kalerkantho


লাওস ভ্রমণ

'লুয়াং প্রেবাং' বিলীয়মান নান্দনিক ইতিহাস

পর্ব : নন্দনকানন

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৫:২০



'লুয়াং প্রেবাং' বিলীয়মান নান্দনিক ইতিহাস

‘ভোরের দিকে এলেম, যেখানে মিঠে শীত সেই পাহাড়ের খাদে;
সেখানে বরফ-সীমার নীচেটা ভিজে-ভিজে, ঘন গাছ-গাছালির গন্ধ।
নদী চলেছে ছুটে, জলযন্ত্রের চাকা আঁধারকে মারছে চাপড়।
দিগন্তের গায়ে তিনটে গাছ দাঁড়িয়ে,
বুড়ো সাদা ঘোড়াটা মাঠ বেয়ে দৌড় দিয়েছে।’ -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (তীর্থযাত্রী)

বিমানবন্দর থেকে হোটেল। টালি আর কাঠের তৈরি। বাংলো ধরনের। বিকেলের আলো এসে পড়েছে চূড়ায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এর কথা মনে পড়ে। পাষাণ ইমারত। ভেতরে প্রবেশ করলেই বহু জন্মের প্রাচীন ইতিহাস ডালপালা মেলে চোখের সামনে এসে দাঁড়াবে। ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাকে নামিয়ে দিয়েই বলল, “শহরের সবচেয়ে নামী হোটেলগুলোর একটা। নাম ‘প্রিন্সেস ডেলা হোটেল’। আমাদের আগের রাজার মেয়ে এই হোটেলের মালিক। তার নামেই হোটেলের নাম!”
হয়তোবা ডাক নাম। আমি চমৎকৃত রাজার মেয়ের হোটেল শুনে! জিজ্ঞেস করলাম, ‘রাজা কই?’
নৈর্ব্যক্তিক বদনে সে বলল, ‘নির্বাসনে!’
লাওসের ইতিবৃত্ত থেকে জানা যায়, লাওসের এক রাজ্যচ্যুত শাসক পুত্র ফানাংকে নিয়ে কম্বোডিয়ার রাজা জয়বর্মণের (১৩২৭-৫৩ অব্দ) আশ্রয় গ্রহণ করেন। ফানাং বয়োপ্রাপ্ত হলে জয়বর্মণের কন্যার সাথে বিয়ে দেন এবং তাঁকে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি লাওসের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো একত্রিত করে রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ফানাং লাওসে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। লাওসে রাজা ফানাং ও তাঁর স্ত্রীর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত থেরবাদ বৌদ্ধধর্ম এখনো বিরাজ করছে।

দীর্ঘদিন থাইল্যান্ড ও তৎপরবর্তীতে ফ্রান্সের অধীনে থাকার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর লাওস স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং পৃথিবীর বুকে স্বাধীন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু ফরাসী উপনিবেশবাদের অপচ্ছায়া তাদেরকে ছাড়ে না। ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো ফরাসীরা লাওস আক্রমণ করে। লাওসের জনগণ পুনরায় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করে। ১৯৫৩ সনে ‘দিয়েন বিয়েন ফু’তে ভিয়েতনামীদের হাতে ফরাসিদের চূড়ান্ত পতনের পর জেনেভা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইন্দোচীনে স্থায়ী শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে। ভিয়েতনাম, লাওস এবং কম্বোডিয়া স্বাধীনতা অর্জন করে। এর বেশীদিন পরে নয়, ১৯৬৪ সালে পুনরায় আমেরিকানদের বিরুদ্ধে ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে লাওস।

লাওসের শেষ রাজার নাম সাভাং ভাথানা। ফরাসি উপনিবেশকে ধারণ করেন। রাজপরিবারেরই অপর সদস্য প্রিন্স সউফানোভং। তিনি ভিয়েতনামের কম্যুনিস্ট পার্টির সহায়তায় ‘প্যাটেট লাও’ নামে পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা করেন। শুরু হয় আমেরিকানদের বিশেষ যুদ্ধ। ইন্দোচীনের বিরুদ্ধে। নাম ‘গোপন যুদ্ধ’ (Secret war)।

