kalerkantho


বাইকে চেপে ঢাকা থেকে কেওকারাডং এর চূড়ায়!

সাকিব সিকান্দার   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১৩:৫৮



বাইকে চেপে ঢাকা থেকে কেওকারাডং এর চূড়ায়!

প্রথম বাইকার গ্রুপ হিসেবে কেওকারাডং জয় করলেন তারা, সবার একটি করে বাইক আর বুকে অদম্য সাহ

বাইক আর বাইকের গতি একটা নেশার মতো। এ নেশায় আচ্ছন্ন হন অনেকেই। ছোটবেলা থেকেই অনেকের ঘাড়ে বাইকের ভূত চাপে। সে ভূত সহসা বিদায় নেয় না। ইদানিং দেশে বেশ কিছু বাইকার গ্রুপ গড়ে উঠেছে। তারা দল বেঁধে মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তা দাপিয়ে বেড়ান। দেশের আনাচে-কানাচে অভিযান চালান। তেমনই একটি গ্রুপ দুর্দান্ত এক অভিযানে বেরিয়ে পড়ল। গন্তব্য দেশের সুউচ্চ শৃঙ্গ কেওকারাডং। আকাশের দিকে বেয়ে ওঠা পাথুরে রাস্তায় ধুলো ওড়াতে ছুটল অদম্য অভিযাত্রীরা। 

সেই দলের এক সদস্য নাভীদ ইশতিয়াক তরু। তার কাছ থেকে অভিজ্ঞতার বয়ান শুনতে চাইলাম। বললেন, বাইক নিয়ে মাতামাতি অনেক আগে থেকেই। বড় হওয়ার পর আর তর সইলো না। বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। একটা সময় থেকে বাংলাদেশের রাস্তায় রাস্তায় সময় কাটতে থাকলো। বাইকপ্রেমের নিদর্শন স্বরুপ রাস্তাগুলোতে চাকার দাগ ফেলানোটাই লক্ষ্য হয়ে উঠল। আর আজ তা বাস্তবে। ইতিমধ্যে আমরা বাংলাদেশের অনেকগুলো জেলায় ঘুরে বেড়িয়েছি। আমাদের মধ্যে কারো কারো ৬৪ জেলায় বাইকের চাকা ঘুরেছে। যাইহোক গল্পে আসি। 

আরো পড়ুন: এবার 'সাদা তেলের' সন্ধানে সৌদি আরব 

 

আমরা ৯ জন বাইকার প্ল্যান করি, আমাদের এক প্রবাসী বন্ধু আলী আশরাফ খান হিরো ভাইকে নিয়ে বান্দরবন ডিম পাহাড়ে যাবো। প্ল্যানমতো ৩১ জানুয়ারি বুধবার আমরা ৮ জন বাইকার রওনা দিলাম। দলে আমি আর হিরো ভাই ছাড়াও আছেন এমআরকে মামুন, মেহেদি হাসান জুয়েল, কাওসার খান, এবি ইশতিয়াক, মোহাম্মদ ওয়ালি আর রফিকুল ইসলাম। কক্সবাজারের উদ্দেশে নিয়ে রওনা দিলাম। যাত্রা শুরুর আগেই হিরো আর মামুন ভাইয়ের নির্দেশে এবং সবার মতামতের ভিত্তিতে আমাকে টিম লিডার বানানো হলো। সার্বিক ব্যাবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবেন ইশতিয়াক ভাই। ঝাঁপিয়ে পড়লাম অভিযানে। শুরু হয় যুদ্ধ! রাস্তার ঘন কুয়াশার সাথে যুদ্ধ করে অবশেষে আমরা কক্সবাজারে পৌঁছাই। হোটেলে উঠেই চলে গেলাম সমুদ্রস্নানে।  

পরদিন ২ ফেব্রুয়ারি  শুক্রবার সকালে ডিম পাহাড় যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ঠিক তখন হাজির হলো সাখাওয়াত হোসেন রাকিব। পাগলাটে পরিকল্পনা নিয়ে সে সারারাত বাইক রাইড করে আমাদের কাছে হাজির! ওকে নিয়ে সবাই নাস্তা করে ডিম পাহাড়ের দিকে রওনা দিলাম। অনেক আঁকা-বাঁকা রাস্তা পাড়ি দিয়ে পৌঁনো গেলো ডিম পাহাড়ে। ডিম পাহাড়ের ডিমের আকৃতি দেখে আর দেরি নয়। চলে গেলাম থানচি। পরদিন ৩ ফেব্রুয়ারি শনিবার জুয়েল ভাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার দেখভালে থেকে গেলেন কাওসার আর ওয়ালি। 

রইলো বাকি ছয়। এর পর চা খেতে খেতে একজন পেটের জমানো কথা প্রকাশ করলো। সে বগা লেকে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল। সাথে সাথে সবাই একপায়ে খাড়া। ওকে ডান, অপারেশন বগা শুরু। ডিম পাহাড়ে ইতিমধ্যে আমাদের অনেকবার  যাওয়ার অভিজ্ঞতা থাকায় কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হয়নি। কিন্তু বগা লেক পুরোটাই অচেনা অজানা। তবুও শুরু করলাম। ওয়াই জংশন থেকে বগার উদ্দেশে ঘুরতে শুরু করল বাইকের চাকা।

তারপর ছয় জন বাইকার ধুলো আর ধোঁয়া উড়িয়ে পাহাড়ি পথে এগোতে থাকলাম, পৌঁছলাম রুমায়। সেখানে আর্মির ও পুলিশের অনুমতি নিয়ে এগোতে থাকলাম। সঙ্গ দিলেন অভিজ্ঞ গাইড সুমন দত্ত। সোজা চলে গেলাম কমলা বাজার। রাস্তার নির্মাণ কাজ চলছিল। পুরো রাস্তাজুড়ে গোল গোল পাথর।  বাইকের চাকা কোনভাবেই সোজা রাখা দারুণ মুস্কিল। অনেক কষ্ট করে গেলাম কমলা বাজারে। এরপর আসল বিপদ! 

