kalerkantho

মুক্তিযুদ্ধের গল্প

লাল জামা

প্রিন্স আশরাফ

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



লাল জামা

সোনা মিয়ার বাবা বলেছে, ঈদের আগে যুদ্ধ শেষ হলে একটা জামা কিনে দেবে। লাল জামা।

সোনা মিয়ার জন্য যুদ্ধটা তাই ঈদের আগেই শেষ করা দরকার। বাবা বর্গাচাষি। কত দিন একটা নতুন জামা গায়ে ওঠে না তার। যুদ্ধ এসে গাঁয়ের সুখ তছনছ করে দিয়েছে।

গ্রামের সবাই গেছে যুদ্ধে। ডানপিটে সোনা মিয়ার বয়স ১২ কী ১৩। সেও গেছে। গেরিলা যোদ্ধাদের সাহায্য করবে।

জ্যোত্স্না-ঝলমল রাত।

মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার যোদ্ধাদের নিয়ে ঘাঁটি গেড়েছেন এক গ্রামে। মিটিংয়ে কমান্ডার জানতে চাইলেন, ‘এই এলাকা ভালোভাবে চেনে কে?’

উঠে দাঁড়াল সোনা মিয়া। সেতু পেরোলেই তার গ্রাম। এলাকাটা নিজের হাতের তালুর মতোই চেনা। সেতুর ওপর থেকে লাফিয়ে কতবার যে নদীতে পড়েছে।

কমান্ডার সোনা মিয়ার দিকে তাকালেন। এ কিশোরকে তিনি আগেও দেখেছেন। চুপচাপ কাজ করে। বেশ সাহস আছে ছেলেটার—ভাবলেন কমান্ডার।

‘সোনা মিয়া ছোট, তাকে এ কাজ দেওয়া যাবে না। ও বড়জোর পথ দেখিয়ে দিক,’ বললেন কমান্ডার।

সোনা মিয়া ছেঁড়া জামার ফুটো দিয়ে আঙুল গলিয়ে গা চুলকায়। কদিন ধরে খালের পানিতে ঝাঁপানো হয়নি।

আবদুল্লাহ নামে এক যোদ্ধা বলল, ‘কমান্ডার সাব, আমাদের লোকবল কম। সোনা মিয়া যদি শুধু পথ দেখায় তাহলে গুলির বাক্সের জন্য আরেকজনকে নিতে হবে। ’

কমান্ডার ভাবলেন, কথা সত্য। সোনা মিয়াই তবে গুলির বাক্স নিয়ে যাক।

কমান্ডার সোনা মিয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘কিরে সোনা মিয়া, গুলির বাক্স নিয়ে ওদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারবি না?’

সোনা মিয়া বলল, ‘পারব স্যার। ’ তারপর একটু ভেবে আবার বলল, ‘স্যার, আজকে জিতলে কি যুদ্ধ শেষ হবে?’

কমান্ডার বললেন, ‘জানি না। কেউ জানে না। ’ তারপর আবার হেসে জানতে চাইলেন, ‘এত তাড়াতাড়ি যুদ্ধ শেষ করে কী করবি?’

সোনা মিয়া লজ্জা পেল। বলল, ‘আব্বা কইছে যুদ্ধ শেষ হইলে আমারে একটা লাল জামা কিনা দিব। ’

সবাই হাসল।

চাঁদ ডুবে গেছে। তারার আবছা আলোয় পথ দেখা যায় সামান্য। সোনা মিয়ার মাথায় গুলির বাক্স। গায়ে বেল্টের মতো করে জড়িয়েছে গুলির লতা। হামাগুঁড়ি দিয়ে এগোচ্ছে মুক্তিযোদ্ধারা। পিছে পিছে সোনা মিয়া।

মাঝরাতের দিকে ওরা চলে আসে কদমতলা সেতুর কাছাকাছি। ওদের টার্গেট সেতুর নিচের পিলার। কিন্তু এ কি! রাজাকাররা যে সেতুর ওপরেই টহল দিচ্ছে। গুলির বাক্স মাথায় নিয়ে উবু হতে পারছে না সোনা মিয়া।

মিলিটারি আর রাজাকাররা দেখে ফেলে মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযোদ্ধারা সেতুর নিচে পৌঁছানোর আগেই শুরু হয় গুলিবর্ষণ। ততক্ষণে সেতুর নিচে পিলারের আড়ালে পৌঁছে গেছে মুক্তিযোদ্ধারা।

পরিকল্পনা বদলাতে হলো যোদ্ধাদের। সেতু উড়িয়ে দেওয়ার আগে গুলি করে পাকিস্তানি বাহিনীকে পিছু হঠাতে হবে। কিন্তু গুলি তো সব সোনা মিয়ার হাতে। অন্ধকারে তাকে ঠাহর করা যাচ্ছে না। সোনা মিয়া না এলে নির্ঘাত মরতে হবে সবাইকে। সোনা মিয়ার নাম ধরে ডাক দিল আবদুল্লাহ।

সেতুর কাছ থেকেই চাপা গলায় সোনা মিয়া বলল, ‘ভাইজান, আইসা পড়ছি। ’

আবদুল্লাহ দেখতে পেল সোনা মিয়াকে। দেখে ফেলল মিলিটারিরাও। আবদুল্লাহ বুঝতে পেরেই গুলি ছুড়তে ছুড়তে হাঁক ছাড়ল, ‘সোনা মিয়া, পিছু হটে যা। ওরা তোকে দেখে ফেলেছে। পানিতে ঝাঁপ দে। ’

সোনা মিয়া পড়ল চিন্তায়। গুলির বাক্স দিলেও গুলির পাতাটা তার গায়ে পেঁচানো। ওটা খোলার সময় পায়নি। কাঁধে এখনো বিরাট দায়িত্ব। এদিকে পানিতে ঝাঁপ না দিলে গুলি খাবে নির্ঘাত। আবার পানিতে ভেজালে গুলিগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।

একটা বুদ্ধি এসেছে সোনা মিয়ার মাথায়। গায়ের ছেঁড়া জামা দিয়ে গুলির পাতাটাকে পেঁচিয়ে কাপড়ের পুঁটলির মতো বানিয়ে ফেলল। এরপর খালের পানিতে দিল ঝাঁপ।

গোলাগুলি একটু কমে এলে পানি থেকে উঠে এলো সোনা মিয়া। তখনই একটা গুলি এসে লাগল তার বুকে। লুটিয়ে পড়ল সোনা মিয়া।

মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে পিছু হটেছে পাকিস্তানি বাহিনী। ওরা ফিরে এসে দেখল সোনা মিয়া শুয়ে আছে। গুলি পেঁচানো জামাটা রক্তে লাল হয়ে পড়ে আছে গায়ের ওপর। ঠিক যেন একটা লাল জামা।


মন্তব্য