কমিউনিস্টরা উত্তর-পূর্ব লাওসকে আমেরিকানদের বিরুদ্ধে আক্রমণের স্প্রিংবোর্ড হিশেবে ব্যবহার করা শুরু করে। লাওসের পূর্বাংশ জুড়ে বিশাল এলাকা ব্যবহৃত হয় দক্ষিণ ভিয়েতনাম এবং কম্বোডিয়াতে কমিউনিস্ট গেরিলাদের রসদ সামগ্রী সরবরাহের পথ হিসেবে। এটাই ইতিহাসের বিখ্যাত বা কুখ্যাত ‘হ চি মিন ট্রেইল’! বিনিময়ে আমেরিকান বিমান বাহিনী লাওসের ওপর দিয়ে বোমার বৃষ্টিপাত শুরু করে। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৩। এই দুই দশকের ভেতরে আমেরিকা লাওসের ভূমিতে ১,৮৯৮,২৬০ মেট্রিক টন বোমা ফেলে। ধারণা করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপ এবং প্রশান্ত মহাসাগর থিয়েটারে সম্মিলিতভাবে আমেরিকার নিক্ষেপ করা বোমার পরিমাণের চেয়ে এই পরিমাণ ছিল বেশি। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বোমা নিক্ষেপের ইতিহাস। লাওসের প্রতিটি ব্যক্তির বিপরীতে নিক্ষেপিত বোমার পরিমান ছিল দুই টন। এই বোমার প্রায় এক তৃতীয়াংশই অবিস্ফোরিত রয়ে যায়। ফলে লাওসের অনেক জায়গাই এখনো মনুষ্য বসবাসের বা গমনাগমনের অযোগ্য!

এর পরেও কমিউনিস্টরা বিজয়ী হয়! হয়তোবা এটাকেই বলে মানবতার বিজয়! ২৩ আগস্ট, ১৯৭৫ তারিখে প্যাথেট লাও ভিয়েনতিয়েন দখল করে। প্রিন্স সউফানোভং নিজেকে লাওসের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন। ১৯৭৭ সাল। রাজা সাভাং ভাথানা, রানী, দুই রাজপুত্র এবং আরও কয়েকজনকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অজ্ঞাত স্থানে নির্বাসনে প্রেরণ করা হয়। রাজপ্রাসাদকে পরিবর্তিত করা হয় জাদুঘরে। অতঃপর তাদের সম্পর্কে আর তেমন কিছুই জানা যায়নি। শুধুমাত্র ১৯৭৮ সালে সরকার কর্তৃক ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো যে, রাজা সাভাং ভাথানা, রানী এবং ক্রাউন প্রিন্স মারা গেছেন ম্যালেরিয়া রোগে। পৃথিবীর অনেক পরাক্রমশালী সম্রাট বা রাজাদেরই অন্তিম পরিণতির মতো। সম্রাট নেপোলিয়ন, মুঘল শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ এবং বর্তমান সময়েরও অনেকের মতো।

আমি হোটেলের রিসিপশনে দাঁড়িয়ে চেক ইন করছি। এমন সময়ে আমার ঠিক পিছন থেকে স্পষ্ট বাংলায় উচ্চারন, ‘দেশ থেকে কবে আসলেন?’

আমি ভীষণ অবাক। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি কালো শ্মশ্রুমণ্ডিত, ধবল ফর্সা বর্ণের মাঝ বয়সী একজন। আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছেন। নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, ‘দেশ থেকে নয়, কম্বোডিয়া থেকে এসেছি। ওখানে জাতিসংঘের হয়ে কাজ করছি। আপনি?’

