kalerkantho


অবিস্মরণীয় সেই সেন্ট মার্টিন্স যাত্রা

জিকরুল আহ্সান শাওন   

১ মার্চ, ২০১৭ ২১:৫৬



অবিস্মরণীয় সেই সেন্ট মার্টিন্স যাত্রা

১৯৭৯ সালে আমাদের বাসায় প্রথম টেলিভিশন আনা হয়। ব্লাক অ্যান্ড হোয়াইট। সে কি উৎসাহ। মুগ্ধ হয়ে টিভি দেখতাম। তখন ছোটদের জন্যে বিকাল আর সন্ধ্যায় টিভি দেখার অনুমতি আছে। সেসময় ক্যাসপার, সেজান, বার্ডম্যানের মতো বিভিন্ন কার্টুনসহ সুইস ফ্যামিলি রবিনসন আর টারজানের মতো অ্যাডভেঞ্চার সিরিজগুলোও দেখার সুযোগ ছিল। তখন থেকেই অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি এক ধরনের আগ্রহ কাজ করতো। কিন্তু কখনো ভাবিনি যে অ্যাডভেঞ্চারের নেশা এমনভাবে পেয়ে বসবে।

আমি যতই আরামদায়ক ট্যুর দিতে যাই না কেন, তা কেন যেন কোনো না কোনোভাবে অ্যাডভেঞ্চারে পরিণত হয়। আজব একটা বিষয়!

আমরা যখন ট্যুর করা শুরু করি (৯০এর দশকে) তখন এখনকার মতো দেশের খুব বেশি মানুষ ট্যুর করতো না। আমরা বেসিক্যলি নিজেরা নিজেরাই ট্যুর করতে পছন্দ করি।

এখন প্রচুর মানুষ ঘুড়তে বের হয়। তাই গত কয়েক বছর ধরে আমরা বর্ষাকে আমাদের মূল ট্যুরের সিজন হিসেবে বেছে নিয়েছি।

রুদ্রসমুদ্রে স্বাসরুদ্ধকর যাত্রা শেষে দ্বীপে পৌঁছে সহযাত্রী ছোটবোনদের হাসি-উল্লাস

গত বছরের মতো এবারো ইচ্ছা ছিল সেন্ট মার্টিনস্ আইল্যান্ডে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজবো। সে সূত্রে গত বছরে সেন্ট মার্টিন্সে ট্যুরে গিয়ে কখনো না ভোলার মতো কিছু শিহরণ জাগানো রোমাঞ্চকর অনুভূতির মালিক বনে গেলাম।

গিয়েছি বৃষ্টিতে ভিজতে। অথচ প্রথম দু'দিন বৃষ্টির দেখাই নেই। চলে আসার দিন সকালে শুরু হল বৃষ্টি। দৌড়ে চলে আসলাম বিচে। হায় আল্লাহ!

সামনে বি...শা...ল  দিগন্ত...
যত দূ..র চোখ যায় বৃষ্টি আর বৃষ্টি...
শুধুই বৃষ্টি...
ধূসর বৃষ্টি।

সেই বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন মেপে মেপে পড়ছে। কোনটি বেশিও না, কমও না। কী যে অসাধারণ ছিল সেই বৃষ্টি।

দৌড়ে নামলাম সাগরে। সেখানে আমাদের জন্যে আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল।
সাগরের মাঝে বুক পানিতে দাঁড়িয়ে আছি।
য..,ত.. দূ..রে... চোখ যায়...

চারিদিকে মুক্তো দানার মতো বৃষ্টি। মনটা ফুরফেুরে আনন্দে বেসামাল হয়ে ওঠে।

শ'য়ে শ'য়ে মুক্তো...
হাজারে হাজারে মুক্তো...
লাখে লাখে মুক্তো...

এ মুক্তোকে ছোঁয়া যায়... অনুভব করা যায় পরানের গহীনে... কিন্তু ধরা যায় না!
ধরতে গেলেই তারা কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

সেবার অসাধারণ কিছু অনুভূতি নিয়ে ঘরে ফিরেছিলাম। আশা ছিল এবারও সেরকম অনুভূতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
এবার নিয়ে আমি ২১তম বার নারিকেল জিঞ্জিরায় (সেন্টমার্টিন্স) ঘুড়তে গেলাম। প্রতিবারই নতুন নতুন কিছু পেয়েছি। কোনোবারই আগের কোনো কিছুর পুনরাবৃত্তি হয়নি। এবারও হল না। আশা কিন্তু ছিল। তবে হাজার ইচ্ছা থাকা সত্বেও হল না।
ঢাকা থেকে রওনা দিলাম ১৯ আগস্ট সন্ধ্যার বাসে। এবার সর্বমোট ১২ জন যাচ্ছি। বাস ছাড়বে ৮:৩০ মিনিটে। সবাইকে বলেছি ৮টার মধ্যে হাজির হতে। যথারীতি সফর সঙ্গীদের কেউ কেউ কিছুটা দেরি করে আসলো। অবশেষে বাস ছাড়লো রাত ৮:৫৭মিনিটে। শুরু হল ভ্রমণকালীন জমজমাট আড্ডা, হৈচৈ, গান। রাতের খাবারের জন্যে থামলাম কুমিল্লার নূরজাহানে। প্রতিবারের মতো এবারো সেখানে প্রতারণার শিকার হলাম। ১ বাটি ভাজিকে একটা বড় বাটিতে পরিবেশন করে তারা দু'বাটির দাম রাখলো। না জিজ্ঞেস করে খাওয়াতে ৮০ টাকার মাছের পিস তারা ২০০ টাকা রাখলো। তার ওপর ভূতুড়ে বিলতো আছেই। বিল-অস্ত্রে নূরজাহান কর্তৃপক্ষ সুন্দর করে গলা কেটে দিল।  

