kalerkantho

নেপাল-তিব্বত বর্ডার: বাঞ্জি জাম্পে মিলল সাহসিকতার সনদ

কামাল হোসেন সৈকত   

৩০ নভেম্বর, ২০১৮ ১৬:২৮ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নেপাল-তিব্বত বর্ডার: বাঞ্জি জাম্পে মিলল সাহসিকতার সনদ

ভোর ৪টা ৫০ মিনিট। ঘড়ির অ্যালার্মের কর্কস শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। দ্রুত রেডি হতে হবে আমাকে একা। ৫টা ৪৫-এ গাড়ি ছেড়ে যাবে। মিস হলে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। হলউইন নাইট হওয়ায় থামেল এখনো জাগ্রত। অলিগলি থেকে বের হয়ে লোকজন দুলতে দুলতে ঘুমোতে যাচ্ছে। অচেনা শহর হলেও নিরাপদ মনে হয়েছে। গন্তব্যের গলিতে ঢুকব এমন সময় গার্ড থামিয়ে দিয়ে বলল-‘আপ কাহাছে যারেহো?’ ও আচ্ছা! এখনো তো বলা হয়নি কোথায় যাচ্ছি!

১২ ঘণ্টা আগে অর্থাৎ গতকাল ফিরছিলাম অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্প মিশন কমপ্লিট করে পোখারা থেকে কাঠমুন্ডুতে। নির্দিষ্ট সময়ের একদিন আগে ট্র্যাকিং শেষ হয়ে যাওয়ায় হাতে আছে পুরো ২৪ ঘন্টা। কী করা যায় এমন আলাপে আমাদের তিন ভবঘুরের হরেক প্ল্যানের মাঝে হঠাৎ মাথায় চাপল লাফ দেয়ার ভূত। অবশ্য এ প্ল্যানে আর কেউ রাজি নয়। ট্যুর গ্রুপ বিডি (টিজিবি) এর কর্ণধার ইমরান ভাই শেষ মুহূর্তে ই-মেইলে রেজিস্ট্রেশন করে কনফার্ম করে দিয়েছিলেন। বাঞ্জি আর সুইং দিতে দ্য লাস্ট রিসোর্ট এর থামেল অফিসে গিয়ে যখন রিপোর্টিং করি সময় তখন ভোর ৫টা ৪১ মিনিট। দেখি আমিই প্রথম, একে একে প্রায় ২৫ জনের মত ছেলে-মেয়ে আসল। সবাইকে নিয়ে বাস ছাড়ল ভোর ৬টার দিকে। পথিমধ্যেও আরো কয়েকজন উঠল। 

জানালার পাশ দিয়ে ঘুমন্ত নেপালের জেগে ওঠা দেখছিলাম। সূর্য্য মামা উঁকি দিল। সম্বিত ফিরে ফেলাম। হঠাৎ ভাবনায় এলো- আবেগ নিয়ে তো বলে দিয়েছিলাম লাফ দেবো। আর সে উদ্দেশ্যে বেরিয়েও পড়েছি। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ভিডিও দেখা কিংবা পড়া এখনো হয়নি! যা হবার হোক বলে ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করি। কিন্তু ভাবনা আর ছাড়ে না। এদিকে গাড়ি যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। টিম লিডার সন্তোষ দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল- 'তিন ঘণ্টা বাকি হ্যাঁয়, আপলোক ব্রেকফাস্ট কার দ্যুজে। টুয়েনটি ফাইভ মিনিট তোমহারা টাইম হ্যাঁয়'।

ঝুলন্ত আকৃতির রেস্টুরেন্টের সামনে বাস থামল। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে খরস্রোতা পাথুরে নদী। আরেকটি পাশে উঁচু পাহাড়। একজন ইশারা দিয়ে বলল নাস্তা নিজেকে গিয়ে আনতে হবে। পরে নাস্তার টেবিলে আলাপকালে জানতে পারলাম মেয়েটি বাংলাদেশের রংপুর মেডিক্যাল কলেজে পড়ে। বাড়ি নেপাল। অংশগ্রহণকারীর তালিকায় বাংলাদেশ দেখে আগ বাড়িয়ে তাই কথা বলা। এভাবে আরো কিছু বন্ধু জুটে গেল। গানের সাথে সাথে গাড়ি ছুটে চলল। ১০টা ১০ মিনিটে একদম তিব্বত-নেপাল বর্ডারে দ্য লাস্ট রিসোর্টের সম্মুখে গাড়ি থামল। 

