kalerkantho


এক সকালে বইমেলায়

আহমেদ রিয়াজ

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



এক সকালে বইমেলায়

অঙ্কন : মাসুম

সকালবেলায়ই নানাবাড়ি এসেছে রায়া। ছুটির দিন। ওকে দেখেই গালভরা হাসি দিলেন নানাভাই। বললেন, ‘রায়া নানুকে অনেক দিন পর দেখলাম!’

জবাবটা রায়ার মা দিলেন, ‘নতুন ক্লাসে ওঠার পর স্কুল খুলেছে। ক্লাস করতে হচ্ছে। ’

‘তাই বলে নানাভাইকে ভুলে যেতে হবে? আচ্ছা, চলো। ’

রায়া জানতে চাইল, ‘কোথায় নানাভাই?’

‘বইমেলায়। ’

ব্যস, নানাভাইয়ের সঙ্গে বইমেলায় রওনা হলো রায়া। নানাবাড়ি থেকে বইমেলা খুব বেশি দূরে নয়। রিকশায় করেই যাওয়া যায়।

বইমেলায় এর আগে কখনো যায়নি রায়া। অনেক বছর বিদেশে ছিল ওরা। ওর জন্মই হয়েছিল অন্য দেশে। ওখানে তো এমন বইমেলা দেখেনি! বড্ড অবাক হলো রায়া। বইয়েরও মেলা হয়! বাহ।

নানাভাই বললেন, ‘আজ তোমায় মেলায় নিয়ে এলাম কেন, জানো?’

‘কেন?’

‘আজ শিশুপ্রহর। ’

অবাক রায়ার চোখ দুটি কপালে, ‘মানে?’

‘ছুটির দিনগুলোয় সকালটা শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এ সময় শিশুরা নিজেদের মতো করে ঘুরে বেড়াবে, বই কিনবে। মেলায় কিন্তু শিশু কর্নারও আছে। ওখানে শুধু শিশুদের বই-ই পাওয়া যায়। ’

নানাভাইয়ের কথা শুনবে কী, মেলার মাঠে ঢুকে রায়ার চোখ উঠে গেল কপালের আরো ওপরে। এত্ত স্টল! নানাভাইয়ের হাত ছেড়ে দিয়ে এক ছুটে একটা স্টলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল রায়া। নানাভাইও ছুটলেন ওর পেছন পেছন।

উল্টে-পাল্টে বই দেখতে লাগল রায়া। নানাভাই বললেন, ‘তোমার যে বই পছন্দ, কিনতে পারো। ’

এ স্টল-ও স্টল ঘুরল রায়া। বেশ কয়েকটা বই কিনল। রায়া বলল, ‘আম্মুর জন্য একটা বই কিনব?’

নানাভাই হাসতে হাসতে বললেন, ‘তোমার আম্মু বই পড়ে?’

‘পেলে পড়বে। না পেলে কেমন করে পড়বে?’

তাই তো! নাহ, বুদ্ধি আছে মেয়েটার।

এবার শিশু কর্নার থেকে বেরিয়ে অন্য স্টলগুলোয় ঘুরতে লাগল ওরা। নানাভাই বললেন, ‘এ দেশে বইমেলার শুরুই কিন্তু হয়েছে শিশু গ্রন্থমেলা দিয়ে। ’

‘তাই নাকি?’

“হুঁ। তখন দেশটা ছিল পূর্ব পাকিস্তান। মধ্য ষাটের দশকে তখনকার কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজন করত শিশু গ্রন্থমেলা। ১৯৬৭ সাল থেকে যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরিভিত্তিক গ্রন্থমেলা নাম দিয়ে যশোরের বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এক দিন করে বইয়ের প্রদর্শনী করত। সঙ্গে অবশ্য আলোচনা সভাও থাকত। তবে তোমরা যেটাকে ‘বুকফেয়ার’ বা ‘বইমেলা’ বলো, এ দেশে সেটা প্রথম অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ২০ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত হয়েছিল ওই বইমেলা। মেলার উদ্বোধন করেছিলেন তখনকার রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।

