kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

গল্প

হুতুম ও তিতলি

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হুতুম ও তিতলি

আঁকা : বিপ্লব

তিতলিদের বাসার ঠিক পাশেই হুতুমের বাসা। অবশ্য কখনো ওদের দেখা হয়নি সামনাসামনি।

একদিন বাসার গর্ত থেকে মুখটা বাড়িয়ে দিয়েছিল কেবল হুতুম। সেদিনই খুব করে বকে দিয়েছিল মা। ওদের দিনের বেলায় বাসার বাইরে বেরোতে নেই। আলোর ভেতর বের হতে হুতুমের যে ভালো লাগে তা নয়। কিন্তু তিতলিকে তার বড্ড দেখার শখ। কেমন মিষ্টি করে গান করে মেয়েটা। হুতুমের বাবা অবশ্য বিরক্ত হয় তিতলির গানে। হওয়ারই কথা। সারা রাত বাইরে বাইরে ঘুরে দিনের বেলা যেই একটু শান্তিমতো ঘুমাতে যায় বাবা, অমনি গান শুরু হয় তিতলির।

হুতুম অবশ্য রাত জাগে না এখনো পুরোপুরি। বয়স মাত্র তিন সপ্তাহ। এ বয়সে কেউ বাইরে বেরোয় না। বড়রা খাবার এনে দিলে সেটা খায় আর পড়ে পড়ে ঘুমায়। তবে তিতলিকে দেখার শখ হুতুমের। কখনো মানুষ দেখেনি ও। বড়দের মুখে মানুষের গল্প শুনেছে। সেই থেকে শখ। মানুষ যদি কাউকে দেখে তাহলে প্রথমে তিতলিকেই দেখবে সে। অবশ্য রাতের বেলা বাসা ফাঁকা থাকলেও লাভ হয় না। তিতলি তখন ঘুমিয়ে যায়। বাসার পাশের জানালার সামনে আসে না। আর এদিকটায় না এলে ওকে দেখতে পাবে কী করে হুতুম?

দিনের বেলায় তিতলি হুতুমের বাসার একদম কাছটিতে থাকে। তবে সে সময় আবার বাসাভর্তি লোকজন। হুতুমকে ওরা বাইরে মুখটা বাড়াতেই দেয় না। তবে আজ যে করেই হোক, তিতলিকে দেখবে সে। বাসা থেকে বেরোবেই। মা-বাবা ঘুমাচ্ছে। খানিক আগে শেষ হয়েছে তিতলির গান। এখন অনেকক্ষণ ওরা ঘুমাবে।

 

পা টিপে টিপে বাসার একদম শেষ মাথায় চলে এলো হুতুম। ওই যে জানালার এপাশ থেকে একটা কিছু দেখা যাচ্ছে। মানুষই হবে হয়তো।   যেই একটু এগিয়ে দিয়েছে ঘাড়টা, অমনি কে যেন একটানে আকাশে উঠিয়ে নিল হুতুমকে। জীবনে কখনো বাসার বাইরে বেরোয়নি হুতুম। আর আকাশ? সেটা কেবল একটু-আধটু দেখেছেই। কখনো আলোর ভেতরে আকাশে উড়বে সেটা কল্পনাও করতে পারেনি। আর এখন? কেমন জোরেশোরে আকাশের গায়ে বাতাস কেটে উড়ে বেড়াচ্ছে সে! ভয়ের চোটে দম আটকে ফেলল হুতুম। আর অমনি একটা শক্ত জায়গার ওপর ধুপ করে ফেলে দিল ওকে এতক্ষণ উড়তে থাকা জিনিসটা।

কালো রঙের একটা পাখি। ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল। এটাই তবে সেই কাক নয় তো, যার ভয়ে দিনের বেলায় বাসা থেকে বেরোতে পারে না ও? একটা গুঁতা দিল ওকে কাকটা। তারপর জোরে জোরে ডাকতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে চলে এলো আরো কতগুলো কালো কাক। হুতুমকে নিয়ে খেলনার মতো খেলছে তারা। কেউ একবার এদিক দিয়ে ঠোকর দিচ্ছে তো আরেকবার ওদিক দিয়ে। এ রকম আর কিছুক্ষণ চলতে থাকলে হয়তো ভয়েই মরে যেত হুতুম। কিন্তু হঠাৎ একটা কণ্ঠ বলে উঠল—

—মা! এই দেখো! কাকগুলো একটা পাখিকে ধরেছে। জানালার কার্নিশে রেখেছে।

—ওটা পেঁচা তিতলি।

চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাকগুলোর ফাঁক দিয়েই তিতলিকে দেখল হুতুম। এই তো তিতলি! ডাকতে চাইল। তবে মুখ দিয়ে বিদঘুটে একটা শব্দ ছাড়া কিছুই বের হলো না।

—মা, দেখো না। পাখিটা কাঁদছে। বাচ্চা পাখি।

—কাকগুলোকে তাড়িয়ে দাও। মা বলল।

সঙ্গে সঙ্গে একটা সরু লাঠি নিয়ে জানালার গোল ছিদ্র দিয়ে কাকগুলোকে হেই হেই করে তাড়িয়ে দিল তিতলি। ভয় পেয়ে উড়ে গেল কাকেরা। বাহ, তিতলির এত শক্তি! কাকের মতো ভয়ংকর পাখিগুলোও ওকে ভয় পায়! অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল হুতুম তিতলির দিকে।

—মা, পেঁচাটা তো উড়ছে না।

—ছোট বোধহয়। সন্ধ্যা হলেই ওর মা-বাবা ওকে নিতে আসবে।

—তাহলে আমি ওকে পাহারা দিই ততক্ষণ। নাহলে দুষ্টু কাকগুলো খেয়ে ফেলবে। জানালার পাশে একটা ছোট্ট টুল নিয়ে তাতে বসল তিতলি। তিতলির কথা শুনে ভাবছিল হুতুম। সত্যিই কি মা-বাবা নিতে আসবে ওকে? ওরা জানবে কী করে যে হুতুম কোথায়? কিন্তু সত্যি সত্যিই মা-বাবা এলো। সন্ধ্যা হওয়ার অনেক আগেই এলো। হুতুমকে বাসায় না দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল ওরা। ছেলেকে দেখে ছুটে এলো। বাসায় নিয়ে গেল ওরা হুতুমকে। যাওয়ার সময় চোখের কোনা দিয়ে দেখল হুতুম। তিতলি জানালার পাশেই বসে আছে এখনো। মুখে হাসি। ওর মুখে হাসি ঠিক ফোটে না। তাও যতটা সম্ভব বড় করে একটা হাসি দিল হুতুমও।


মন্তব্য