kalerkantho

মুড়ির ডিব্বার জয়যাত্রা

৯ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



মুড়ির ডিব্বার জয়যাত্রা

বাঁ দিক থেকে—ইমতিয়াজ আহমেদ প্রবাল, আবু বক্কর সিদ্দিক এবং ফাহিম আহমদ হামিম

 চার বছরের চেষ্টায় ‘মার্স রোভার’ বানিয়েছেন সিলেটের লিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থী। তাঁদের দাবি, রোবটটি মঙ্গলের মতো গ্রহসহ বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে সক্ষম। এরই মধ্যে দেশ-বিদেশের কয়েকটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে মার্স। বিস্তারিত জানিয়েছেন ইয়াহইয়া ফজল

 

‘মুড়ির ডিব্বা’ থেকে ‘এলইউ দুর্বার’

চাকাগুলোর ধারণক্ষমতা হবে বেশি; কিন্তু ওজনে হালকা। অনেক ভেবেচিন্তে ‘এলইউ দুর্বার’ (লিডিং ইউনিভার্সিটি দুর্বার)-এর সদস্যরা স্যানিটারি পিভিসি পাইপ কেটে বানালেন চাকার রিং। তাতে সাইকেলের টায়ার কেটে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিলেন। ব্যস, এভাবে একে একে তৈরি হয়ে গেল ছয়টি চাকা। মঙ্গল গ্রহের এবড়োখেবড়ো স্থলভাগের মতো ভূমিতে চলার উপযোগী নিজেদের যান ‘মার্স রোভার’ তৈরির বর্ণনা দিচ্ছিলেন ফাহিম আহমদ হামিম। তিনি সিলেটের লিডিং ইউনিভার্সিটির দল ‘দুর্বার’-এর অন্যতম সদস্য।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’র মঙ্গল গ্রহ নিয়ে কাজ করা ‘মার্স সোসাইটি’র প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পৃথিবীর সেরা দুটি দলের একটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে তাদের দল এলইউ দুর্বার। শুধু এই অর্জনই নয়, একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাসহ দেশের অন্তত ২০টি প্রতিযোগিতায় সাফল্য পেয়েছে দলটি।

এতটা সাফল্য আসবে, শুরুতে হয়তো চিন্তা করেননি দলের সদস্যরা। দলের নাম নির্ধারণই যেন সে কথা বলে। হামিম জানালেন, “শুরুতে দলের নাম ছিল ‘মুড়ির ডিব্বা’। প্রথমে যে রোবটটি বানিয়েছিলাম, তা দেখতে ছিল মুড়ির টিনের মতো। সেই থেকে দলের নামই রেখে দিই মুড়ির ডিব্বা। যখন আমরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ শুরু করলাম, তখন ভিনদেশিদের মুড়ির ডিব্বার অর্থ বোঝাতে রীতিমতো ঘাম ঝরাতে হতো। তা-ও তাঁরা পুরোপুরি বুঝতে পারতেন না। পরে নাম বদলের সিদ্ধান্ত নিই আমরা। সেই থেকে এলইউ দুর্বার হয়ে যাওয়া।”

 

মার্স রোভার রোবট

মার্স রোভারের নির্মাতারা জানান, “মঙ্গল গ্রহে অভিযানের মতো কাজের ক্ষেত্রে মানুষের বিকল্প রোবটযান এই ‘মারস রোভার রোবট’। ছয় চাকার এই রোভার যাতে অসমতল, এবড়োখেবড়ো পথে অনায়াসে এগিয়ে যেতে পারে, সে জন্য তাতে ব্যবহার করা হয়েছে ‘রোকারবগি ম্যাকানিজম’। ৪০ কেজি ওজনের মার্স রোভার রোবট হাত দিয়ে ১৫ কেজি পর্যন্ত ওজনের জিনিসপত্র তুলে ফেলতে পারে। পাথর, মাটি, বালি যেমন তুলতে পারে, তেমনি খননকাজও করতে পটু। এতে সমন্বয় করা হয়েছে গ্যাস, টেম্পারেচার, সোলার, ম্যাজারিং, ওয়েট সেন্সর প্রযুক্তির। এ ছাড়া অভিনব ধারণায় তৈরি চাকাগুলো বোদ্ধাদের নজর আলাদাভাবে কেড়েছে।” 

