kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


গল্প

ব্যাটসম্যান ভূতোং

রিদওয়ান আক্রাম

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ব্যাটসম্যান ভূতোং

আঁকা : বিপ্লব

হরিরামপুরের একদম শেষ মাথায় কয়েক শ বছরের পুরনো যে বটগাছটা, প্রতি রাতে সেখান থেকে ভেসে আসে কান্নার শব্দ। গ্রামবাসী জানে, সে কান্না মানুষের নয়।

নাকি সুরের সেই কান্না ভোর হওয়ার একটু আগেই থেমে যায়। কে কাঁদে? বড়রা বলেন, ভূতের কান্না। ওটা আসলে ভূতোংয়ের মায়ের কান্না। কান্না করবে না কেন? আদরের ছেলে ভূতোং যে দিন দিন ‘মানুষ’ হয়ে যাচ্ছে! সারা দিন গ্রামের ছেলেপুলেদের সঙ্গে খেলে বেড়ায়। অবশ্য মানুষের ছদ্মবেশ নেওয়ায় কেউ তাকে চিনতে পারে না। এসব কথা কি আর লুকোনো থাকে? যা হওয়ার তাই হয়েছে, ভূতসমাজে ‘রিঁ রিঁ’ পড়ে গেছে—পেত্নীর ছেলে ভূতোং কি তবে ‘মানুষ’ হয়ে গেল? মায়ের মতো ভূতোং নিজেও জানে না কিভাবে মানুষের ছানাপোনাদের সঙ্গে এত ভাব হয়ে গেল। এই তো সেদিনও অন্য দিনের মতোই বসে বসে ছেলেদের ক্রিকেট খেলা দেখছিল ভূতোং। খেলাটা বেশ লাগে দেখতে। একজন দৌড়ে বল ছোড়ে, আরেকজন পেটায়। পেটানো বল শূন্য থেকে লুফে নিতে পারলে সেকি আনন্দ!

হঠাৎ বলটা উড়ে এসে লাগল ভূতোংয়ের মাথায়। অদৃশ্য থাকায় বলটা ওর মাথা ভেদ করে আছড়ে পড়ে এক ঝোপের ওপর। যে ছেলেটা ছক্কা হাঁকিয়েছিল, সে-ই এলো বল খুঁজতে। খুঁজে বের না করতে পারলে নতুন একটা কিনে দিতে হবে। বাসায় জানলে বাবা দারুণ খেপে যাবেন। দুরু দুরু বুকে ছেলেটা হাজির হলো ঝোপের নিচে। কিন্তু ঝোপের ভেতর থেকে বল বের করা যে অসম্ভব।

‘কি রে রাতুল, বলটা নিয়ে তাড়াতাড়ি আয়। খেলার দেরি হচ্ছে যে। ’

রাতুলের চোখে-মুখে ভয়। একসময় তো ফুঁপিয়ে কেঁদেই উঠল। দেখে বেশ মায়া লাগল ভূতোংয়ের। এক নিমিষে মানুষের রূপ ধরে হাজির ঝোপের কাছে। বলটা সে আগেই দেখেছে। খুঁজে পেতে দেরি হলো না। ডাক দিল ছেলেটাকে, ‘এঁই শুঁনছ মাঁনে ইঁয়ে...নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলা শুরু করল, ‘এই শুনছ, এটাই খুঁজছ?’

অপরিচিত ছেলেটার হাতে টেপ জড়ানো বলটা দেখতে পেয়ে ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে পেল রাতুল। ভূতোংয়ের হাত থেকে বলটা নিয়েই দৌড়। ভূতোংও জানি কী মনে করে রাতুলের পেছনে পেছনে হাঁটা শুরু করে। এক পা দুই পা করে শেষ পর্যন্ত মাঠে হাজির। খেলা জমে উঠেছে ততক্ষণে। ভূতোংয়ের দিকে কারো নজর নেই। রাতুল ব্যাটসম্যান। পাকা হাতে ব্যাট হাঁকিয়ে চলেছে। অপর প্রান্তে থাকা অন্য ব্যাটসম্যান তেমন পেটাতে পারছিল না। আচমকা গোড়ালিতে চোটও পেল। খেলা গেল থেমে। এখন উপায়? ঠিক তখনই ভূতোংয়ের ওপর নজর পড়ল রাতুলের।

দৌড়ে এসে ভূতোংকে বলল, ‘খেলবে নাকি আমাদের হয়ে?’

এতটুকু আশা করেনি ভূতোং। বলল, ‘হুম। ’

রাতুল বলল, ‘তোমাকে কিছু করতে হবে না। যা করার আমিই করব। শেষ উইকেট তো, তুমি কোনো রকম টিকে থেকো। ১০ বলে ২০ রান দরকার। ’

হ্যাঁ-না বলার আগেই ভূতোংয়ের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো ব্যাট। কাঁধ ঝাঁকিয়ে ভূতোং নিজেকে বলল, ‘কিঁ আঁর সমঁস্যা হঁবে? এঁকটু খেঁললামই না হঁয়। ওঁরা তোঁ আঁর আঁমাকে চিঁনতে পাঁরছে না?’

