kalerkantho


গাজী-কালু-চম্পাবতীর মাজার: ভক্তরা বেঁধে আসে ‘আশা পূরণের পলিথিন’!

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

১৯ আগস্ট, ২০১৮ ১৭:৫২



গাজী-কালু-চম্পাবতীর মাজার: ভক্তরা বেঁধে আসে ‘আশা পূরণের পলিথিন’!

মাজারের পাশের বটবৃক্ষ যেখানে ভক্তরা বেঁধে আসে আশা পূরণের বন্ধন

গাজী কালু চম্পাবতীর মাজারের গা ঘেঁষে ৬টি ছোটবড় বটবৃক্ষ। প্রত্যেকটির গোড়া শান দিয়ে ঘেরা!

গাছ থেকে ঝুলে আছে ঝুরি। আর সেই ঝুরিতে, ডালে এবং পাশের আরও দুটি ভিন্ন বৃক্ষে শোভা পাচ্ছে নীল, সাদা, লাল, খয়েরি বা কালো নানা রঙের চিকন চিকন পলিথিন- সুতোর মতো করে গাঁথা। 

মনোকামনা পূরণে একধরনের বিশ্বাসী মানুষ এগুলো বেঁধে রাখেন! তবে দেশ-বিদেশের অন্যসব মাজার বা স্মৃতিস্তম্ভে দেখা যায় মানতকারী লোকজন সুতো বাঁধে- আর এখানে পলিথিন দিয়ে সুতোর মতো করে বাঁধা হয়েছে। পলিথিন সুতোর চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বলে-ই এই ব্যবস্থা কি না- কে জানে! 

মাজারের পাশে বসে থাকা দুজন বললেন, মানুষজন নানা মানত করে এগুলো বেঁধে রাখেন। তাদের ধারণা, এই মাজারের বদৌলতে তাদের কামনা বাসনা পূরণ হবে।

তবে মনের আশা পূরণের এই পলিথিন তাদের জীবনে কোনও পরিবর্তন এনেছে কি না জানতে পারিনি!

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারের পূর্বপাশে সামান্য একটু দূরে গাজী কালু-চম্পাবতীর মাজার অবস্থিত।

গাজী কালু ও চম্পাবতীর পরিচয় নিয়ে আছে নানা কিংবদন্তী। জনশ্রুতি আছে, তৎকালীন বিরাটনগরের শাসক দরবেশ শাহ্ সিকান্দারের ছেলে গাজী, আর কালু হচ্ছেন সিকান্দারের পোষ্য ছেলে। 

কালু তার পালক পিতার সন্তান গাজীকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং সর্বত্র তার সঙ্গী হতেন। 

মাজারের ভেতরের দৃশ্য

একদিন গাজীর সঙ্গে ছাপাইনগরের সামন্ত রাজা রামচন্দ্র ওরফে মুকুট রাজার কন্যা চম্পাবতীর দেখা হয়। চম্পাকে দেখে গাজী আর চম্পাবতীও গাজীকে দেখে ভুলে গিয়েছিলেন স্থান-কাল-পাত্র ও বাস্তবতা। চম্পাবতী ভুলে যান তিনি হিন্দু রাজার মেয়ে আর গাজীও ভুলে যান তিনি মুসলমান শাসকের পুত্র। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। স্বাভাবিক নিয়মে তাদের মিলনের মাঝে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায় সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা। মুকুট রাজা তার সেনাপতিদের হুকুম দেন, গাজী ও কালুকে শায়েস্তা করতে।

যুদ্ধে মুকুট রায়ের সেনাপতি দক্ষিণা রায় পরাজিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে গাজীর অনুসারী হন। গাজী-কালু ও চম্পাবতীর মাজারের সাথে দক্ষিণা রায়ের মাজারও আছে। 

মুকুট রাজা ঝিনাইদহ, কোটচাঁদপুর, বারোবাজারের পূর্ব এলাকা ও বেনাপোল অঞ্চলের সামন্ত রাজা ছিলেন। অন্যত্র তিনি রামচন্দ্র বা শ্রীরাম নামেও পরিচিত। এই রাজার চারটি বাড়ি ছিল- ঝিনাইদহের বাড়িবাথান, বারোবাজারের ছাপাইনগর (বর্তমানে বাদুরগাছা), কোটচাঁদপুরের জয়দিয়া বাঁওড়ের বলরামনগর ও বেনাপোলের কাগজপুকুরে।

গাজীর অনুসারী বাহিনীর কাছে মুকুট রাজা বা রাজা রামচন্দ্র পরাজিত হয়ে চম্পাবতীকে নিয়ে তার প্রধান বাড়ি ঝিনাইদহের বাড়িবাথানে চলে যান। গাজীও তাকে অনুসরণ করেন। ঝিনাইদহে গিয়ে গাজী, রাজার সেনাপতি গয়েশ রায়ের প্রমোদ ভবন জালিবল্লা পুকুরের পাড়ে বদমতলীতে ছাউনি ফেলেন। এখানেও ‘গাজীর মাজার’ দেখতে পাওয়া যায়। 