ভদ্রলোক নিজ থেকেই পরিচয় দিলেন। নাম এন্ড্রু জ্যাকসন। ব্রিটিশ নাগরিক। এখানে ইউনিসেফের প্রধান। বললেন, ‘আমি অনেক বছর বাংলাদেশে ছিলাম। আপনাদের উড়ির চরে যে ফ্লাড এবং সাইক্লোন সেলটারগুলো করা হয়েছে, তার অনেকগুলোই আমার তত্ত্বাবধানে তৈরি করা হয়েছিল।’

একটু থামলেন। পরিষ্কার বাংলায় কথা বলছেন!আমি বিস্মিত। বললাম, ‘আপনি তো দেখি খুব সুন্দর বাংলায় কথা বলেন।’

তিনি আবারও শুরু করলেন, ‘আগে রীতিমতো গল্প করতে পারতাম। এখানে অনেক বছর কোনো বাঙ্গালির সাথে দেখা হয়নি। তাই ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছি। কদিন থাকবেন আপনি এখানে?’

আমি তিন-চারদিন থাকব জানাতেই তিনি প্রস্তাব দিলেন, ‘আমার স্ত্রী এবং সন্তানেরা দেশে (লন্ডনে) বেড়াতে গেছে। ফিরবে এক মাস পর। আপনার হোটেলে থাকার দরকার কি? আপনি বরং আমার সাথে আমার বাংলোয় চলেন। অনেকদিন পর মন খুলে বাংলায় কথা বলব আপনার সাথে।’

আমি আপ্লুত। বিনীতভাবে তাকে বললাম, ‘আমি আপাতত এখানেই উঠতে চাচ্ছি। পরে আপনার বাসায় যাব।’

তিনি বললেন, ‘সন্ধার পর আমি আসব আপনাকে নিতে। রাতে ডিনার করবেন আমার সাথে।’

আমি বুঝতে পারি, প্রকৃতপক্ষে তার ভেতরে কাজ করছে বাংলায় কথা বলার আকুলতা। জীবনানন্দ দাশের ওপরে পৃথিবী বিখ্যাত গবেষক ক্লিন্টন বি সিলির নাম মনে পড়ে গেল। অথবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কবি ওকামপো ওরফে ‘বিজয়া’। দূরত্ব অনেক সময়ে কোনো ফ্যাক্টরই নয়। আমি রাজী হয়ে গেলাম।

সারা বিকেল ঘুরে বেড়ালাম পায়ে হেঁটে হেঁটে। একা একা। রাস্তার পাশেই একটু পর পর দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ মন্দির বা প্যাগোডা। উঁচুনিচু আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ। ছোট ছোট পাহাড়। গাঢ় সবুজে ঢাকা। পাহাড়ের পাদদেশে বয়ে চলেছে ঝর্ণা অথবা খাল। স্বচ্ছ জলের নিচে নুড়ি পাথর বিছানো। পাড়ের ওপরে টঙের মাচান। মাচানের ওপরে স্থাপন করা হয়েছে খাবারের রেস্টুরেন্ট অথবা আবাসিক হোটেল। নামকিন নদীর জলের ওপরে বাঁশের তৈরি সাঁকো। দুই দুই করে শিশু বা কিশোর বৌদ্ধ মঙ্করা পার হয়ে যাচ্ছে। কোথাও পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যাচ্ছে শিশু মঙ্করা। যেনবা স্বর্গের সিঁড়ি বেঁয়ে! বিকেলের অনির্বচনীয় আলোতে লুয়াং প্রেবাংকে আমার নিকটে মনে হয় তীর্থস্থান। পৃথিবীতে এতো হানাহানি আর ধ্বংসযজ্ঞের পরেও!

“মাটি-পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি,
না এলেই ভালো হত অনুভব করে;
এসে যে গভীরতর লাভ হল সে সব বুঝেছি
শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে”। - জীবনানন্দ দাশ

(মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা)



মন্তব্য