 

মুম্বাই থেকে চেন্নাই

নাসার প্রতিযোগিতায় তাঁদের অংশগ্রহণের পেছনে রয়েছে আরেকটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সাফল্য। সেই গল্পই আগে বললেন হামিম, “২০১৭ সালে বাংলাদেশের ‘ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ইএসএবি) এবং ভারতের ‘আইআইটি’ যৌথভাবে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। বাংলাদেশ রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে। সেখানে আমরা সেরা হয়ে ভারতে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাই। মুম্বাইয়ের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা আইআইটির ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত সেই প্রতিযোগিতার ফাইনালে পৌঁছে যাই। কিন্তু সেখানে হেরে যাওয়ায় দ্বিতীয় হই।”

বলা চলে, মুম্বাইয়ের সে প্রতিযোগিতার হাত ধরেই নাসার প্রতিযোগিতায় ‘এলইউ দুর্বার’-এর অংশগ্রহণের সুযোগ আসে। ফাহিম বলেন, ‘মুম্বাইয়ের প্রতিযোগিতার আয়োজকরা আমাদের পারফরম্যান্স দেখে অনেক প্রশংসা করেছিলেন তখন। পরে তাঁরাই ই-মেইল মারফত নাসার প্রতিযোগিতা ‘ইন্ডিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ’-এ অংশগ্রহণের পরামর্শ দেন আমাদের। এরপর প্রায় তিন মাস ধরে তিনটি ধাপে উত্তীর্ণ হলে কর্তৃপক্ষ আমাদের মূল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানায়। এরপর প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে হাজির হই ভারতের চেন্নাইয়ের ‘ভেলর ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (ভিআইটি)’। তবে সেবার দলের সদস্যসংখ্যা ছিল ছয়। ভারতের আইআইটি প্রতিযোগিতার দলের আবু বক্কর সিদ্দিক, আমি ও ইমতিয়াজ আহমেদ প্রবাল ছাড়াও এ দলে অন্তর্ভুক্ত হন আল শাহরিয়ার মাহমুদ, সানজিদা চৌধুরী, সৈয়দা নুসরাত জাহান। ভেলরে অনুষ্ঠিত সেই প্রতিযোগিতায় ২০টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। পোল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, নেপালের দল ছাড়াও স্বাগতিক ভারতের ১০টি দল অংশ নেয়। তার মধ্যে ভিআইটির নিজস্ব দলই ছিল দুটি। বাংলাদেশ থেকে লিডিং ইউনিভার্সিটির ‘এলইউ দুর্বার’, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘টিম অগ্রদূত’, ইসলামী ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ‘টিম অভিযাত্রী’, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ‘মঙ্গলতরি’ এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ‘মার্স রোভার এনএসইউ’সহ পাঁচটি দল অংশ নেয়।

 

একটুর জন্য রানার্স-আপ

নাসার সেই প্রতিযোগিতায় নিয়ম ছিল ৫০০ মিটার দূরে গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে মার্স রোভারকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে কে কত দক্ষতা দেখাবে, তার ওপর নির্ভর করবে ফলাফল। লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে রোবটটির কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি পর্যবেক্ষণও করতে হবে। চারটি ধাপে কাজগুলোতে কোন দল কতটা দক্ষতা দেখাবে, তার ওপর দেওয়া হবে নাম্বার। প্রথম ধাপ ছিল সায়েন্স টাস্ক। এই ধাপে নির্দিষ্ট স্থান থেকে মাটি-পাথরের নমুনা সংগ্রহ করবে মার্স রোভার রোবট। এরপর ওজন মাপার যন্ত্রের সাহায্যে ওজন মাপা, সংগৃহীত নমুনা ওজন অনুযায়ী এয়ারটাইট কনটেইনারে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা, যাতে অন্য কিছুর মিশ্রণ না হয়। এই ধাপের পর দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে মেইনটেন্যান্স টাস্ক। তৃতীয় ধাপে ইকুইপমেন্ট সার্ভিসিং টাস্ক—অর্থাৎ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি শনাক্ত করা এবং তা মার্স রোভারের সঙ্গে থাকা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নির্ধারিত পাত্রে গুছিয়ে রাখা। সর্বশেষ ধাপে অটোনোমাস টাস্ক—অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত স্থানগুলো থেকে বল সংগ্রহ করে নিয়ে আসা।

