kalerkantho


গল্প

টুপু ও তার রবিন ভাইয়া

তৌহিদ এলাহী

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



টুপু ও তার রবিন ভাইয়া

অলংকরণ : মানব

টুপু ভাবে, তার রবিন ভাইয়া ইদানীং পাগলটাগল হয়ে যাচ্ছে মনে হয়। ভার্সিটিতে সায়েন্সে পড়ে।

দিনরাত এটা ওটা নিয়ে গবেষণা করে। পাগল হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে কয়েক দিন আগেও এমন ছিল না। টুপুর সঙ্গে খেলতো। এখন ঘুড়িটাও উড়ায় না।

টুপুর ক্লাস ফাইভের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ আর রবিন ভাইয়ার পাগলামিও শুরু। সকালে নাশতা করেই দরজা বন্ধ। ক্লাসে যায় না। কারো সঙ্গে কথা বলে না।

বাইরেও যায় না। সারা দিন খুটুর-খাটুর কী যেন করে। মাঝেমধ্যে বাক্সের মধ্যে হাবিজাবি নিয়ে ছাদে যায়। পুরনো ফ্যান দেখা যায় হাতে। একদিন পাড়ার এক দোকান থেকে এক গাদা পুরনো টিভির রিমোট নিয়ে এলো। সবাই ভাবল, ও আবার বিজ্ঞান গবেষণা ছেড়ে টিভির মেকানিক হয়ে যাচ্ছে না তো! সেদিন ছাদে যাওয়ার সময় টুপু ভাইয়াকে বলল, ‘ভাইয়া, তুমি কি ছাদে ঘুড়ি উড়াতে যাচ্ছ? আমাকে নিয়ে যাও না। ’

ভাইয়ার মেজাজ গেল চড়ে। ‘দেখছিস না কাজ করছি। ঘুড়িফুড়ি এখন উড়াই না। বিরক্ত করবি না। ’

টুপু চুপি চুপি ভাইয়ার পিছু নিল। কিন্তু রবিন ভাইয়া সেটা দেখে ফেলল। টুপুর মুখের সামনেই দড়াম করে ছাদের দরজা বন্ধ করে দিল। ভাইয়ার কাণ্ড দেখে টুপুর ভীষণ কান্না পেল।

এক সপ্তাহ পরেই টুপুর জন্মদিন। এবার মনে হয় জন্মদিনটাও খুব বাজে যাবে। এক সপ্তাহ হলো ভাইয়া তার সঙ্গে কথা বলাও বন্ধ করে দিয়েছে। চুল-দাড়ি গজিয়ে একাকার। টুপুর মনে ভয়, ভাইয়া বুঝি এবার সত্যিই পাগল হয়ে গেল।

টুপু ভাবছে জন্মদিনে কী করবে সেটা। গত মাসে সেতুর জন্মদিন ছিল। টুপু গিয়েছিল তার বাসায়। সেতুর ছোট মামা আমেরিকা থেকে একটা খেলনা প্লেন এনেছিল। সুইচ দিলে কিছুটা উড়ে, আবার নামে। ওটা নাকি ডিজনি প্লেন। জিনিসটা টুপুর খুব পছন্দ হয়েছিল। সেদিন রাতেই ভাইয়াকে প্লেনের গল্প শুনিয়েছিল টুপু। দামটা নাকি বেশি।

জন্মদিনের আর এক দিন বাকি। মোটেও ফুর্তিতে নেই টুপু। ভাইয়ার পাগলামি চূড়ান্ত পর্যায়ে। খাওয়া-দাওয়াও বন্ধ। মন খারাপ ছেড়ে টুপু এখন দুশ্চিন্তায় পড়েছে।

সকালে উঠে নাশতা না করেই বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে বেরিয়ে যায় ভাইয়া। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়। ভাইয়া আসে না।

আজ টুপুর জন্মদিন। মা-বাবা বাসা সাজাচ্ছে। বন্ধুরা আসবে। আরো অনেকেই আসবেন। কিন্তু টুপুর মন খারাপ। ভাইয়া তার রুমে দরজা বন্ধ করে নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। ভোরে নাকি ঘুমিয়েছে।

দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। কেক কেটে সবাই হ্যাপি বার্থডে গানও গাইল। এটা-ওটা গিফট পেয়েও টুপুর মন ভালো না। এমন সময় ভাইয়া এলো হাই তুলতে তুলতে। ভাইয়া টুপুকে ডাকল, ‘এই তোর বন্ধুদের নিয়ে ছাদে আয়। ’

ভাইয়া রুম থেকে চওড়া বাক্সটা নিয়ে এলো। টুপুর বুঝতে পারছে না কিছু। তবে তার খুশি খুশি লাগছে। বন্ধুরাও বেশ আগ্রহ নিয়ে বসে আছে। সবাইকে নিয়ে ছাদে গেল টুপু। একটু পর ভাইয়াও এলো। র‌্যাপিং পেপারে মোড়ানো ভারী জিনিসটা টুপুর হাতে দিয়ে বলল, ‘এটা খোল’।

বাক্স খুলতেই ইয়াহু বলে চিত্কার করে উঠল টুপুর বন্ধুরা। টুপু বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। তার মুখে উপচে পড়ছে হাসি। ছয়টি পাখাওয়ালা একটি অদ্ভুত যন্ত্র। টিভিতে দেখেছে। হেলিকপ্টারের মতো অনেকটা। ভাইয়া বাক্সের ভেতর থেকে রিমোট কন্ট্রোল বের করে বলল, ‘এটা নে। রিমোট কন্ট্রোল। এটাকে বলে ড্রোন। এত দিন ধরে তোর জন্য বানিয়েছি। মাঝেমধ্যে ঘুড়ি উড়াবি, আর মাঝেমধ্যে ড্রোন। ঠিক আছে?’

আনন্দে টুপু কথাই বলতে পারল না। ছয় পাখাওয়ালা যন্ত্রটার সুইচ অন করে রিমোটে চাপ দিতেই ভোঁ ভোঁ করে ওপরে উঠে গেল ড্রোনটি। কিছুক্ষণ ঘুড়ির মতো গোত্তা খেল। টুপু ধরে ফেলল কিভাবে এটা চালাতে হয়। এমন সময় ভাইয়া আচমকা টুপুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘ওহ... হ্যাপি বার্থ ডে। ’

টুপু এবারও কিছু বলতে পারল না। খুশিতে মনে হচ্ছে সে নিজেই যেন একটা ড্রোন। আকাশে উড়ছে!


মন্তব্য