kalerkantho

পেইজ রিভিউ

তাঁরা একাত্তরের কথা বলেন

রিদওয়ান আক্রাম   

৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



তাঁরা একাত্তরের কথা বলেন

বাংলাদেশের এক তরুণ, ধরে নিলাম নাম তাঁর রাকিব হোসেন। চাকরির সূত্রে থাকতেন যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরের উত্তরের অংশে। বই পড়তে ভালোবাসেন। বাংলা বই সংগ্রহের জন্য তাঁকে যেতে হতো পূর্ব লন্ডনে। সেখানকার হোয়াইট চ্যাপেলের কাছের এক লাইব্রেরিতে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক লেবাননি তরুণীর সঙ্গে। নাম তাঁর রেবেকা চৌধুরী। রেবেকার বাবার দেশ বাংলাদেশ হওয়ায় দেশের প্রতি তাঁর অদ্ভুত টান। একসময় দুই বন্ধু চিন্তাভাবনা করলেন, কোনোভাবে এখানকার স্থানীয় আর্কাইভগুলো থেকে বাংলাদেশসংশ্লিষ্ট কিছু তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় কি না। পাওয়া গেলে সেসব সংগ্রহ করে রাখবেন তাঁরা। সেখান থেকেই আসলে ‘গেরিলা ৭১’-এর শুরু।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস বা এপির কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আট থেকে দশ হাজার মিনিটের ফুটেজ আছে। সেই সময়টাতে তারা কিছু ফুটেজ প্রকাশ করছিল সর্বসাধারণের জন্য। সেসব থাকত তাদের অনলাইন আর্কাইভে। সেখান থেকে যখনই তাঁরা সুযোগ পেতেন, এসব নামিয়ে রাখতেন। তখন তাঁদের মূল আগ্রহের জায়গা ছিল ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের যেকোনো সংবাদ, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র সংগ্রহ করতেন।

২০০৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে স্থায়ীভাবে কানাডায় চলে যান রেবেকা। দূরত্ব বাড়লেও তাঁদের মধ্যে  যোগাযোগ ছিল নিয়মিত। এর মধ্যে রাকিব হোসেনও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনিও সিদ্ধান্ত নেন বাংলাদেশে ফিরে আসার। ২০১০ সালে তিনি দেশে ফিরেও আসেন। এভাবে চলে যায় তিন বছর।

২০১৩ সালে শাহবাগের আন্দোলনের এক-দেড় বছর পর তাঁরা খেয়াল করলেন, তরুণরা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আগ্রহ দেখিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি করছে। কিন্তু অনেকেই সেই সময়ের ইতিহাসকে গল্প বানিয়ে ফেলা শুরু করেছে। যা অনেক সময় বিকৃতির পর্যায়ে চলে যায়। এ অবস্থায় তাঁরা দুজন সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজেদের কাছে থাকা তথ্যগুলো সবার কাছে উপস্থাপন করবেন। আর এ জন্য বেছে নিলেন ফেইসবুকের মতো জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যম। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারিতে ‘গেরিলা ৭১’-এর যাত্রা শুরু। ফেইসবুক পেইজটির অনুসারীর সংখ্যা এখন এক লাখ ১৩ হাজার।

শুরুতে অবশ্য ‘গেরিলা ৭১’ বানান ইংরেজিতে ছিল, এখন বাংলায় করা হয়েছে। ফেইসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে এ জন্য বিশেষভাবে আবেদন করতে হয়েছিল। তিন মাস অপেক্ষার পর এই অনুমোদন পাওয়া যায়।

রাকিব ও রেবেকা দুইজন ভিন্ন দুইটি দেশে বাস করলেও এই ফেইসবুক পেইজটির দেখভাল করতেন নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করেই। নিয়ম করেই এই পেইজটিতে পোস্ট দিতেন তাঁরা। তবে পোস্ট দেওয়ার একটা বিষয় বিশেষভাবে মাথায় রাখতেন, তা হলো একাত্তরের এই দিনে কী ঘটেছিল। তার ওপর ভিত্তি করে মূলত পোস্টগুলো দেওয়া হতো।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে রেবেকার ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়ে। শারীরিক কারণেই তিনি এখন ‘গেরিলা ৭১’-এর সঙ্গে নেই। ফলে রাকিবকে একাই এই পেইজ পরিচালনা করতে হচ্ছে। প্রতিদিন সময় নিয়ে তথ্যবহুল লেখা তৈরি করেন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে।

এর মধ্যে রাকিব দেশে আসার পর একটি করপোরেট অফিসে চাকরি নেন। বেশ কিছুদিন করার পর সেটিও ছেড়ে দেন ২০১৭ সালে। এর পর থেকে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে এই পেইজ পরিচালনা করছেন তিনি। নিজের একার খরচে এই পেইজটি চালিয়ে আসছেন। আর এভাবেই বাকি জীবন করে যেতে চান। কেননা তিনি মনে করেন, আমাদের জাতীয় জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি হচ্ছে এই একাত্তর। এত সহজে একাত্তরকে হেরে যেতে দেবেন না।

পেইজটির লিংক : https://www.facebook.com/Guerrilla1971/

মন্তব্য