তখন সে মেলায় দেশের উল্লেখযোগ্য সব প্রকাশক তো অংশ নিয়েছিলেনই, আরো অংশ নিয়েছিল ভারতের ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ঢাকায় অবস্থিত সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় সব দূতাবাস, ব্রিটিশ কাউন্সিল ও আমেরিকান দূতাবাস। ”

শুনতে কিন্তু ভালো লাগছে রায়ার। হঠাৎ চারপাশে তাকিয়ে দেখল অনেকেই ওদের চারপাশে জড়ো হয়ে নানাভাইয়ের কথা শুনছে। গর্ব হলো রায়ার। ওর নানাভাই তো অনেক কিছু জানেন!

রায়া এবার জানতে চাইল, ‘তখন থেকেই কি এই মেলা শুরু?’

‘নাহ। এরপর এপ্রিল মাসে গ্রন্থমেলা হতো। কিন্তু সেটা এতটা জমজমাট ছিল না। তা ছাড়া এপ্রিল মাস মানেই তো ঝড়-তুফান। ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে বইমেলা করা কি মুখের কথা? যা-ই হোক, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের এই মেলা শুরু হয় যে মানুষটার মাধ্যমে, তাঁর নাম চিত্তরঞ্জন সাহা। তিনি ছিলেন মুক্তধারা প্রকাশক। ১৯৭২ সালেই বাংলা একাডেমির মাঠে তিনি কিছু বইপত্র নিয়ে বসে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় প্রকাশিত কিছু বইসহ সদ্য প্রকাশিত বই নিয়ে বাংলা একাডেমির মাঠে বিক্রির ব্যবস্থা করেন তিনি। ব্যাপারটা বেশ মনে ধরল বাংলা একাডেমির। পরের বছর বাংলা একাডেমি হ্রাসকৃত দামে নিজেদের বই বিক্রির ব্যবস্থা করল ১৫ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সঙ্গে আরো কিছু প্রকাশকও বই বিক্রি করলেন। এভাবেই বই বিক্রি চলল কয়েক বছর।

১৯৭৯ সাল থেকে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক গ্রন্থমেলা। সে বছরই মেলার নামকরণ করা হয়—একুশে গ্রন্থমেলা। ওই বছর মেলা হয়েছিল ফেব্রুয়ারির ৭ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত। ’

এবার মুখ খুলল রায়া, ‘এখন তো মেলা হয় ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে। সেটা কবে থেকে শুরু হলো নানাভাই?’

নানাভাই বললেন, “পরের বছর মেলা হয় ফেব্রুয়ারির ১ থেকে ২১ তারিখ পর্যন্ত। ১৯৮৪ সালে গ্রন্থমেলার নাম বদলে রাখা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। আর মেলাটা ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে শুরু হয়। তখন কিন্তু মেলা হতো বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। ২০১৪ সালে মেলা নিয়ে আসা হয় এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এখন তুমি এখানেই দাঁড়িয়ে আছ নানুভাই। এটাই সেই ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এখানে ৭ই মার্চের ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ওই দ্যাখো, ওটাই হচ্ছে সেই স্বাধীনতা স্তম্ভ। ”

বলেই বাঁ পাশে স্বাধীনতা স্তম্ভ দেখালেন নানাভাই।

মাথা উঁচু করে স্বাধীনতা স্তম্ভ দেখল রায়া। স্বাধীনতাই তো আমাদের মাথা উঁচু করে দিয়েছে। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা। পৃথিবীতে ভাষার জন্য জীবন দেওয়া জাতি একটাই—বাঙালি। আর পুরো দুনিয়ায় এত দীর্ঘ সময় ধরে বইমেলাও হয় শুধু বাংলাদেশে। ‘আমাদের মাথা উঁচু থাকবে না তো, কার মাথা উঁচু থাকবে?’

বই কিনতে কিনতে দুপুর গড়িয়ে গেল।

অনেক বই নিয়ে নানাভাইয়ের হাত ধরে মেলা থেকে বেরিয়ে এলো রায়া। আর মনে মনে ঠিক করেই ফেলল, মা-বাবাকে নিয়ে আরেক দিন আসবে।


মন্তব্য