ভোরে ইনানি রিসোর্টে নেমে মিষ্টি গরম পানি স্বাদের চা খেলাম। তবে এসব হাসিমুখেই সয়ে নেই সেন্ট মার্টিন্সের বৃষ্টিবিলাসের স্বপ্নে।
অবশেষে ২০ আগস্ট সকাল ৯:৩০ মিনিটে নামলাম টেকনাফ বাসস্ট্যান্ডে। পুরো টেকনাফ জুড়ে সকালের নাস্তা পাওয়া গেল না। তাই সিঙ্গারা-সমুচা দিয়েই কিছুটা পেট পূজা করতে হল।

নাস্তা পা পাওয়ার চেয়ে বড় ধরনের খারাপ খবর আরও অপেক্ষা করছিল। সাগরে ৩নং সতর্কতা সংকেত চলছে। তাই জাহাজ চলবে না। এর আগে আমি ৫নং বিপদ সংকেত চলা অবস্থায় সাগর পাড়ি দিয়েছি। তাই ৩ নাম্বার সিগন্যালকে পাত্তাই দিলাম না।
২১ আগস্ট পূর্ণিমা। রাতে সাগর ফুঁসে উঠবে। তাতে সমস্যা কী! আমরা রওনা হচ্ছি দুপুর বারোটায়। মাত্র ২:৩০ ঘণ্টার জার্নি।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা বলা আছে। ভালোই তো হবে! সেন্ট মার্টিনন্সে যাচ্ছি বৃষ্টিতে ভিজতে। ইলশেগুড়ি বৃষ্টির সাথে খেলতে খেলতে সাগর পাড়ি দেয়া যাবে।

তারপরও পুরো বিষয়টা ট্যুর সঙ্গীদের সাথে শেয়ার করলাম, বললাম, কেউ থেকে যেতে চাইলে থাকতে পারে। আমি কিন্তু ঠিকই যাবো।  

কেউ কোনো আপত্তি করলো না। উল্টো কিশোর, আদনান, স্মৃতি আনন্দে "ই...ই...য়ে...য়...য়ে..." করে চিল্লিয়ে উঠলো। সানোয়ার, রিমা, মাহি, আশরাফ, বাবু, শুভ, পলাশ, রাইসুল কেউই আপত্তি করলো না।

টেকনাফ থেকে যাত্রা শুরুর আগে

ঘাগু সাংবাদিক রাইসুল যথারীতি তার কিছু লিঙ্ক খুঁজে বের করলো। ট্রলার ঠিক হল। মালিক শুক্কুর আলী। একটাই বিষয়, ট্রলারের সাথে সেন্ট মার্টিন্সে ৮০ বস্তা সার যাবে। আমি আনন্দে রাজি হয়ে গেলাম। কারণ, এ ৮০ বস্তা সারের ৮০০ কেজি ওজনই সাগরে আমাদের ট্রলারকে অতিরিক্ত দুলুনি থেকে বাঁচাবে।

টেকনাফে আমার সাথে পরিচয় হলো সেন্টমার্টন্সের সরকারি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক সাগরের সঙ্গে। তিনি ১১টার যাত্রীবাহী ট্রলারটি মিস করেছেন। পরের দিন (২১ তারিখে) তার স্কুলের দ্বিতীয় সাময়িকী পরীক্ষা। তিনি টেকনাফে এসেছেন সেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন বলে। সময় মতো ফিরতে না পারলে পরের দিন সেই স্কুলে পরীক্ষা হবে না! কঠিন অবস্থা! 
আমি নিজে থেকেই তাকে আমাদের সঙ্গী হতে বললাম। বেচারা কিছুক্ষণ লজ্জায় আমতা আমতা করে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেল। সাগরের মতো আরো ৪/৫ জন যাত্রী আছেন যারা যাত্রীবাহী ট্রলারটি মিস করেছেন। উনারা অনেকটা আমাদের ‘দাওয়াতের’ অপেক্ষায় না থেকে নিজ উদ্যোগেই উঠে পড়লেন আমাদের ট্রলারে। আমরাও কেউ না করলাম না। সেন্ট মার্টিন্সের পথে আজ আর কোনো ট্রলার ছাড়বে না। কয়েকটি মানুষের যদি কিছু উপকার হয় তাতে ক্ষতি কি!

১২টার ট্রলার ছাড়লো ১২:৫০ মিনিটে। বিসমিল্লাহ্ বলে রওনা হলাম। সবার চোখে স্বপ্ন। নারিকেল দ্বীপের বা দারুচিনি দ্বীপের স্বপ্ন। এর সঙ্গে দ্বীপের মোহাবেশ সৃষ্টিকারী বৃষ্টিকে ছোঁবার স্বপ্ন।  

ওদিকে, কিছুদূর যেতে না যেতেই বিজিবির চেকপোস্টে ট্রলার আটকালো। যাত্রীদের নিয়ে তাদের কোন আপত্তি নাই। তাদের আপত্তি ওই ৮০ বস্তা সার নিয়ে। ১ বস্তা ইউরিয়া সারের উৎপাদনমূল্য ৮৫০ টাকার বেশি হলেও বাংলাদেশ সরকার কৃষকদের সুবিধার জন্যে বিশাল ভর্তুকি দিয়ে মাত্র ২৩০ টাকায় তা বিক্রি করে। ফলে সীমান্ত অঞ্চলে তা কালোবাজারি হয়ে বার্মা ও ভারতে চলে যায়।

