kalerkantho

স্মৃতি ছিনতাই!

মস্তিষ্কের মেমোরি সিগন্যালের রহস্য উন্মোচনে কাজ করে যাচ্ছেন একদল বিজ্ঞানী। এটি সম্ভব হলে অনেক ধরনের মানসিক অসুখের চিকিৎসা দেওয়া যাবে সহজেই। হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি করা যাবে উদ্ধার। বিস্তারিত মিজানুর রহমানের কাছে

২৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্মৃতি ছিনতাই!

ভেবে দেখুন, আপনি নিজের স্মৃতি ঠিক ফেইসবুক ফিডের মতো দেখতে পাচ্ছেন। যেটি অপ্রয়োজনীয় সেটি ফেলে দিচ্ছেন আর যেটি অমূল্য সেটি রেখে দিচ্ছেন যত্ন করে। শুনতে অনেকটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো হলেও এই প্রযুক্তি শিগগিরই আসতে যাচ্ছে। আর এই প্রযুক্তিতে চিকিৎসা দেওয়া যাবে বিভিন্ন স্নায়ুরোগের। কিন্তু ঝামেলার বিষয় হচ্ছে, যদি এসব প্রযুক্তি বেহাত হয়ে যায় তাহলে হতে পারে নতুন ধরনের সমস্যা। হাইজ্যাক হতে পারে স্মৃতি। স্মৃতি মুছে দেওয়ার হুমকি দিয়ে টাকার পণও চাইতে পারে একদল।

 

কী এই প্রযুক্তি?

এটি নিউরোটেকনোলজির একটি কৌশল। অধুনিক নিউরোটেকনোলজিতে বিজ্ঞানীরা স্মৃতি উদ্ধার করতে পারেন। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দশকের মধ্যে বিজ্ঞানীরা স্মৃতিকে নিজেদের মনমতো বিন্যাস ও পুনর্বিন্যাস করতে পারবেন। ডিপ ব্রেইন সিম্যুলেশন প্রযুক্তিতে এসব সম্ভব হতে পারে।

এই প্রযুক্তিতে বিশ্বব্যাপী দেড় লাখেরও বেশি মানুষকে মস্তিষ্কভিত্তিক নানা অসুখ, যেমন—ট্রেমর, পারকিনসনস, ওসিডির চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই প্রযুক্তি ডায়াবেটিস, স্থূলতা, বিষণ্নতার পাশাপাশি নানা ধরনের মানসিক রোগের চিকিৎসা দেওয়ারও সম্ভাবনা দেখিয়েছে। গবেষকরা এরই মধ্যে প্রযুক্তিটি হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি উদ্ধার করার কাজে ব্যবহার  করতে শুরু করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সৈনিকদের মস্তিষ্কে আঘাতের ফলে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি পুরোপুরি উদ্ধারের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এটিকে মানসিক পরাশক্তি বলে আখ্যা দিচ্ছেন অনেকে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লরি পাইক্রফট মনে করেন, আগামী ২০ বছরের মধ্যে প্রযুক্তিটি এমন পর্যায়ে পৌঁছবে, যাতে স্মৃতি সৃষ্টিকারী ব্রেইন সিগন্যালগুলো ধরা সম্ভব হবে। আর আগামী ১০ বছরের মধ্যে প্রযুক্তিটির বাণিজ্যিকীকরণ হলেও অবাক হব না। এই শতাব্দীর মাঝামাঝি এমন প্রযুক্তিও আসতে পারে, যার সাহায্যে স্মৃতিকে নিজেদের মতো করে সৃষ্টি করা যাবে।

 

স্মৃতি ছিনতাই!

পাইক্রফট মনে করেন, এ ধরনের প্রযুক্তি বেহাত হলে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে অনেকে। ধরা যাক, একজন হ্যাকার একজন পারকিনসনস রোগীর স্মৃতির তথ্য হ্যাক করেছে। সেই হ্যাকার চাইলে এই রোগীর স্মৃতিতে সংযোজন-বিয়োজন করতে পারবে, এমনকি রোগীকে সাময়িক পক্ষাঘাতেও পাঠিয়ে দিতে পারবে। এমনও হতে পারে, ওরা স্মৃতি মুছে দেওয়ার হুমকি দিয়ে পণও দাবি করতে পারে। যদি বিজ্ঞানীরা আমাদের মস্তিষ্কের সিগন্যালের রহস্য উদ্ধার করতে পারেন তাহলে এই সম্ভাবনা এক অর্থে সীমাহীন। ভাবা যায়, তখন একজন হ্যাকার একটি দেশের সামরিক হাসপাতালের ডাটা হ্যাক করে কী পরিমাণ তথ্য পাচার করতে পারবে! ২০১২ সালে অক্সফোর্ড ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা একটি গেইমিং হেডসেট ব্যবহার করে মস্তিষ্কের তরঙ্গ কাজে লাগিয়ে ব্যাংক কার্ডের নাম্বার ও পিন নাম্বার সফলভাবে বের করতে পেরেছিলেন।

 

হীরক রাজার যন্তরমন্তর ঘর!

এই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে দূর ভবিষ্যতে স্বৈরাচার ও একনায়করা বিদ্রোহী নাগরিকদের স্মৃতিকে নিজের মতো করে সেট করে দিতে পারবে। অনেকটা সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার মতো। সিনেমায় যন্তরমন্তর ঘরে ঢুকিয়ে যেভাবে মগজ ধোলাই করা হতো অনেকটা সে রকম।

 

অনুপ্রবেশ

মেডিক্যাল ডিভাইসে হ্যাকিং নতুন কোনো বিষয় নয়। সাইবার নিরাপত্তার প্রতি ঝুঁকি হতে পারে এমন সাড়ে চার লাখেরও বেশি পেসমেকার ২০১৭ সালে বাজার থেকে তুলে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। দিনে দিনে চিকিৎসাব্যবস্থা যতই প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে ততই নিরাপত্তার ঝুঁকিটা বাড়ছে। তাই আশঙ্কা করা হচ্ছে, একজন রোগী একমুহূর্তের জন্যও অনিরাপদ বোধ করলে সে আর এই ধরনের চিকিৎসা নেবে না।

 

সাইবার নিরাপত্তা

এই ধরনের প্রযুক্তি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকা অবস্থায়ই নিরাপত্তার ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করাটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এর জন্য তথ্যকে এনক্রিপ্ট করতে হবে। সেই সঙ্গে নিয়মিত নিরাপত্তা আপডেট দিতে হবে।

মন্তব্য