রাস্তার ওপারে রিসোর্ট। মধ্যখানে ঝুলন্ত ব্রিজ। এ ব্রিজেই অ্যাক্টিভিটি চলছে। মাত্রই একজন সামনের দিকে ঝাঁপ দিল। পরে জানতে পারলাম এটি ক্যানিয়ন সুইং। এ ব্রিজে নরমালি হাঁটতেই ভয় করছে। বিভিন্ন নির্দেশকের মাধ্যমে দেখতে পেলাম পুরো রিসোর্টের কোন দিকে কী তা দেয়া আছে। প্রথমকাজ হিসেবে হাতের ডানপাশে রেজিস্ট্রেশন বুথে গেলাম। বাংলাদেশ সার্কভূক্ত দেশ হওয়ায় চড়া দামে রেজিস্ট্রেশন করতে হল। বাঞ্জি আর ক্যানিয়ন সুইং এর জন্য ১১২০০ রুপি আর এ দুটির ভিডিও আর টিশার্ট এর জন্য ৩৮০০ রুপি অর্থাৎ মোট ১৫০০০ নেপালি রুপি গুনতে হলো। ১০০ রুপি ফেরতযোগ্যভাবে লকার নিতে হয়। ইংরেজি আর হিন্দি ভাষায় ব্রিফিং শুরু হলো তার আগে ওয়েলকাম জুস দেয়া হলো। ওজন মেপে সবার হাতে সংখ্যাটা বসিয়ে ৩টি ভাগ করা হলো। ৪০-৬০, ৬০-৮০ ও ৮০-১০০। আমার অবস্থান দ্বিতীয় দলে। 

প্রথম গ্রুপকে ডাকা হলো। আমি দ্বিতীয় গ্রুপ হলেও ক্যানিয়ন সুইং মারার জন্য সবার আগে ডাক পেলাম। হায় একি! ভাবলাম কয়েকটা দেখলে সাহস হবে তারপর দেবো। কিন্তু কী আর করা। সেফটি হার্নেস বেঁধে আমাকে প্রস্তুত করা হলো। ইতিমধ্যে প্রথম গ্রুপের একজন বাঞ্জি দিতে প্রস্তুত হওয়ায় তাকে সামনে নিয়ে গেল। সব প্রস্তুত। ৩, ২, ১- জাম্প! কিন্তু না, সে খিঁচ মেরে দাঁড়িয়ে আছে। আরো পাঁচ সেকেন্ড ভেবে দেখে যে জাম্প দেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাই সাহস করে দিয়ে দিল লাফ। বাহ সুন্দর! সহজ ভেবে সামনে গেলাম। ভিডিও বার্তায় দেশবাসীসহ ফ্রেন্ডদের সাথে আনন্দের মুহূর্ত শেয়ার করলাম। ফাইনাল স্পটে গিয়ে দম যায় যায় অবস্থা! কিন্তু পাশে ক্যামেরা অন আছে। তাই ঠিক করে নিলাম, যাই ঘটুক লাফ দিতে হবে হাসিমুখে। ৩, ২, ১- দম নিলাম। দিয়ে দিলাম জাম্প। কি হচ্ছে কয়েক সেকেন্ড বুঝতে পারছিলাম না। শুধু এটুকুই মনে আসছিল হায়! একি করলাম। নিজেকে এভাবে শেষ করে দিলাম! তবে ঠিক আছি বুঝতে পারলাম। সম্ভিত ফিরে ফেলাম। ক্যামেরা তাক করে রেখেছে দেখে একটু ভাবও নিলাম। হাতের গ্রোপ্রো ক্যামেরায় পোজ দিয়ে নানা কথা বলতে থাকলাম আর দোল খাচ্ছিলাম। পরে পদ্ধতি মমেনে একটি রশি টেনে নিরাপদ স্থানে গিয়ে বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করলাম। এবার আরেক বিপদ! এত নীচ থেকে ওপরের ব্রিজে উঠতে ৪০ মিনিটের মত লাগবে। আবার ট্র্যাকিং শুরু। 