দূরে বসে যতটা সহজ মনে হয়েছিল, মাঠে ততটা নয়। একেকজন একেক রকম করে বল করে। কারোটা অনেক জোরে আসে, কারোটা ধীরে এদিক ওদিক গোত্তাও খায়। রাতুলও কম যায় না। ওভারের শেষ চার বলে আট রান নিল। পরপর দুই বলে দুটি চার। ওভারের শেষ বলে একটি সিঙ্গেল নিতে চেয়েছিল, যাতে শেষ ওভারে স্ট্রাইক নিজের কাছে থাকে। কিন্তু প্রতিপক্ষের ফিল্ডিংয়ের জন্য তা আর হলো না। বাধ্য হয়ে ভূতোংকেই স্ট্রাইকে দাঁড়াতে হলো। এক লম্বা-চওড়া ছেলে এসে বেশ ভয়ও দেখাল, ‘এমন বল করব না...হুম!’ সত্যিই তাই। বেশ ভয়ংকর বল করে ছেলেটা। এদিকে ওভার শেষ হয়ে যাচ্ছে। বেশি বল নষ্ট করার সুযোগ নেই। শেষমেশ বুদ্ধি চাপল ভূতোংয়ের মাথায়। লম্বা রানআপ নিয়ে দৌড়ে আসছে ছেলেটা। যেই না বলটা ছুড়তে যাবে, অমনি শূন্যে উঠে গেল। মাঠে থাকা সবাই তা দেখে দারুণ অবাক। আরে, কিভাবে হলো এটা? বোলারও বেশ ভয় পেয়ে গেছে। ‘ওরে রতন, ওরে মতিন, কী হলো রে আমার? তোরা আমাকে মাটিতে নামা। ’ ছেলেটার বন্ধুরা বেশ কষ্ট করে ওকে মাটিতে নামিয়ে আনল। মাটিতে নেমে নিজের শরীরের নানা জায়গা ধরেটরে বোঝার চেষ্টা করল কী কারণে এভাবে শূন্যে উঠে গেল। অনেকে বলাবলি করল, ছেলেটার পেটে সম্ভবত অনেক গ্যাস হয়েছিল।

আবার বোলিং শুরু। এবার যথারীতি বোলার শূন্যে। তাকে বাদ দিল ক্যাপ্টেন। নতুন বোলার এসেছে। স্পিন বোলার।

‘যাঁক আঁস্তে বঁল কঁরবে। এঁবার ব্যাঁট কঁরতে কোঁনো সমঁস্যা হেঁব নাঁ’, মনে মনে ভাবল ভূতোং। কিন্তু প্রথম বলের পরেই বুঝতে পারল, ধীরগতির এ বল খেলা সোজা নয়। কিছু একটা করতেই হচ্ছে। দ্বিতীয় বলটা মাটিতে পড়েই এক পাক ঘূর্ণি দিয়ে সোজা ভূতোংয়ের সামনে এসে স্থির হয়ে গেল। দেখেশুনে বলটাকে সোজা বোলারের মাথার ওপর দিয়ে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিল। ছক্কা! সবাই প্রথমে অবাক হলেও ছক্কার আনন্দে তা চাপা পড়ে গেল। পরের বলটা ইচ্ছা করেই ছেড়ে দিয়েছে ভূতোং। কিন্তু সেটা ধরতে গিয়ে ধাম করে পড়ে গেল উইকেটকিপার। বলটাও তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে লাফাতে সোজা চলে গেল সীমানার বাইরে। চার! তিন বলে দুই রান হলেই জিতে যাবে ভূতোংয়ের দল। এদিকে উইকেটকিপার এখনো উঠতে পারেনি। উঠতে গেলেই ধপাস করে পড়ছে। শেষমেশ দেখা গেল কিভাবে যেন ওর দুই জুতার ফিতা একসঙ্গে পেঁচিয়ে আছে। ফিক করে হেসে ফেলে ভূতোং। ঘটনা সে-ই ঘটিয়েছে কিনা।

তবে জেতার জন্য শেষ দুই রান নিতে ভৌতিক ক্ষমতার আশ্রয় নেয়নি ভূতোং। স্বাভাবিকভাবেই বলটাকে শর্ট থার্ড ম্যান দিয়ে ঠেলে দিয়ে পেয়ে গেল ম্যাচ জেতানো রান। সেই সঙ্গে ভূতোং হয়ে গেল জয়ের নায়ক। তবে এখন আর তাকে ভৌতিক কাজকর্মের আশ্রয় নিয়ে হয় না। নিয়মিত অনুশীলন করে সে এখন পাকা ব্যাটসম্যান।


মন্তব্য