তখনো যাত্রা শুরু হয়নি, বৃষ্টিভেজা ত্রিপলে ঢাকা সারের বস্তা ও সফরসঙ্গীদের কয়েকজনা

ট্রলারের মাঝি ইউএনওর স্বাক্ষর সম্বলিত হাতে লেখা একটি কাগজ বিজিবি সদস্যদের দেখালো। কিছুদিন আগ পর্যন্ত এ কাগজ দেখালেই হয়ে যেত। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ সে কাগজ নকল করতে শিখে গেছে। তাই এখন নতুন নিয়ম চালু হয়েছে, ইউএনওর কাগজ ছাড়াও বিজিবির ক্যাম্পে মৌখিক আদেশ আসতে হবে। যেহেতু বিজিবির ক্যাম্পে এ রকম কোনো আদেশ আসে নাই তাই এ ট্রলার ছাড়া হবে না।

মাঝি যথারীতি তার মালিক শুক্কুর আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করলো। শুক্কুর আলী যোগাযোগ করবে সারের মালিকের সঙ্গে। সারের মালিক যোগাযোগ করবে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে। রাজনৈতিক নেতারা যোগাযোগ করবে ইউএনওর সঙ্গে। ইউএনও যোগাযোগ করবে বিজিবিতে। মাঝি আমাদের আস্বস্ত করলো ১০ মিনিটের মধ্যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।  
আমরা নাফ নদীর এক ধারে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ‘১০ মিনিট’অপেক্ষা করতে করতে ১ ঘণ্টা কেটে গেল। তবে মাঝি তখনো বলে যাচ্ছে- ১০ মিনিটের মধ্যেই সমাধান হয়ে যাবে।  

এভাবে ‘১০ মিনিট’ অপেক্ষা করতে করতে আরো ১ ঘণ্টা কেটে গেল। প্রতিবার তার ‘১০ মিনিট  অপেক্ষা’  যেন নবায়ন হচ্ছিল। ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গা শুরু করেছে। মাঝি তখনো বলে যাচ্ছে ১০ মিনিটের মধ্যেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে!

আরো ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করে এক পর্যায়ে রাইসুল আর বাবু রওনা হয়ে গেল মূল ভুখণ্ডে। তারা রওনা হবার ৩০ মিনিটের মধ্যেই সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। এর মাঝে শুরু হল বৃষ্টি। ট্রলারে কোন ছৈ নেই। তাই আমরা রেইনকোট পরে আনন্দেই বৃষ্টি উপভোগ করতে লাগলাম।  

দ্বীপে আমাদের বৃষ্টি আর সমুদ্রবিলাস

বিশাল নাফ নদীতে বৃষ্টি সত্যিই অসাধারণ লাগছিল। নদীটাকেও সুন্দরী, অপরূপা লাগছিল। রাইসুল আর বাবু বিকেল সাড়ে ৪টায় ফিরে আসলো ৪ প্যাকেট বিস্কুট আর খাবার পানি নিয়ে। সকালে নাস্তা খাওয়া হয়নি, দুপুরের খাবার হিসেবে ১২ জনের জন্যে ৪ প্যাকেট বিস্কুট একটু কমই হয়ে যায়। তারপরও সবাই মিলে ভাগযোগ করে খেলাম। এদিকে বৃষ্টি ক্রমাগত ঝড়েই যাচ্ছে। বিকাল ৪:৩৮ মিনিটে আমরা আবার রওনা হলাম সেন্টমার্টিন্সের উদ্দেশ্যে। ‘নোঙ্গর তোলো তোলো, সময় যে হল হল...’ গান শুরু হল।
নদী কিছুটা উত্তাল। দেড় ঘণ্টা পর ট্রলার পড়লো সাগরে। সাগরে পড়তে না পড়তেই বিশাল এক ঢেউয়ের ধাক্কা খেল। কয়েকজন আনন্দে চিল্লিয়ে উঠলো। রাইসুল সোল্লাসে বললো, ‘আমার ট্যুর সাকসেসফুল! ট্যুরের টাকা উসুল!’ এরই সঙ্গে আরো জোড়ে ‘নোঙ্গর তোলো তোলো’ গান শুরু হল।  

আমি আমার আগের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝলাম সামনে খবর আছে। আমার দুঃশ্চিন্তা বাকীদের আতংকিত করতে পারে বলে চুপচাপ থাকলাম। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। মিনিট দশেকের মধ্যেই সবার গান বন্ধ হয়ে গেল। আজ সাগর সত্যিই বেশি উত্তাল। বাস্তবে অনেক বেশি উত্তাল। আমার কপালের ভাঁজ লুকাতে পারলাম না অন্যদের থেকে।

ধীরে ধীরে চারিদিকে অন্ধকার হতে শুরু করেছে। বৃষ্টি আসা-যাওয়ার মধ্যেই আছে। যতদূর চোখ যায়, সাগরে কোনো নৌকা বা ট্রলার নেই। হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা মাঝ সমুদ্রে গিয়ে যদি ট্রলারের প্রপেলার নষ্ট হয়ে যায়, তখন কী হবে! কিন্তু মনে জোর এনে নিজের এ বাজে চিন্তাটাকে সঙ্গে সঙ্গেই হাওয়ায় মিশিয়ে দিলাম।

