kalerkantho

বই কাটা

তৌহিদ এলাহী

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বই কাটা

অঙ্কন : মানব

গল্প

‘এভাবে চলতে থাকলে কপালে দুঃখ আছে রে বিল্টু। একটা বইও কাটছিস না।

বই না কাটলে সারা জীবন মূর্খই থেকে যাবি। ইঁদুর সমাজে যত বড় বড় মহা-ইঁদুর আছে তারা অনেক অনেক বই কাটাকাটি করেই আজকের সমাজে সম্মানের পাত্র। ’ আক্ষেপ করে বলে দুষ্টু ইঁদুরছানা বিল্টুর দাদু।

দাদুর যন্ত্রণায় গর্তে টেকা দায়। পরামর্শ আর পরামর্শ। শুধু দাদু না, আশপাশে যত মুরব্বি আছে, সবার এক কথা। আসলে বিল্টুদের বাসাটাই হয়েছে এমন এক জায়গায়— সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নাটকের মঞ্চের বাইরে, পুবের কোনার এক কোঠরে।  

পাশের ঘরের কিটি হয়েছে বিল্টুর উল্টো। সারা দিন কুটকুট করে বই কাটে।

তাকে নিয়ে তার মা-বাবার কী গর্ব! অল্প বয়সেই রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদনের বই কেটেকুটে একাকার। মাঝেমধ্যে রুটিন করে ভোর রাতে রাস্তার ওপারে বাংলা একাডেমিতে ঢোকে। খটোমটো কঠিন জ্ঞানের বই নাকি সেখানে সাজানো। সবাই বলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সবচেয়ে জ্ঞানী বুড়ো ইঁদুর তিদু নাকি সেখানকার প্রায় এক শ বই সাবাড় করে দিয়েছে। ঘটনার পর বাংলা একাডেমিতে ইঁদুর নিধন কমিটি পর্যন্ত করে দেওয়া হয়েছিল। তিদু সাহেব প্রায়ই মাথা দুলিয়ে গর্বের সঙ্গে বলে, জ্ঞান অর্জন এত সহজ কাজ নয় রে। কত কষ্ট করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জ্ঞান সাধনা করি। আর এ যুগের ইঁদুর বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ খুব অন্ধকার। নামিদামি লেখকদের বইগুলো কাটারও আগ্রহ পায় না। তবে বুড়োরাও যে পড়ে তা কিন্তু নয়। মুরব্বি ইঁদুরদের অনেককে নিয়মিত পত্রিকা কাটতে দেখা যায়। দৈনিক পত্রিকা কাটতে নাকি ভারি মজা। অনেক জ্ঞান হয়। জিনিসটাও নরম। নিউজপ্রিন্ট কাগজ।

একদিন কিটি মহা উত্তেজিত। ফেব্রুয়ারি এসে গেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মানে তাদের বাড়ির কাছেই হচ্ছে বইমেলা। এখন আর কষ্ট করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে হয় না। বড় বড় স্টল হচ্ছে। অনেক জ্ঞানের বই আসবে। সারা রাত ইচ্ছামতো কাটা যাবে মহানন্দে।

অন্যদিকে বিল্টু আছে টেনশনে। রাতের বেলায় উদ্যানে কানামাছি খেলা যায়। এ খেলাও বন্ধ হয়ে যাবে বইমেলায়? পুরো মাস খুব বিরক্তিকর সময় যাবে। পাছে মুরব্বিদের জোরাজুরি আর কিটির পাল্লায় পড়ে বই কাটতে বসতে হতে পারে। কে জানে কী হয়? বই কাটার চেয়ে ফালতু কাজ আর হয় নাকি? কী শক্ত জিনিস রে বাবা। এক-দুই পাতা কাটতে দাঁত ব্যথা লাগে। অভ্যাসে নেই। মনোযোগও আসে না। পুরান বই তাও চলে। নতুনগুলো কী বাজে গন্ধ। নাকে লাগে!

দেখতে দেখতে ফেব্রুয়ারির অর্ধেকের বেশি চলে গেল। বিল্টু বাসা থেকে তেমন বের হয় না। সারা দিন বইমেলা স্টলের ভেতর মানুষ গিজগিজ। উদ্যানের পরিবেশটাই নষ্ট। এলাকাটাকে বাতি জ্বালিয়ে আলোকিত করে রেখেছে দোকানিরা। গর্তের ভেতর বসে থাকলে দম আটকে আসে বিল্টুর।

এদিকে কিটি মহানন্দে রাতের পর রাত বই কেটে চলেছে। গল্পে গল্পে সবাইকে বলছে, এ এক মাস তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। কত কিছু শিখছে। মুরব্বি ইঁদুররা মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলছে, কাটো বাবা কাটো, বেশি করে বই কাটো। পারলে  শেকসপিয়ারের একটা বই কেটে এসে গল্পটা আমাদের বলো।

রাতের এগারোটার দিকে ভিড় একটু পাতলা হয়। কিটি তখনই বই কাটতে বের হয়। হতাশ ও বিরক্ত বিল্টু কী মনে করে কিটির পিছু নেয়। নাক কুঁচকে বলে, বসে থাকতে ভালো লাগছে না দোস্ত। আমাকেও নিয়ে যা। কিটি বলে, চল, মন খারাপ করিস না। আজকে তোকে একটা ভালো বই কাটতে দেব।

কোনার দিকের ছোটখাটো এক স্টলে ঢোকে দুজন।   কিটি চোখ বোলায় চারপাশে। তারপর একটা মোটাসোটা বই কাটতে শুরু করে। বিল্টু খুঁজতে থাকে মজার কোনো বই। ছবিওয়ালা বইগুলোর দিকেই তার চোখ যাচ্ছে বারবার। একটা পেয়েও যায়। প্রচ্ছদটা ঠিকমতো না দেখেই কাটতে শুরু করে। এক পাতা, দুই পাতা কাটতেই বইয়ের নামে চোখ যায় বিল্টুর—ছড়ায় ছড়ায় ভাষা আন্দোলন। এ আবার কী! রাজনৈতিক আন্দোলন, গার্মেন্টস আন্দোলনের নাম শুনেছে। ভাষা নিয়ে আবার কিসের আন্দোলন? বইতে এ কী লেখা? কেউ এ কথা কোনো দিন বলেনি তো! যে ভাষায় তাদের ইঁদুর সমাজ কথা বলে, এত এত বই যে ভাষায় লেখা, সেই ভাষার জন্য নাকি এ দেশের মানুষ প্রাণ দিয়েছিল সেই ১৯৫২ সালে? গোগ্রাসে ছড়ার বইটা গিলতে থাকে বিল্টু। জানতে পারে সালাম, রফিক বরকতদের কথা। বিল্টু টেরই পেল না কখন যে তার মধ্যে নিজের ভাষা আর বইয়ের প্রতি এক ধরনের টান তৈরি হয়ে গেল।

স্টল থেকে বের হয়ে বিল্টু মিনমিন করে বলে, কিটি রে, এত দিন বই না কেটে ভুলই করেছি। তুই কত কী জানিস। আমি একটা গবেট। এখন থেকে বই কাটাকুটিতে আমাকেও নিবি কিন্তু।

অবশ্যই! আমাদের জ্ঞানী হতে হবে। আমরাই ইঁদুর সমাজের ভবিষ্যৎ। চল এবার গিয়ে স্টিফেন হকিংসের আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম বইটা কাটি। কঠিন বিজ্ঞানের বই। দাঁতে শাণ দিয়ে নে।


মন্তব্য