 

শুরু হল বগা যাওয়ার আসল রাস্তা। সবাই বাইক থামিয়ে সোজা আকাশের দিকে উঠে যাওয়ার রাস্তার দিকে তাকালাম। গলা শুকিয়ে এলো। আমাদের সূর্যমামা তখন মাথার বরাবর আলো ফেলে যেন আমাদের ভয়াতুর মুখটা দেখার চেষ্টা করছিল। তাকালাম নিজেদের পায়ের দিকে। চোখ বন্ধ করে কোনো অজানা শক্তি দেহ-মনে আনার চেষ্টা করলাম। সবাই বাইক স্টার্ট করে দিলাম। শুরু হলো খেলা। প্রায় ১ ফুট ধুলা জমে থাকা রাস্তায় অচিন নেশায় ভুম ভুম করে ছুটে চলছি ওপরের দিকে। যখনই বিপজ্জনক মনে হয়েছে, আস্তে করে বাইক গিয়ারে রেখে ইঞ্জিন অফ করে আস্তে আস্তে ছেড়ে দিয়েছি। পাগলামি ছিল,  কিন্তু হুঁশও ছিল। কোনো এক আদিম নেশায় ছুটছিলাম। দূর্ঘটনা ছাড়াই আমরা পৌঁছে যাই বগায়। ধুলোয় ধুলোয় আমাদের বরণ করে নেয় বগা লেক। বগা লেকের শীতল পানি যেন আদর করে গালে শীতল ছোঁয়া দিয়ে আদর করে দিলো। আমরা শান্ত হলাম। চোখের পাশে জমে থাকা ঘাম সরিয়ে আমাদের ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি দেখা দিল। জ্বী, আমরা বগা বিজয় করেছি। অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে যুক্ত হলো ভয়ানক বগার রাস্তা বিজয়।

বগার ভয়ানক রোড পাড়ি দেওয়ার পর আমরা আরো সাহসী হয়ে উঠলাম। গাইড সুমন ভাইয়ের দিকে চেয়ে আমরা বললাম, ভাই যেকোনো মূল্যেই আমরা কেওককারাডং-এ যেতে চাই। সুমন ভাই আমাদের চোখে মুখে দিকে তাকিয়ে একটু ভেবে বললেন, আপনাদের যে অদম্য সাহস এবং রাইডিং দক্ষাতা, আপনারা পারবেন। অনেক ভাল চালিয়েছেন আপনারা। ভয় পাবেন না। 

পরদিন ৪ তারিখ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠলাম। চা-নাস্তাপর্ব সেরে আবার যাত্রা শুরু। কেওকারাডং এর দিকে। একটুখানি রাস্তা এগোনোর পরই আমরা একবারেই থ। কারণ রাস্তা এত চড়াই যে দিশেহারা বোধ করলাম। যারা হাতে লাঠি নিয়ে পায়ে হেঁটে উঠছেন, তাদের অবস্থাই খারাপ। যাইহোক, আমাদের থামার কোনো লক্ষণ নেই। আমরা কোনভাবে কষ্ট করে সবাই কম বেশি একটু আধটু হোঁচট খেয়ে কেওকারাডং এর ওপর চলে এলাম। প্রচণ্ড খুদা পেটে। উঠেই পেট ভরে ভাত খেলাম। তার পর গেলাম সেনাবাহিনীর অনুমতি নিতে। শেষ পর্যন্ত পৌঁছলাম কেওকারাডং এর চূড়ায়। বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয় যে, এত ভয়ানক রাস্তা পেরোতে পেরেছি আমরা।  

আরো পড়ুন: মাত্র ১০ টাকায় ঢাকার বুকে আনন্দময় নৌভ্রমণ

ফটোসেশন করে আবার শুরু করি সরাসরি ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা। ভেবেছিলাম আমাদের নামতে অনেক কষ্ট হবে, কিন্তু না। আমরা প্রতিটা রাইডারই ছিলাম যথেষ্ট সাহসী। তাই নামতে আমাদের কোন বেগ পেতে হয়নি। অনেক অনেক অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা ৫ ফেব্রুয়ারি ভোর ৬টায় ঢাকা পৌঁছাই।

বাংলাদেশে টুরিস্ট বাইকার হিসেবে আমরাই প্রথম কেওকারাডং এর চূড়ায় উঠলাম। এ আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করে বোঝানো সম্ভব নয়। এই বিজয় আমাদের একার নয়, সকল বাইকারদের। জয় হোক সকল বাইকারের! 


মন্তব্য