ওদিকে, বাস্তব হচ্ছে- আতংক ধীরে ধীরে সবাইকে গ্রাস করছে। এত উত্তাল সাগর আমি কোনোদিন দেখিনি। দেখেনি আমাদের সঙ্গী সেন্টমার্টিন্সের বাসিন্দাদের কেউ কেউও। এমনকি আমাদের মাঝিও এমন দেখেননি বলে জানালেন। এরকম উত্তাল সাগরে মাঝি কোনোরকমে ট্রলারটাকে সোজা রাখতেই হিমসিম খাচ্ছে।  

এটা পরদিন সকালের ছবি, দ্বীপ থেকে সমুদ্র আর আকাশের  নীলাভ-কালচে রূপ, তখনো উত্তাল-রুদ্র রূপে সমুদ্র

সেন্টমার্টিন্সে কসমেটিক্স দোকানের মালিক রশিদ ভাই আমাদের সঙ্গে যাত্রী হিসেবে এসেছেন। তিনি ১০ বছর আগে ট্রলার চালাতেন, এখন ব্যবসা নিয়েই বেশি ব্যস্ত। ট্রলারের মাঝির এ করুন অবস্থা দেখে শেষ পর্যন্ত তিনি এসে হাল ধরলেন। তিনি হাল ধরাতে ট্রলার কিছুটা ধাতস্ত হল।

এদিকে, চারিদিকে নেমে এসেছে অন্ধকার। আজ পূর্ণিমার আগের দিন, মানে ভরা কাটাল (Spring tide)... উত্তাল সাগর... ৩নং বিপদ সংকেত... বৃষ্টি... ঝড়... বজ্রপাত.. হিম-শীতল বাতাশ। তার মাঝ দিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। আমার একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল ট্রলারটি ঠিক পথে চলছে না। বললাম, ‘সেন্ট মার্টিন্স তো সোজা, আমরা ডান দিকে যাচ্ছি কেন!" কেউই কোনো উত্তর দিল না। পরে বুঝেছি প্রথমে ঢেউকে সামলাতে হচ্ছে, তারপর ঢেউ যে দিকে নেয় সেদিকেই যেতে হচ্ছে, তারপর কিছুটা সামনের দিকে এগোতে হচ্ছে। তাই না চাইলেও সাগরের দিকেই এগোচ্ছি আমার। ভয়াবহ ব্যাপার।

সবার জন্য লাইফজ্যাকেটও নেই। এর মাঝে মাহী, কচি, পলাশ, রাইসুল কিছুটা সাঁতার জানলেও এ সাগরের সাথে পেরে উঠবে কিনা সন্দেহ আছে। বাবু সাঁতারই জানে না। বাবুকে নিয়ে টেনশন শুরু হল বেশিমাত্রায়। সন্ধ্যা ছয়টা/সাড়ে-ছয়টার মধ্যে আমাদের সেন্টমর্টিন্সে পৌঁছানোর কথা। সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। সেন্ট মার্টিন্সের দেখা নাই। সাগর উত্তাল থেকে আরো উত্তাল হতে লাগলো। এ সাগরকে আমি চিনি না! এ সাগরকে আমাদের মাঝিরাও চেনেন না। হলিউডের ছবির পরিচালকরাও এ সাগর দেখেনি। তাই নিজেদের চিন্তাশক্তি কাজে লাগিয়ে স্টুডিওতে যেমন ইচ্ছা তেমন ঝড় তৈরি করে। বাস্তবের সাথে এর কোন মিলই নেই- অন্তত এখকার এই সাগর দেখলে তারা এটা বিনা ওজরে মেনে নিতেন।

ফিরেছিলাম জাহাজে।  কারণ দ্বীপে পা রাখার পর সবাই পণ করেছিলাম- প্রয়োজনে একবছর থাকবো এখানে, তবু ট্রলারে নয়

এক সময় অনেক দূরে নেভির জাহাজের আলো দেখতে পেলাম। মনে আশার আলো জেগে উঠলো। আমরা আলো লক্ষ্য করে এগিয়ে যাচ্ছি। সাগর তার মতোই রেগে আছে। ধীরে ধীরে আলোর দিকে এগিয়ে চলছি। জাহাজের নাগাল পেলেই আশা করা যায়- আর সম্ভবত ২০/২৫ মিনিটের মধ্যেই আমরা দ্বীপে পৌঁছাতে পারবো। ঠিক এ সময়ই... যে শঙ্কা অনেক আগেই করেছিলাম...খামোখাই যে সেই শঙ্কা কর্কশ নির্মম বাস্তব হয়ে দেখা দিল- ট্রলারের প্রোপেলার নষ্ট হয়ে গেল! মিনিট দশেকের মধ্যেই ঢেউয়ে ঢেউয়ে আমাদের ট্রলার আরো ৪/৫ কিলোমিটার সাগরের দিকে চলে গেল। নেভির জাহাজের আলো ধীরে ধীরে মৃদু থেকে মৃদুতর হতে লাগলো।

বিপদ মানুষকে কতটা সাহসী করে তোলে তা বিপদের সময়ই বোঝা যায়। মাঝির এক সহকারী কোমরে দড়ি বেঁধে সাগরে নেমে পড়লো। দ্বীপে আমাদের ফিরতেই হবে। প্রোপেলার তাকে ঠিক করতেই হবে। মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম কতক্ষণ লাগতে পারে? মাঝি তার পুরানো রেকর্ড ফের বাজাল, ‘১০ মিনিটের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ’ উত্তর শুনে হাসবো না কাঁদবো ভেবে পেলাম না।

