কুয়াশার মতো ছিল। সেসব দিনে আমি তো রোদকে নামাতেই পারিনি মাটিতে।

তাই তো! গরমকালের গরম তবে এলো কেন? এ কার দোষ?

পলাশ ফুল এরপর যা বলে, তা শুনে ভয় পেয়ে যায় সবাই। বলে, রাজ্যের আকাশে কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে গেছে। চাদরের মতো ঝুলছে। গরমকালে রাজ্যের মাটি থেকে ওঠা গরম আকাশে উঠে হারিয়ে যেতে পারছে না। আটকে গিয়ে আবার ফিরে আসছে মাটিতে। শীতকালও কমাতে পারছে না গরমের ভাব। উল্টো শীতকেই নাকাল হয়ে চলে যেতে হলো। বসন্তকালকেও নাকাল হতে হবে খুব শিগগির। গরমকাল সময়ের আগেই তাড়িয়ে দেবে বসন্তকে।

কবি চাইলেও বসন্তকে নিয়ে কবিতা লিখতে পারবেন না।

কেন রে কার্বন ডাই-অক্সাইড জমে যাচ্ছে?

পলাশ ফুলের গাছটা বলে, কেন যে আমরা, এই গাছপালা-লতাপাতা কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিতে পারছি না। এ কাজ তো আমাদেরই, মানে গাছদেরই।

কেন রে গাছ, কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নিতে পারছিস না? এই অপরাধে শাস্তি হবে তোদের। কোনো মাফ নেই।

পলাশ ফুলের গাছটা তখন কাঁদে। ওর বাপ-দাদা, চাচা-মামা, খালা-ফুপু, বোন-মা, নানা-নানি একেক করে কাটা পড়েছে। গাছ কমে যাচ্ছে। গাছ যদি বেশি থাকত, কার্বন ডাই-অক্সাইড জমতে পারত না। গাছ নিঃশ্বাসে নিত কার্বন ডাই-অক্সাইড, প্রশ্বাসে ছেড়ে দিত অক্সিজেন।

এবার কবি নীরব। রাজাও নীরব। কদিন আগে কবি একগাদা গাছ কেটে খাট-পালঙ্ক বানিয়েছেন। কদিন আগে রাজাও গাদা গাদা গাছ কাটার হুকুম দিয়েছেন। গাছ কেটে রাজ্য বাড়ানো হবে। আরো বেশি ঘর উঠবে। আরো মানুষের বাস হবে সেখানে।

সূর্যটা হুমকি দেয়, আরো বেশি গরম পড়বে। আমার কী? আমার তো আর গরম লাগে না।

গরম লাগে কোকিলের। বেশি গরমে তাই কোকিল ডাকে না। বেশি গরমে পলাশ ফুটবে না। বেশি গরমে বসন্তকালও থাকবে না। তখন হবেটা কী?

কবি বলেন, কবিতা হবে। গরমের কবিতা। কবিতার গরম।

রাজা ভাবনায় পড়েন। বলেন, শুধু গরমের কবিতা পড়ে সুখ নেই কবি। আমি শীতের কবিতা চাই। বসন্তের কবিতা চাই। শরতের কবিতা চাই। হেমন্তের কবিতা চাই। বৃষ্টির কবিতাও আমি চাই।

কবি তবু গোঁয়ারের মতো বলেন, এসি ছেড়ে দেব। ঘরের ভেতর শীত নামবে, বসন্ত-শরৎ-হেমন্ত আসবে। শাওয়ার ছেড়ে দিলেই বৃষ্টি পড়বে।

পলাশ ফুল-কোকিল-সূর্য সবাই বলল, এসি তো কার্বন ডাই-অক্সাইড আরো বেশি জমিয়ে দিচ্ছে বাতাসে। আসল সমস্যার সমাধান করতে হবে আসলে। জোর করে আবোলতাবোল কাজ করলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। গরম কমানোর আসল ওষুধ চাই, মহারাজ।

মহারাজ তখন আইন করলেন। গাছ লাগানোর আইন। রাজ্যজুড়ে যে সবচেয়ে বেশি গাছ লাগাতে পারবে, তার জন্য আছে পুরস্কার। কবি ভেবেছিলেন, গাছ নিয়ে কবিতা লিখবেন। পরে ভেবে দেখলেন, আগে তো গাছ, তারপর না কবিতা। গাছই যদি না থাকে, কবিতাও থাকবে না।

কবি তাই কবিতা লিখছেন না। কবি এখন গাছ লাগাতে ব্যস্ত।

মহারাজও।


মন্তব্য