এরপর রাজা চলে যান জয়দিয়া বাঁওড়ের বাড়িতে। এ বাড়ির অবস্থান দেখলে মনে হয়, রাজা অত্যন্ত সৌখিন ছিলেন। জয়দিয়ার বাঁওড় একসময় ভৈরব নদের অংশ ছিল। বাঁওড়ের পূর্বপাড়ে ছিল রাজার বাড়ি। বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার পূর্বে বলহর বাঁওড় যা এক সময়ে কপোতাক্ষ নদের অংশ ছিল। দুই বাঁওড় তথা দুই নদীর মধ্যস্থলে অবস্থিত এই রাজবাড়ির গুরুত্ব অপরিসীম। দক্ষিণ পাশে বাঁওড়ের কূল ঘেঁষে তমাল গাছের নিচে আজও গাজীর দরগা বিদ্যমান। হয়তো প্রেমের টানে গাজী এখানেও ছুটে গিয়েছিলেন সঙ্গী কালুকে নিয়ে। 

অবশেষে গাজী অনুসারীদের নিয়ে বহু খণ্ড যুদ্ধের পর রাজা রামচন্দ্রের কাছ থেকে চম্পাবতীকে উদ্ধার করে বারোবাজার ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু গাজীর বাবা শাহ্ সিকান্দার বিষয়টা মেনে নেননি। মুকুট রাজা শাহ্ সিকান্দারের প্রতিবেশী। হিন্দু সমাজের অসন্তুষ্টির কারণে তিনি গাজীকে বাড়িতে উঠতে দেননি। 

গাজী-কালু-চম্পাবতী আখ্যান বিষয়ে জেলা প্রশাসনের স্থাপিত শিলালিপি     ছবি: তৌহিদ জামান

বাধ্য গয়ে গাজী দরবেশ বেশে চম্পাবতীকে নিয়ে বাদাবনের (সুন্দরবন) পথ ধরেন। সঙ্গী হন কালু ও দক্ষিণা রায়। বাদাবন বেশি দূরে ছিল না। নাভরণ , বেনাপোল, সাতক্ষীরা, বনগাঁ  তখন বাদাবন অঞ্চল ছিল। অসীম সাহসী গাজী আস্তানা গড়েন সেখানে। গরীব কাঠুরিয়ারা তার ভক্ত হয়। তার গুণপনা সম্পর্কে ভক্তদের মাধ্যমে নানান গল্পকথা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। 

গাজী কালু ও চম্পাবতীর মাজারে হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষ মানত করে। শ্রীরাম রাজার বেড় দীঘির দক্ষিণ পাশে ৩টি পাশাপাশি কবরের অবস্থান। মাঝখানে বড় কবরটি গাজীর, পশ্চিমেরটি কালুর এবং পূর্বের ছোট কবরটি চম্পবতীর বলে পরিচিত।

মাজার সন্নিহিত দক্ষিণ-পশ্চিমে একটি প্রাচীন বটগাছ আছে। এই বটগাছের তলদেশে একটি শূণ্যস্থান দেখা যায়। এটিকে অনেকে প্রাচীন কূপ কিংবা অন্য কোনও কবর বলে মনে করেন। 

১৯৯২ সালে ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসন কবর তিনটি বাঁধাই করে বেষ্টনি প্রাচীর নির্মাণ ও খাদেমদের থাকার জন্য সেমিপাকা টিনশেড তৈরি করে দেয়।

তবে বাংলাদেশের শহর-গ্রামে ব্যাপকভাবে প্রচলিত গাজী-কালু-চম্পাবতীর গল্প-কাহিনীর সত্যাসত্য নিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে নিয়ে বিশেষজ্ঞ-ইতিহাসবিদদের অনেক মতভেদ আছে।

এ প্রসঙ্গে ২০১৪ সালের ০২ জুন ঝিনাইদহের তৎকালীন জেলা প্রশাসক শফিকুল ইসলাম স্থাপিত একটি শিলালিপিতে উল্লেখ করা কিছু কথা এখানে হুবহু তুলে দেওয়া হলো- গাজী-কালু-চম্পাবতীর বিষয়ে যেসব বিবরণ পাওয়া যায় তা সবই ঐতিহাসিক উপাখ্যান এবং গাজীর গীত, উপন্যাস, পুঁথি সাহিত্য, কিংবদন্তী, জনশ্রুতি বা স্থানীয় প্রবাদ সর্বস্ব। সুতরাং গাজীর ঐতিহাসিক সত্যতা সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করা দুরূহ ব্যাপার। তবে সিলেট থেকে সুন্দরবন হয়ে গাজী নামে যে আধ্যাত্মিক সাধক বারোবাজার বা ছাপাইনগরে এসে হাজির হন তিনি বহু বৌদ্ধ ও হিন্দুকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেন। যশোর জেলায় তার আগমনকাল নিশ্চিত করে বলা না গেলেও এতটুকু বলা যায় যে, গাজী, কালু, চম্পাবতী কিংবদন্তী কিংবা বাস্তবতায় তারা বারোবাজার থেকেই সর্বপ্রথম ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছিলেন গোটা দক্ষিণ বাংলায়।

(সাংবাদিক তৌহিদ জামানের ফেসবুক পোস্ট থেকে)



মন্তব্য