রাইসুল, কিশোর, স্মৃতি, আমি- আমাদের নিজস্ব যোগাযোগের মাধ্যমেগুলোতে যোগাযোগের চেষ্টা করতে লাগলাম। আমি প্রথমে ফোন দিলাম জুয়েলকে। কারণ, জুয়েল সেন্টমার্টিন্সে ট্যুরিজম ব্যবসা করে। ওর লোকাল লিংক ভালো। তারপর যোগাযোগ করলাম সবুজ ভাই আর নেভিতে কর্মরত হিমেলের সাথে। কিশোর-স্মৃতি প্রথমে যোগাযোগ করলো সাজ্জাদের সাথে, তারপর নেভিতে কর্মরত স্বর্ণার সাথে। রাইসুল যোগাযোগ করলো টেকনাফের লোকাল ব্যবসায়ী, ইউএনও, বিজিবি সদস্যদের সঙ্গে। খুবই অবাক হলাম ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ঢাকার বিশাল বন্ধু সার্কেল আমাদের এ করুণ অবস্থা জানতে পেরে ফোন দিতে লাগলো। সবাইকে বললাম আমাদের চরম বিপদের কথা।

আমরা ধীরে ধীরে আরো সাগরের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছি। এখন নেভির জাহাজের আলো মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে, আবার মাঝে মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে। যে গতিতে আমরা সাগরের দিকে যাচ্ছি, তাতে নেভির উদ্ধারকারী জাহাজ আসলেও আমাদের খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।

দ্বীপবাসী শিশুকিশোররাও মেতে উঠেছিল আমাদের ছেলেমানুষি আনন্দোল্লাসে

জুয়েল সেন্টমার্টিন্সের ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতির সঙ্গে যোগাযোগ করে তার ফোন নম্বর দিল। আমি উনার সাথে কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে উনি বললেন, ‘চিন্তা কইরেন না, আমরা ব্যবস্থা করতেছি। ’

ঠিক এ সময়ই প্রপেলার ঠিক হয়ে গেল। আবার নতুন উদ্দ্যমে আমরা যাত্রা শুরু করলাম- যাত্রা মানে ট্রলারের কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ফিরে এলো মাাঝির হাতে। জুয়েল, সবুজ ভাই, সাজ্জাদ সবাইকে দুঃশ্চিন্তা মুক্ত করলাম, ট্রলার ঠিক হয়ে গেছে, আমরা আর ২০ মিনিটের মধ্যেই (যদিও এটা কমপক্ষে ১ ঘণ্টার পথ) সেন্ট মার্টিন্সে পৌঁছাবো। পৌঁছিয়েই আমি সবাইকে আবার জানাবো- আমাদের নিয়ে দুঃশ্চিন্তা না করতে ঢাকায় সবাইকে জান।

চলতে চলতে ১০ মিনিট পরে এবার গেল ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে!

রাইসুল যোগাযোগ করলো ট্রলারের মালিক শুক্কুর আলীর সাথে। সে আমাদের নিশ্চিত করলো, নতুন ইঞ্জিন দেয়া হয়েছে, এ ইঞ্জিন নষ্ট হবার কোন সম্ভবনাই নাই। কিন্তু বেয়াদর ইঞ্জিন শুক্কুর আলীর কোন যুক্তিই শুনলো না। সে নষ্ট হয়েই রইলো। পরে অবশ্য শুনেছি নতুন ইঞ্জিনে বেশী প্রেসার দিতে নাই, তাহলে এ অবস্হা হবে। কিন্তু এ উত্তাল সাগরে ট্রলারকে টিকিয়ে রাখতে ইঞ্জিনকে বেশী প্রেসার দিতেই হবে। আমরা জাস্ট পরিস্থিতির শিকার।

মাঝি আর তার সহকারী দু'জন লেগে গেল ইঞ্জিন ঠিক করতে। এর মধ্যে একজন সহযোগী কোমরে দড়ি বেঁধে আবার সাগরে নেমে পড়লো, প্রোপেলারের কোন সমস্যা যদি থেকে থাকে, সেটাই তার গবেষনার বিষয়।

আবার ফোন গেল জুয়েল, সাজ্জাদ, হিমেল, স্বর্ণা আর ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতির কাছে। সবাই আবার আমাদের নিশ্চিত করলো সাহায্য আসছে। ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আমাকে বললো, তাদের ট্রলার ইতিমধ্যেই আমাদের খুঁজতে রওনা হয়েছে। হিমেল আমাকে নিশ্চিত করলো নেভি তাদের নিজস্ব জাহাজ ও একটি লোকাল ট্রলার পাঠিয়েছে। সবাইকে আমি আবার নিশ্চিত করলাম, আরেকটু ধৈর্য্য ধরতে। নেভি ও লোকার ট্রলার আসছে। যে কোনো সময় আমাদের ওরা পেয়ে যাবে।

মিনিট পনেরর মধ্যে আবার ইঞ্জিন ঠিক হল। তবে এবার প্রপেলার আর ইঞ্জিন আগের মতো কাজ করতে পারছে না। ঠকর ঠকর করে একটা আওয়াজ হয়েই চলেছে।

