kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

গল্প

হাসির ওষুধ

তৌহিদ এলাহী

অলংকরণ : বিপ্লব   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



হাসির ওষুধ

বিশ্ববিদ্যালয়ে ঈদের ছুটি। সব ফাঁকা।

নিপুর বাবা গেছে এক বিজ্ঞান সম্মেলনে। মা আর ভাইয়াও গেছে শপিংয়ে। ফিরতে দেরি হবে। রাত পর্যন্ত নিপু একা। কী করবে ভাবছে সে।

নিপুর বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিজ্ঞান পড়ান। বিজ্ঞানীও বটে। টিচার্স  কোয়ার্টারে থাকে তারা। নিপু পড়ে ক্লাস টেনে। তবে বাবার ল্যাবরেটরি ঘেঁটে ঘেঁটে অনেক কিছু শিখে ফেলেছে।

ল্যাবরেটরির সব কেমিক্যাল তার চেনা। রাতে খাবার আগে টিভি দেখার কথা ভাবল  সে।

ধুর! কারেন্ট চলে গেল।

মোমবাতির প্যাকেটটা বাসার কোনায় রাখা। সেখানে পুরনো জিনিসের স্তূপ। অন্ধকারে হাতড়ে স্তূপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে পাওয়া যাচ্ছে না।   

হাতে কনিক্যাল ফ্লাস্কের মতো কী যেন লাগল। ল্যাম্প? মনে হয় কাচের, না না পিতলের।

হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখল। ময়লা পরিষ্কারের জন্য দিল ঘষা। অমনি ল্যাম্পের মুখ দিয়ে সাঁই সাঁই করে আগুনের ফুলকিসহ গ্যাসের মতো বেরোতে শুরু করল। তীব্র গন্ধ। চোখ ঝাপসা করে দিচ্ছে, মাথা ঝিমঝিম করছে।

‘হা হা হা মালিক, হা হা হা, ভয় পাবেন না। হা হা হা। আপনি আমাকে মুক্ত করেছেন।   আপনার সেবায় প্রস্তুত মালিক। হুকুম করুন। হো হো হো। ’

ছাদ সমান লম্বা দৈত্য। ইয়া মোটা। মাথায় এক চিলতে চুল। গায়ে বেঢপ আলখেল্লা।

‘হা হা হা। আমাকে যা বলবেন তাই করব। হো হো হো। ওই অভিশপ্ত ল্যাম্পের মধ্যে ছিলাম। কখনো হাসতে পারিনি জনাব। এখন প্রাণ খুলে হাসব। হো হো হো। ’

কোনো রকমে সাহস করে বলে নিপু, ‘আপনি এখান থেকে ভাগেন। আপনাকে আমার দরকার নেই। ’

‘হা হা হা, কী বলছেন মালিক?’ মালিককে ছেড়ে যাওয়ার নিয়ম দৈত্য সমাজে নেই। যত দিন বাইরে থাকব তত দিন আপনার হুকুমে চলব। হুকুম করুন...হা হা হা হা। ’

ঘটনা বুঝতে পারে নিপু। বলে, ‘এভাবে হাসবেন না। আপনার হাসি খুবই বাজে। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে হাসছেন কেন?’

‘হা হা হা হা মালিক। হাসি ছাড়া দুই মিনিটও থাকতে পারব না। আপনার হুকুম মতো সব করতে পারব। শুধু হাসি থামাতে পারব না। হাসি থামালেই আবার ল্যাম্পের ভেতর চলে যাব, হো হো হো। ’

অট্টহাসিতে সারা ঘর কাঁপিয়ে দিচ্ছে আজব দৈত্য। হাসির দমকে ঘরের সব জিনিসপত্র দুলে উঠছে।

‘ঠিক আছে। আপনি দেখছি হুকুম পালন করতে অস্থির। যান ডিম ভেজে দিন। ভাত খাব। ’ বলল নিপু।

রান্নাঘরে গেল দৈত্যটা। রান্না করবে কী! হাসছে তো হাসছেই। বিরক্ত হয়ে কিছুক্ষণ পর রান্নাঘরে ঢুকল নিপু।

দৃশ্য দেখে চোখ ছানাবড়া। ব্যাটা করছে কী? প্রতিবার হাসির শব্দে একটা করে ডিম হাত থেকে মেঝেতে পড়ে ফেটে যাচ্ছে। এক চুলা জ্বালাতেই পুরো ম্যাচ সাবাড়। তেলের বোতল পড়ে পুরো মেঝে তেলতেলে। আর সে হাসছেই, হো হো হো..হা হা হা।