প্রথম চারটি ধাপের তিনটিই শতভাগ সফলতার সঙ্গে সমাপ্ত করতে পেরেছিল ‘এলইউ দুর্বার’। হামিম বলেন, ‘শেষের ধাপে ছিল বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রাখা পাঁচটি বল স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করে সংগ্রহ করে নিয়ে আসা। এই ধাপে আমাদের মার্স রোভার চারটি বল সংগ্রহ করে। একটা বল কম সংগ্রহের কারণে পিছিয়ে পড়েছি, বিষয়টি সে রকম নয়। কারণ এ রকমটি বাকি দলগুলোর ক্ষেত্রেও ঘটেছে। অনেকে প্রথম ধাপে পিছিয়ে ছিল। আমরা সমস্যায় পড়েছি শুরুতে যোগাযোগ স্থাপনের সময়। অর্থাৎ স্থানীয় ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে হতো। আমরা শুরুতে ২.৪ গিগাহার্জ ফ্রিকোয়েন্সি ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করেছিলাম। আমাদের মার্স রোভার যেখানে ছিল, তার আশপাশে আরো অনেকে এই ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করছিলেন, ফলে আমাদের যোগাযোগটা দুর্বল হয়ে যায়। এতে লাইভ ভিডিও বাফারিং করে। যদিও কিছুক্ষণের মধ্যে বিষয়টি ধরতে পেরে ফ্রিকোয়েন্সি বদলে ৫.৮-এ নিয়ে আসি। এরপর আর কোনো সমস্যা না হলেও শুরুর এই সমস্যাই আমাদের পিছিয়ে দেয়। পয়েন্ট কমে যায় আমাদের।’

সম্মানজনক এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের লিডিং ইউনিভার্সিটির দল ‘এলইউ দুর্বার’ রানার্স-আপ হয়। যদিও চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রত্যাশা ছিল তাদের। সেই অপ্রাপ্তি এখনো পোড়ায় তাদের।

 

শুরুটা ছিল অমসৃণ

শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিল না তাদের জন্য। দলের অন্যতম সদস্য ইমতিয়াজ আহমদ প্রবাল বলেন, “শুরুর দিকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে শুধু হেরেছিই। প্রথম দিকে অন্তত ২৫টি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েও সাফল্যের মুখ দেখিনি। তবে হালও ছাড়েননি দলের কেউ। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে আমরা প্রথম সাফল্যের দেখা পাই। চট্টগ্রামের সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে আয়োজিত ‘সাউদার্ন রোবটিক কনটেস্ট ২০১৬’তে অংশ নিয়ে আমরা ১৭-১৮টি দলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হই।”

এই জয়ের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এরপর এখন পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত প্রতিযোগিতায় সাফল্য এসেছে। আছে দেশের বাইরেও একাধিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য।’

তাঁদের জয়যাত্রা দেখে কানাডীয় ও ইউরোপীয় রোভার চ্যালেঞ্জ নামে দুটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে কানাডা ও পোল্যান্ড থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেসব প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি এলইউ দুর্বারের।

শিক্ষার্থীদের এমন সাফল্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হলেও আমরা তাদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। যদি বড় কোনো স্পন্সর পাওয়া যায়, তাহলে হয়তো আরো বড় পরিসরে কিছু করা সম্ভব হবে।’

 

নতুন মার্স রোভার

প্রথমটির চেয়ে নতুনটি আকারে ছোট, ওজন কম, বেশি শক্তিশালী এবং মঙ্গল গ্রহের এবড়োখেবড়ো মাটিতে সহজে চলাফেরা করতে পারবে। ওজন ৫০ কেজি থেকে কমে ৪০ কেজিতে এসেছে। আগেরটির রোবটিক হ্যান্ড যেখানে ১০ কেজি পর্যন্ত ওজন তুলতে পারত, এখন সেটি পারে ১৫ কেজি। আগেরটি যেখানে ৫০০ মিটার দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যেত, এখন দুই কিলোমিটার দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে নতুন মার্স রোভারকে। শুধু তা-ই নয়, এইচডি লাইভ স্ট্রিমিং ভিডিও দেখাতে পারে নতুনটি।

মন্তব্য