এবার সর্বোচ্চ ৫ মিনিট ট্রলার চলতে পারলো। তারপর প্রোপেলার ও ইঞ্জিন দু'টোই নষ্ট। সাগরের সব চাইতে ভয়ঙ্কর রূপটি তখনই দেখলাম। আচমকা গরম বাতাস শুরু হল। এবার প্রথমবারের মতো আমি সত্যিই ভয় পেলাম। গরম বাতাস মানে ঘূর্ণিঝড় আরম্ভ হতে যাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় মানে উদ্ধারকারী ট্রলার কোনোভাবেই এদিকে আসবে না। ঘূর্ণিঝড় শেষ হলেই কেবল হয়তো তারা আবার আমাদের খুঁজতে বের হবে। কিন্তু তখন আমাদের খুঁজে কোন লাভ নাই।

 

ঢেউগুলো এবার অনেক বেশি বড়। এক একটি বিশাল ঢেউ (১৫-২০ ফিট উঁচু হবে) এ সে আঘাত করছে , আমাদের ট্রলার ধীরে ধীরে ডান দিকে কাত হওয়া শুরু করেছে। ডান দিকে কাত হতে হতে ছলাৎ করে অনেকটা পানি নৌকার মধ্যে ঢুকে পড়লো। কিছুক্ষণ পর ট্রলার ধীরে ধীরে সোজা হল। তারপর দেখলাম আরেকটি বিশাল ঢেউ আসছে, আমাদের ট্রলার আবার ধীরে ধীরে ডান দিকে কাত

 

                                                                                                                                        পূর্ণিমা রাতে দ্বীপ থেকে দেখা সাগর

হওয়া শুরু করেছে! ডান দিকে কাত হতে হতে আবার ছলাৎ করে একগাদা পানি নৌকার মধ্যে ঢুকে গেল। তারপর আবার ট্রলার ধীরে ধীরে স্লো মোশনে সোজা হল। নৌকার ডান দিকে বসে আছে রিমা, আদনান, সানোয়ার আর শুভ। ওদের মানষিক অবস্থা কী আল্লাহই জানে। মাঝির সহযোগীরা ক্রমাগত পানি সেঁচে যাচ্ছে।

অসহায় মাঝিও এবার মনে হয় বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। এর প্রমাণ তিনি দিলেন এবার। মালিক শুক্কুর আলীকে ফোন দিয়ে বললেন, ‘ভাই এটা আপনি আমারে কই পাঠাইলেন!’ এরপর আমাদের বললেন, ‘ভাই আপনেরা একটু নেভির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ’

আবার ফোন গেল হিমেল আর স্বর্ণার কাছে। ওদের বললাম, ‘ভাই, আমরা সত্যিই ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছি। একটু সাহায্য কর। ’
হিমেল-স্বর্ণা আবারো সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া দিল। নেভির হেড অফিস থেকে সেন্টমার্টিন্সের কোস্টাল গার্ডে ফোন গেল। তাছাড়া দু'জনেই তাদের লোকাল কন্ট্যাক্ট রনি ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করলো। রনি ভাই যোগাযোগ করলেন কিশোরের মোবাইলে। রনি ভাই বারবারই জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘আপনারা আনুমানিক কোন জায়গাটায় আছেন। আমি আপনাদের পাচ্ছি না। ’ আমিও এর উত্তরে বারবরই বলতে লাগালাম, ‘আমরা মূল সাগরের দিকে চলে যাচ্ছি। ’

এসময় মাঝিদের টর্চের বাল্বটি কেটে গেলে। হঠাৎ করে মনে হল, আরে আমার কাছে তো অনেক শক্তিশালী একটি টর্চ আছে, আমি সেটা কেন বের করছি না। আমার বসার যায়গা থেকে উঠে হামাগুড়ি দিয়ে ব্যাগের দিকে এগোতে লাগলাম। এ সময়ই আচমকা বিশাল ঢেউ আছড়িয়ে পড়লো ট্রলারে। হঠাৎ আমি আমার নিজেকে শূন্যের মধ্যে দেখলাম। মাহি, কচি মাথার দিক থেকে আর বাবু পায়ের দিক থেকে শূন্যে থাকা আমাকে ধরার চেষ্টা করলো।  

সবাইকে ফাঁকি দিয়ে আমার উড়ন্ত শরীর আরেকটু সরে গেল। একটা সময় ক্রিকেট খেলতাম। তখন নিজের রিফ্লেক্স প্র্যাকটিস করতাম। সেটা এবার কাজে দিল। হাত আর পা দিয়ে ট্রলার ছোঁয়ার চেষ্টা করলাম, চেষ্টাটা কাজে দিল। হাতটা ট্রলারের ডেকে হালকা স্পর্শ করাতে উড়ে গিয়ে পড়লাম ইঞ্জিন রুমে। কয়েক মিলি সেকেন্ডের মধ্যে নিজেকে ব্যালেন্স করে ফেললাম। তারপর সেখান থেকে উঠে ব্যাগ থেকে আমার টর্চটি বের করলাম। হলিউডি সিনেমায় দেখা কায়দায় টর্চ জ্বালাতে আর নেভাতে লাগলাম। এতে করে নেভির দুইটি উদ্ধারকারী দলের একটিরও নজরে যদি পড়ি তাতেই রক্ষা।

অপরদিকে, ক্রমাগত রোলিংয়ের প্রভাবে অনেকেই বমি করে দিয়েছে। বমি করলে মাথা হালকা হবে, তাই যাদের বেশি খারাপ লাগছিল তাদের বমি করে ফেলতে বললাম। আমারও মাথা ঘোড়ানো শুরু করেছে। মানুষ আর কতক্ষণ পারে। একবার ভাবলাম বমি করেই দেই। হঠাৎ মনে হল, না, আমি বমি করবো না। নিজের কনসেনট্রেশন অন্য দিকে সরিয়ে দিলাম। বিষয়টা কাজে দিল।
দুপুর ১২টার সময় ট্রলারে উঠেছি, এখন রাত ৯টা মত বাজে। ট্রলারে টয়লেটের কোনো ব্যবস্থা নাই। এক একজনের ব্লাড়ার ফেটে যাচ্ছে। রোলিং এত বেশি যে, কিছুই করার নাই।