‘যান ভাগেন। আমার ডিম আমি ভাজি। আর টিভি চালু করেন। কার্টুন দেখতে হবে। শোবার ঘরটা পরিষ্কার করে রাখবেন। ময়লা কিছু থাকলে ডাস্টবিনে ফেলে দেবেন। আর আমাকে মালিক বলে ডাকবেন না। আমার নাম নিপু। ’

‘হা হা হা, জো হুকুম মালিক, নিপু। আমি যাচ্ছি, হো হো হো। আপনি আমাকে তুমি করে বলবেন । হা হা হা হা। ’

এ তো দেখি মহা উৎপাত। টিভি চালু করতে গিয়ে হাসির শব্দে স্ট্যান্ড থেকে টিভি উল্টে ফেলে দিয়েছে। বেকুব দৈত্য বোকার মতো হাসছেই।

‘স্যরি, মালিক। টিভিটা ভেঙে দিয়েছি। তবে আপনার বেডরুম একদম ফকফকা। হা হা হা। ’

রাগে নিপুর কান্না চলে এসেছে। পরিষ্কার করতে বলায় বেডরুমের সব কিছু ফেলে দিয়েছে বোকাটা। কাঁথা-বালিশ, লেপ-তোষক, তোয়ালে, কাপড়চোপড় সব। থাকার জায়গাটা রইল না বুঝি। যে করেই হোক একে বিদায় করতেই হবে।

‘হা হা হা জনাব, আমার খুব খিদে পেয়েছে। গত দেড় শ বছর পেটে দানাপানি কিছুই পড়েনি। ’ বলেই রান্নাঘরে চলল দৈত্য।

প্রথমে হাঁড়িভর্তি কাঁচা চাল গপাগপ গিলে  ফেলল। ফ্রিজের মাছ, ফুলকপি, গাজর, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন যা আছে নিমেষে সাবাড়।

‘হা হা হা মালিক, ধন্যবাদ। অনেক মজা করে খেলুম। এখন ঘুমাই হো হো হো। ’

ড্রইংরুমে সোফা-টেবিল হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে মেঝে দখল করে ঘুমিয়ে পড়ল দৈত্যটা। নাক দিয়ে বিকট শব্দ বেরোচ্ছে। হ-র-র, হো হো, ঘ-র-র। নাক ডাকছে? নাকি হাসছে!

তীব্র শব্দদূষণে কানপাতা দায়। এই মহা যন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে থাকল নিপু।

হঠাৎ বুদ্ধি খেলে গেল। হাসি ছাড়া দৈত্যটা থাকতে পারে না। তাই হাসির বিপরীতে একটা কিছু করতে হবে তাকে।

বাবার ল্যাবে ঢুকে একটা কেমিক্যালের কৌটা বের করল। নাকে মাস্ক পরে ড্রইংরুমে ঢুকল নিপু। পা টিপে টিপে দৈত্যের নাকের কাছে গিয়ে দিল স্প্রে চেপে। বিরাট হাত দিয়ে দৈত্যটা ধাক্কা দিল নিপুকে। শক্তিশালী ধাক্কায় সোফায় ছিটকে পড়ল নিপু। দৈত্যটা ঘুম থেকে টলতে টলতে উঠে নিপুর দিকে আগায়। রাগে চোখ জ্বল জ্বল করছে তার। নিপুর গলা চেপে ধরার জন্য হাত বাড়াল। নিপু শেষ চেষ্টা করল। লাফ দিয়ে দৈত্যের ঘাড়ে উঠে নাকের ভেতর স্প্রে নিয়ে প্রাণপণে চেপে ধরল।

নিস্তেজ হয়ে পড়ল দৈত্যটা। বোকার মতো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে শুধু। হাসি একদম বন্ধ! ঘটনা কী! নিপু বুঝতে পারল, ক্লোরোপিক্রিন বা কাঁদুনে গ্যাসে কাজ হয়েছে। হাসি আর কান্নায় কাটাকাটি। দেখা যাক এবার কী করে দৈত্য।

হাসতে না পেরে মুখ ভার করে দৈত্যটা চলে গেল আবার সেই কৌটার ভেতর। যাওয়ার সময় ফিকফিক করে কেঁদেও উঠল খানিকটা। তা দেখে হো হো হো করে এবার নিজেই হাসিতে ফেটে পড়ল নিপু।


মন্তব্য