kalerkantho


মুক্তিযোদ্ধা রাবেয়া

আহমেদ রিয়াজ   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মুক্তিযোদ্ধা রাবেয়া

অলংকরণ : দেওয়ান আতিকুর রহমান

ঘরে উঁকি মেরেই চমকে উঠল রাবেয়া। ওরা ছয়জন।

চারজন বড় মানুষ। দুজন ছোট। ওর চেয়ে দু-তিন বছরের বড় হবে। মানুষগুলোর জন্য বড্ড মায়া হলো ওর। ওদের দেখেই বুঝে ফেলেছে রাবেয়া—সবাই মুক্তিযোদ্ধা।

কিছু একটা করতেই হবে।

মুক্তির দলটা পথ হারিয়ে ফেলেছিল। তখন সন্ধ্যে হয় হয়। নদীর কিনার ধরে যাচ্ছিল ওরা।

ওদের দেখতে পেয়েই এগিয়ে গেল মতি। জানতে চাইল, বন্দুক নিয়ে এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আপনারা কি মুক্তিযোদ্ধা?

দলের কমান্ডার কিছু বলার আগেই এক মুক্তিযোদ্ধা বললেন, হুঁ। নদীটা পেরোতে হবে। কিন্তু কোনো খেয়া দেখতে পাচ্ছি না। সাহায্য করতে পারেন চাচা?

মতি এক গাল হেসে বলল, অবশ্যই। নিশ্চয়ই অনেক দূর থেকে এসেছেন। আহা! মুখগুলো কেমন শুকিয়ে আছে। রাতে আর নদী পেরোবেন? আমার বাড়িতে রাতটা থেকে যান। ভোরে না হয়...।

মুখ খুললেন কমান্ডার, আমরা রাতেই পেরোবো। একটা খেয়া জোগাড় করে দিলে উপকার হয়।

মতির চোখজোড়া চক চক করে ওঠে। গলায় মধু ঢেলে বলে, ঠিক আছে। রাতেই ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু না খেয়ে যেতে পারবেন না। ওই যে আমার বাড়ি। চলুন, চলুন। আবার কবে পেট ভরে দুমুঠো ভাত খেতে পারবেন তার কি ঠিক আছে?

ভাতের কথা মনে হতেই মুক্তিদের ছয়জোড়া চোখ চক চক করে ওঠে। সেই কবে মায়ের হাতের রান্না করা খাবার খেয়ে বেরিয়েছিল!

দলটাকে একরকম জোর করেই বাড়িতে নিয়ে এলো মতি। তারপর কাচারি ঘরে বসাল। আর রান্নার ব্যবস্থা করে ফেলল।

খাবারের সুবাস কাচারি ঘরেও চলে এসেছে। খাবারের অপেক্ষায় বসে রইল মুক্তির দলটি।

খানিকবাদে ঘর থেকে বেরিয়ে উত্তর দিকে হাঁটতে শুরু করল মতি। উত্তরে কেন? ভাবতে গিয়েই জবাব পেয়ে গেল রাবেয়া। ওদিকে তো পাকিস্তানি হায়েনাদের ক্যাম্প!

রাবেয়ার ছোট্ট বুকটা ধুক করে উঠল। মতি নেই, এটাই সুযোগ। কাচারি ঘরের বারান্দায় মাত্র পা রেখেছে ও, অমনি পেছন থেকে মতির গর্জন, অ্যাই! এখানে কী করছিস? ঘরে যা...।

ওরে বাপরে! এত জোরে কেউ ধমকায়? কিন্তু মতি চাচা ফেরত এলো কেন? তবে কি হায়েনাদের ক্যাম্পে যায়নি? নিশ্চয়ই যায়নি। গেলে এত তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে পারত না।

ধমক খেয়ে কাচারি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো রাবেয়া। ভেবেছিল এই সুযোগে মুক্তিদের সাবধান করে দেবে। পালিয়ে যেতে বলবে। কিন্তু পারল না। মতির পরিকল্পনা এখন ওর কাছে পরিষ্কার। ওদের তুলে দেবে হায়েনাগুলোর হাতে। আর মধ্যরাতে ক্যাম্প থেকে মুক্তিদের আর্তচিত্কার শুনতে পাবে। চার দিন আগেও এমন হয়েছিল। ক্যাম্প থেকে চিত্কার ভেসে এসেছিল। তিন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরিয়ে দিয়েছিল মতি। ঠিক আজকের মতো। কিন্তু আজ রাবেয়া সেটা হতে দেবে না। কোনোভাবেই না।

ওদিকে খাবার রান্না হয়ে গেছে। গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি। মতির ঘরে গরু-ছাগলের কমতি নেই। সবই লুট করে আনা। বড় একটা কাঁসার গামলায় করে খাবার এনে রাখা হলো কাচারি ঘরে। ছয় মুক্তির সামনে ছয়টা থালা। থালা ভর্তি খাবার। গরম গরম। ধোঁয়া উড়ছে খাবার থেকে।

খাবার দেখে খুশি মুক্তিরা। চোখে-মুখে হাসি। এখানকার মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের এত ভালোবাসে! কমান্ডারের চোখ ভিজে আসতে শুরু করল।

মুক্তি কমান্ডার বললেন, চাচা, আমাদের সঙ্গে বসেন?