ইতিমধ্যে হিমেল, স্বর্ণা আর রনি ভাইয়ের সাথে ক্রমাগত কথা হচ্ছে। হিমেল আর স্বর্ণা আমাদের বারবারই সাহস দিয়ে যাচ্ছে। রনি ভাই আমাদের অবস্থান তখনো চিহ্নিত করতে পারেনি। এসময় আবার শুরু হল বৃষ্টি। রনি ভাইয়ের সাথে আবার কথা হচ্ছে
: ভাই আমরা আপনাদের খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারা যদি দয়া করে আপনারদের অবস্থান একটু পরিষ্কার করতে পারেন
- রনি ভাই, আমরা সাগরের দিকে আছি। সেন্ট মার্টিন্স আমাদের বাম দিকে। ধূর কি বলছি! আমাদের বাম দিক বললে আপনি কি বুঝবেন! আমরা সেন্ট মার্টিন্সে থাকা নেভির জাহাজের আলো দেখতে পাচ্ছি। হয়তো ৩০-৪০ মিনিটের পথ।
: আচ্ছা আপনাদের সাথে এমন কিছু নাই, যাতে আমরা আপনাদের অবস্থান বুঝতে পারি।

- আমাদের সাথে টর্চ আছে। আমরা টর্চ জ্বালাচ্ছি-নেভাচ্ছি। আমরা যদিও অনেক দূরে, তারপরও দেখেন, আমাদের আলো দেখতে পারেন কিনা।

বৃষ্টিমুখর উত্তাল সাগর, তারপরও রূপে মোহময়- দ্বীপ থেকে নেয়া পরদিনের ছবি

: ভাই আমি আপনাদের দেখতে পাচ্ছি না। কোনো আলোও দেখতে পাচ্ছি না। আচ্ছা দাঁড়ান দাঁড়ান, সম্ভবত আপনাদের দেখেছি। হ্যাঁ, আপনাদের দেখেছি। চিন্তা করেন না, আপনাদের ওখানে আমাদের ট্রলার যাচ্ছে।
- আলহামদুলিল্লাহ্

এরপর বেশ কিছুক্ষণ আমি বাকরুদ্ধ হয়ে বসে থাকলাম। কী অদ্ভূত রকমের একটা অনুভূতি কাজ করতে লাগলো। অবশেষ কোস্টা গার্ড সাগরে আমাদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পেরেছে। আমরা তাহলে আমাদের গন্তব্যে ফিরতে পারছি। ওহ্, কী স্বস্তিকর অদ্ভূত অনুভূতি- এমন এক অনুভূতি যা আগে কখনো হয়নি।

কিশোর আস্তে করে জিজ্ঞেস করলো, ‘কি বললো?’ আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। এত বড় একটা সুখবর অথচ আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছি ট্রলারের পাটাতনে। একইসঙ্গে আমি ক্রমাগত টর্চ জ্বালিয়ে-নিভিয়ে সিগন্যাল দিয়েই যাচ্ছি। মিনিট পাঁচেক পর আস্তে করে সবাইকে সুখবরটা দিলাম। কেন এমন করলাম, জানি না। এর ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে।

কতক্ষণ জানি না, তবে বেশ কিছুক্ষণ পর উদ্ধারকারী ট্রলার আসলো আমাদের কাছে। সেই ট্রলারটির সঙ্গে আমাদের ট্রলারকে দড়ি দিয়ে বাঁধা হল। আমরা রওনা হলাম দ্বীপের উদ্দেশ্যে। অনেক পরিশ্রমের পর পুরো শরীর জুড়ে যেমন একটা অবসাদ কাজ করে, আমার শরীর জুড়েও সে রকম অবসন্ন ভাব হতে লাগলো। অনেক মানসিক চাপ নিয়েছি। আমাদের একেকজনের নার্ভ কতটা প্রেসার নিতে পারে আজ তা প্রমাণ হয়ে গেছে। মানুষের সহ্যের সীমা যে এতটা তা আগে কখনো জানা ছিল না।
বৃষ্টি ক্রমাগত পড়েই চলছে। মিনিট ১৫ পরে আমাদের উদ্ধারকারী ট্রলারের তেল ফুরিয়ে গেল। অন্য সময় হলে হৈচৈ শুরু করে দিতাম। কিন্তু এখন আমরা কেউই তেমন কিছু বললাম না। কারণ, আমরা এর চাইতে অনেক বেশি মানসিক চাপ নিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। দড়ি টেনে দুটি নৌকাকে পাশাপাশি দাঁড়া করিয়ে আমাদের ট্রলার থেকে উদ্ধারকারি ট্রলারে তেল দেয়া হল।

আবার রওনা হলাম আমরা। ৫ মিনিট পরে এবার ছিড়লো দুই নৌকার মাঝের সেতু বন্ধন দড়িটি। আরো কিছুক্ষণ ব্যয় হলো এতে করে। পরে সব সমস্যা ঠিক করে আমরা আবার রওনা হলাম।

এই বোর্ডে বানান ২/১টা ভুল থাকতে পারে, কিন্তু খুবই কার্যকরী আর দরকারি এই নম্বরগুলি। কারণ চরম বিপদের সময়ে বানান ভুল কোনো  গুরুতর বিষয় হয়ে দেখা দেয় না