 
এবার গ্রুপ ২ এর সাথে বাঞ্জি দিতে লাইন দিলাম। এবার সবার শেষে। নিজেকে প্রস্তুত করলাম। একটি দিয়ে ফেলায় বাঞ্জি দিতে ব্যাপক সাহস পুঞ্জীভূত আছে। এখন চিন্তা কতটা সুন্দরভাবে দেয়া যায়। সময় এসে গেল। সাহস আছে, কিন্তু লাফ দেয়ার মোমেন্টটা ব্যাপক কষ্টের। একটু স্টাইলিশভাবে দিয়ে দিলাম। চমৎকার অনুভূতি। সুপারম্যানের মত দিতে পারায় সন্তুষ্টি ছিল মনে। মাথা নিচু করে ওপরে পা দিয়ে ঝুলছি। ইশারায় বেল্ট খুলে দিলাম। মাথা ওপরে উঠে গেল। ১৬০ মিটার নিচ থেকে মেশিনের সাহায্যে এবার ব্রিজে উঠিয়ে নিল। ওপরে উঠতেই নাইস জাম্প বলে কুশল বিনিময় করলো স্টাফরা। 

দুপুরে ব্যুফে লাঞ্চ শেষে আড্ডায় মশগুল। ইতিমধ্যে ভিডিওগুলো ব্রিফিং রুমে চলে এসেছে। একেক জনের ভয়ে মুখের ভঙ্গী দেখার মতো হয়েছিল। সাথে সাথে দেবার নিয়ম না থাকায় ই-মেইল অ্যাড্রেস দিয়ে দিলাম। ৩ দিন পর মেইলে পাঠিয়ে দিবে বলে আশ্বাস দিল। বাঞ্জি নেপাল থেকে দু’টো জাম্পের জন্য ২টি গেঞ্জি উপহার দিল। বেলা বয়ে বিকেল। ৪টা ৪৫ মিনিটে রওয়ানা হলাম কাঠমুন্ডুর উদ্দেশ্যে। 
গাড়িতেই সবার হাতে সাহসিকতার অ্যাচিভমেন্ট সনদ ধরিয়ে দিলো। নেপালি বন্ধু গৌরবের ফোন থেকে ইমরান ভাইয়ের সাথে দুইবার কথা বলে গন্তব্য ঠিক করে নিলাম। রাত ৯টায় বেজে গেল পৌঁছতে। 


 
কাঠমুন্ডু নেমেই গন্তব্য আল মদিনা হোটেল। সেখানে দেখা হল ‘ইয়ালা পিক’ জয়ীদের সাথে। বাংলাদেশের সুজন ও সাদিয়া মাহী ভাইয়ের নেতৃত্বে গিয়েছিল এ অভিযানে। হোটেলেই দেখা মিলল কায়সার সজীব, লিজন্ড ভাই ও মামুন ভাইয়ের সাথে। হালকাভাবে রাতের ডিনার খেয়ে থামেলে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটা শুরু। এদিকে টুটুল ভাই ব্যস্ত আসাদ ভাইয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষায়। রাতের থামেল অনেক সুন্দর। যাইহোক সকালেই বিদায় জানাতে হবে 'নামস্তে নেপালকে'। কিন্তু অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্পের দিনগুলো আর ১৬০ মিটার ওপর থেকে শূন্যে লাফানোর সাহসিকতার সনদ নিজেকে আরো বেশি সমৃদ্ধ করেছে। সত্যিই জীবন সুন্দর ও উপভোগ্য। 

মন্তব্য