মতি একগাল হেসে বলল, উঁহু। আপনারা খান। আস্তে আস্তে খান। খুব গরম। মুখ পুড়িয়ে ফেলবেন না যেন।

বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে আবার উত্তরে হাঁটতে শুরু করল মতি। খাবার শেষ হওয়ার আগেই যা করার করতে হবে।

ঘরের দরজায় জাহিদ মিয়া। মতি পাহারায় রেখে গেছে। এখন উপায়?

হঠাৎ বুদ্ধি পেয়ে গেল রাবেয়া। এক ছুটে দৌড়ে গেল রসুইঘরে। ওখানেই থরে থরে সাজানো আছে পাটকাঠি। চিকন আর লম্বা একটা পাটকাঠি নিল। দৌড়ে এলো কাচারি ঘরের পেছনে। ভাগ্যিস জায়গাটা অন্ধকার। কিন্তু মুক্তিরা ওর কথা বুঝতে পারবে তো? বুঝতে পারলেও বিশ্বাস করবে তো?

বাঁশের বেড়ার একটা ফাঁক দিয়ে পাটকাঠিটা ঢুকিয়ে দিল রাবেয়া। উহ্ করে উঠল কেউ। ফিস ফিস করে বলল রাবেয়া, জলদি পালান!

মুক্তি কমান্ডারের গায়েই লেগেছে খোঁচাটা। তাঁর উহ শুনেই পাশের মুক্তি জানতে চাইলেন, কী হয়েছে রবি ভাই?

আবার ফিসফিস করে বলল রাবেয়া, এটা রাজাকারের বাড়ি। মতি রাজাকার আর্মিদের খবর দিতে গেছে। জলদি পালান। নইলে কেউ বাঁচবেন না।

আরেক মুক্তিযোদ্ধা জানতে চাইলেন, রবি ভাই, কী হলো?

কমান্ডার বললেন, গরম খাবারে মুখ পুড়ে গেছে রে ভাই। এখন কী করি?

পানি খান। পানি খান।

বলেই এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলেন জাহিদ।

ঝটকা মেরে পানির গ্লাসটা ফেলে দিলেন কমান্ডার। দাঁড়িয়ে চিত্কার করলেন, শিগগির পালাও সবাই। এটা রাজাকারের বাড়ি।

সঙ্গে সঙ্গে যে যাঁর রাইফেল নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন মুক্তিযোদ্ধারা। বাইরে বেরোতেই দেখেন সামনে একটা ছোট্ট মেয়ে। রাবেয়া হাতের ইশারায় দক্ষিণ দিক দেখিয়ে দিল। ওদিকেই দৌড় দিলেন সবাই।

খানিক বাদেই একদল হায়েনা নিয়ে হাজির মতি। কিন্তু কাচারি ঘরে ঢুকেই অবাক। পাখিরা উড়ে গেছে। ভাবতে লাগল মতি, ওরা খবর পেল কেমন করে!

জবাবটা পেল আরো কিছুক্ষণ পর। যখন দেখল রাবেয়া নেই।

দাঁতমুখ খিঁচে বিড় বিড় করে বলল মতি, ডাইনিটার এত সাহস! পেয়ে নিই ওকে।

কিন্তু রাবেয়াকে কোথায় পাবে মতি? রাবেয়া তখন মুক্তির দলটাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে নিরাপদ জায়গায়। মনটা ভালো হয়ে গেল ওর। ওই মতিই ওদের ঘরবাড়ি লুটপাট করে জ্বালিয়ে দিয়েছে। ওর মাকে কোথায় নিয়ে গেছে জানে না ও।

মুক্তিকমান্ডার জড়িয়ে ধরলেন রাবেয়াকে। বললেন, তুমি এখন কী করবে বোন? মতি জানলে তো তোমাকে আস্ত রাখবে না।

রাবেয়া বলল, আমার বাবাও মুক্তিযুদ্ধে গেছেন। আমিও যুদ্ধে যাব। বাবাকে খুঁজব।

কমান্ডার মুচকি হেসে ওকে কোলে তুলে নিলেন। তারপর বললেন, আচ্ছা চলো।

অন্ধকার রাতে একদল মুক্তিযোদ্ধাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক খুদে মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা রাবেয়া।


মন্তব্য