অবশেষে রাত ১০:১৮ মিনিটে পৌঁছালাম সেন্টমার্টিন্সে। উদ্ধারকারী ট্রলারটি দড়ি খুলে তার নিজের গন্তব্যের দিকে রওনা হল। উত্তাল সাগর, বৃষ্টি চলছে, ইঞ্জিন নষ্ট... ট্রলার জেটিতে না ভিড়িয়ে সৈকতে ভেড়াতে হল।  

কিশোর আর রাইসুল রাগে ফেটে পড়লো, ট্রলার জেটিতেই ভেড়াতে হবে। ওদের উত্তজনা কিছুটা কমার পরে আমি বললাম, ‘এখানে হয়তো আমাদের কোমর পানিতে নামতে হবে। আমরা এখানেই নামি। কারণ, আল্লাহ্ না করুক, দেখা গেল এমন উত্তাল সাগরে ট্রলার জেটিতে ভেড়াতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে যদি আমরা সাগরে হারিয়ে যাই, তখন কি হবে!’ 

সবাই পরিস্থিতি বুঝতে পারলো। শুভকে প্রথমে নামতে বলে বাকিদের সাহায্য করতে বললাম। সবাই নামার পর শেষবারের মতো মালপাত্র চেক করলাম আমি আর আদনান। তারপর ঝুপ করে যখন পাড়ে নামলাম তখন সেখানে কোমড় পর্যন্ত পানি। চোখের নিমিষে এক ঢেউ এসে বুক পর্যন্ত পানি বানিয়ে দিল। হঠাৎ মনে হল, হায় আল্লাহ্ পকেটে মোবাইল আর মানিব্যাগ!কোন রকমে দৌড়ে পাড়ে আসার চেষ্টা করলাম। ততক্ষনে কর্ম সারা। মোবাইলটা আমার শেষ হয়ে গেল।

পাড়ে এসে অদ্ভূত একটা জিনিস দেখলাম। এই ঝুম বৃষ্টিতে ৩০/৪০ জন মানুষ আমাদের অভ্যর্থনার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে। এঁদের মধ্যে থেকে একজনে জিজ্ঞেস করলেন,

: আপনি শাওন ভাই।
- হ্যাঁ
: আমি লেফটেন্যান্ট হাবিব (হাত বাড়িয়ে করমর্দন করলেন)। আপনারা নিরাপদ আছেন তো?
- আমরা অবশ্যই নিরাপদ আছি। আপনাদের কাছে আমরা চির কৃতজ্ঞ। আমরা সত্যিই ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছিলাম।
: আপনারা যেভাবেই থাকেন না কেন, আমরা অবশ্যই আপনাদের উদ্ধার করতাম। মুখভর্তি হাসি নিয়ে বললেন এই তরুণ সেনা কর্মকর্তা।
- ধন্যবাদ!

দায়িত্ববান স্মার্ট নৌ কর্মকর্তা লে. হাবিবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা রওনা হলাম হোটেলের দিকে।

শেষতক জাহাজে করে ফিরতে পারা ছিল স্বস্তির

ট্যুরের বাকি অংশ ছিল আরো বেশি অসাধারণ। আমাদের জীবনের অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ ট্যুর হয়েছে এটি। প্রতিটি মূহুর্তেই আমরা আনন্দ করেছি, বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করেছি, মাটি-কাদার সাথে গড়াগড়ি খেয়েছি, চুটিয়ে আড্ডা মেরেছি, গভীর রাতে ভূতের গল্প শুরু করেছি, ঢাকায় যে একটি জীবন আছে এক বারের জন্যেও মনে পড়েনি। সেসব গল্প না হয় আরেকদিন হবে।
তবে শেষ করার আগে এই অবিষ্মরণীয় সফরের দুয়েকটি বিষয় উল্লেখ না করা অন্যায় হবে। এগুলো হচ্ছে

কৃতজ্ঞতা:
১. আল্লাহ্ ২. মুরুব্বীদের দোয়া ৩. যাত্রীবেশী মাঝি রশীদ ভাই (ইনি না থাকলে আমরা সত্যিই বেঁচে ফিরতাম কি না সন্দেহ) ৪. ৮০ বস্তা সার ৫. স্বর্ণা, হিমেল, রনি ভাই, সাজ্জাদ, জুয়েল, সবুজ ভাই, লে. হাবিব

শিক্ষা:
•    জীবন রক্ষাকারী বস্তুগুলোর ব্যাপারে (লাইফ জ্যাকেট, টর্চ লাইট) কোয়ালিটি নিয়ে কোনো কম্প্রোমাইজ নয়।
•    বিপদে মাথা যত ঠাণ্ডা রাখা যাবে, উদ্ধারের সম্ভবনা ততই বাড়বে।
•    সাগরে আপনার ট্রলার বা জাহাজের নির্দিষ্ট পরিমাণ ওজন অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করবে।
•    কখনোই আশা হারাবেন না। সব বিপদেরই কোনো না কোনো সমাধান আছে।

[দুর্যোগে পড়া অবস্থায় কোনো ছবি তোলার মতো মানসিকতা কারোই ছিল না, তাই সেময়ের কোনো ছবি দেওয়া গেল না। সঙ্গের ছবিগুলো মূল ঘটনার আগের ও পরের

লেখক: জিকরুল আহসান শাওন, সফটঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ও শখের ফটোগ্রাফার

pipasha@gmail.com


মন্তব্য