kalerkantho


লেগেছে ঘুড়িতে হাওয়া, তবুও আকাশ ফাঁকা

রফিকুল ইসলাম, কুয়াকাটা থেকে    

৩ মার্চ, ২০১৮ ২২:২০



লেগেছে ঘুড়িতে হাওয়া, তবুও আকাশ ফাঁকা

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার অপেক্ষায় থাকতাম। মাদুর বিছিয়ে গড়িয়ে নেওয়া মায়ের ভাতঘুম তখনও চোখ ছাড়ত না ভাল করে। অপরদের চোঁখ ফাকি দিয়ে খাটের তলা থেকে ঘুড়ির গোছা আর লাটাই বার করে নিয়েই খোলা মাঠে। শরতের আকাশ তখন আর নীল-সাদার চাঁদোয়া নয়, রীতিমতো রঙিন যুদ্ধক্ষেত্র! লাল-নীল-সবুজ-কালো ঘুড়ির মেলায় বোঝা মুশকিল আকাশের আসল রং। প্রতিদিনই ছদ্ম-শাসনের আবহেই লাটাই ধরতেন একান্তবর্ত্তী পরিবারের বড় সদস্যরা। শিখিয়ে দিতেন, ঘুড়ি কাটার গোপন মারপ্যাঁচ। গতকাল শুক্রবার সমুদ্র সৈকতে আয়োজিত ঘুড়ি উৎসব দেখে এ কথাগুলো বলতে বলতে স্মৃতির ঝাঁকে বারবার হারিয়ে যাচ্ছিলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী। 

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি)’র প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, খুব বেশি বছর আগের কথা নয়, বড় জোর দেড় কুড়ি। তখনো একই পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু রীতিমতো বদলে গিয়েছে শরৎ বিকেলের আকাশ। তবে কালেভাদ্রে উৎসবকে ঘিড়ে ঘুড়ি চোখে পড়ে। এখন আর গ্রামের মাঠে কিংবা শহুরে জীবনে ছাদে আর দাপিয়ে বেড়ায় না কিশোরের দল। দূর থেকে ভেসে আসে না ‘ভো-কাট্টা’-র সুরেলা উচ্ছ্বাস। 

পবিপ্রবি’র প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর মতে, মাঠে কিংবা ছাদের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত বাঁধা পড়ে না মাঞ্জা লাগানো সুতোয়। তার উপলবদ্ধি, শহরে মায়েদের সতর্ক দৃষ্টি এখন আর ছাদের কার্নিশে নয়, সন্তানের হাতের মোবাইলে। মুঠোফোনে নীল তিমি লুকিয়ে নেই তো! নোশার মরণ ব্যাধি সন্তানকে গ্রাস করেনি তো! মুঠোফোনে নেই সেই মরনব্যাধী ডিভিও। যেটা আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিবে তার কোমলমতি সন্তানদের।

তবে সৈকতে ঘুড়ি উৎসবের আয়োজক ‘ছুটি ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেল’র সমন্বয়কারী আরিফুর রহমান বলছেন, আশার কথা। তার মতে, বঙ্গোপসাগরের ১৮ কিলোমিটার জুড়ে কুয়াকাটা সৈকত। ছুটির দিনে এখানে সকল শ্রেণির পেশার মানুষ পরিবার নিয়ে একটু ভাল সময় কাটানের জন্য আসেন। ঘুড়ি উৎসব দেখে প্রবীণরাও কিশোর জীবনের স্মৃতিতে ফিরে যাবেন। গল্প শোনাবেন অভিষ্যত প্রজন্মকে। যাতে করে নতুন প্রজন্ম আধুনিকতার পাশাপাশি গ্রামের এই সংস্কৃতিকে মননে ধারণ করেন। তার বিশ্বাস একদিন তরুণ প্রজন্ম মাদককে লাল কার্ড দেখাবেন।    

তাই এত সহজে হাল ছাড়তে রাজি নন আরিফুর রহমান। বলছিলেন, ‘সময় বদলাবে, বাচ্চাদের পছন্দও বদলাবে। যখন প্রথম ভিডিও গেম বাজারে এসেছিল, তখনও এক ধাক্কায় বেশ ফাঁকা হয়েছিল ঘুড়ির আকাশ। কিন্তু এখনকার মতো এতটা নয়।’ তাই বাচ্চাদের মধ্যে ঘুড়ির চাহিদা কমে গেলেও, পিছু হটছেন না এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যবসায়ীরা। বরং তাঁরা নিত্য নতুন ভাবে পথ খুঁজছেন তারা। সময়ে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘুড়িতেও এনেছেন প্রকৃতির আবহে। 

আর এই ধারণা থেকেই ঘুড়ির চৌখুপি ছাঁদ (ধরণ) ভেঙে ফেলেছেন। পেটকাটি-মোমবাতি-বগ্গা-চাঁদিয়ালের জায়গা নিয়ে নিচ্ছে, সুপারম্যান-ব্যাটম্যান-ছোটা ভীম-পিকাচু-ডোরেমনের দল। প্যাচা, বাদুর, গাঙচিল, প্রজাপতির সঙ্গে বর্নমালাও জায়গা হয়েছে কয়েক বছর ধরে। পাশাপাশি নানা রকম ছবিতে, আকারে, আকৃতিতে, মাপে বদলে যাচ্ছে ঘুড়ির পরিচিত চেহারা। কোনও ঘুড়ি এরোপ্লেনের মতো দেখতে, কোনওটা বা মিকি মাউস। অভিনবত্বের দৌড় সীমাবদ্ধ নেই শুধু ল্যাজের বাহারে।

পবিপ্রবির বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন এন্ড ম্যানেজমেন্ট অনুষদের ডিন অধ্যাপক বদিউজ্জামান পরিবার নিয়ে শুক্রবার সৈকতে ঘুড়ি উৎসব উপভোগ করছিলেন। বলছিলেন, ‘ছোটবেলায় হাঁ করে অপেক্ষা শুরু হতো বর্ষার পর থেকেই। বাবার মানিব্যাগ থেকে খুচরো পয়সা চুরি করতাম ঘুড়ি-লাটাই কেনার। অন্য পাড়ার ঘুড়ি কেটে নিজের ছাদে পড়লে মনে হতো সেই দিনের জন্য রাজা হয়ে গিয়েছি। এখন কই দেখি ঘুড়ি?’

অধ্যাপক বদিউজ্জামানের মেয়ে দুমকীর সৃজনী স্কুলে পড়ে। সে মোটেও ঘুড়ি ওড়ায় না। জিজ্ঞেস করতে অকপটেই বলল, ‘স্কুল-টিউশন খেলাধুলা...ফাঁকা বিকেল পাই কোথায়, যে ঘুড়ি ওড়াব? সময় পেলে কবিতা লিখি, মাঝে মধ্যে বাবা-মায়ের মোবাইলে গেম খেলি।’ স্কুল পড়ুয়া মেয়ের এমন মন্তব্য শুনে সৈকতের আশপাশের অনেকেরই আক্ষেপ, ‘ছাদ কই? সময়ই বা কই? এ বার আর আকাশে নয়, মোবাইলেই হয়তো উড়বে ঘুড়ি। নতুন গেম এলো বলে।’

কুয়াকাটা সৈকতের আবাসিক গোলপাতা হোটেলের মালিক মোস্তাফিজুর রহমান সুমান। প্রায় বছর দুয়েক আগে থাইল্যান্ড থেকে বেশ কয়েকটি ঘুড়ি পরিবারের জন্য এনেছিলেন। পরে ভাবলেন, এগুলো বিভিন্ন উৎসবে উড়িয়ে তরুণদের মাঝে বাঙ্গালি ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই প্রতিযোগিতার আয়োজনের কথা ভাবছেন। প্রতিযোগিতা শুধু ঘুড়ির মধ্যে নতুন চেহারা ফুটিয়ে তোলার। আর তা যতটা ব্যবসায়িক লাভের জন্য, তার চেয়ে বেশি ঘুড়ি-শিল্পকে টিকিয়ে রাখার। শৈশব-কৈশোরে ঘুড়ির স্মৃতি হারিয়ে যেতে না দেওয়ার লড়াই চলবে জোরদার। 



মন্তব্য