kalerkantho

ভবিষ্যৎ বলবে গাছ

পুরনো গাছের কাঠ থেকে দুই হাজার ৬০০ বছর আগের এক নির্দিষ্ট অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নির্ণয়ের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন জাপানের একদল গবেষক। তাঁরা মনে করেছেন, গাছের নমুনা থেকেই বলে দেওয়া যাবে একটি এলাকার জলবায়ুর পূর্বাভাস। বিস্তারিত মিজানুর রহমানের কাছে

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ভবিষ্যৎ বলবে গাছ

আবহাওয়া ঐতিহাসিকভাবে মানবসভ্যতার বিকাশকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। পরিমিত বৃষ্টিপাত হওয়া অঞ্চলে সভ্যতা যেমন গড়ে উঠেছে, তেমনি উচ্ছেদও হয়েছে অতিবৃষ্টি ও অনাবৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল থেকে। অতীতের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া এই বৃষ্টিপাতের তথ্য উদ্ঘাটনে সফল হয়েছেন জাপানের একদল গবেষক। তাঁরা গাছের গুঁড়ির অক্সিজেন আইসোটোপের পরিমাণ থেকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁদের প্রক্রিয়ায় বিগত আড়াই হাজার বছরের বৃষ্টিপাতের রেকর্ড বের করা সম্ভব হয়েছে। এটিকে মানুষের জীবনের ওপর আবহাওয়া ও বৃষ্টিপাতের প্রভাবের ঐতিহাসিক নকশাও বলা চলে। তাঁদের দাবি, মডেলটি নির্ভুলভাবে নির্দিষ্ট সময়ে কোনো অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নির্ণয় করতে সক্ষম। এক দশক ধরে বিষয়টি নিয়ে কাজ করে আসছেন জাপানি পেলিওক্লাইমেটোলজিস্ট (বিশ্বের আবহাওয়া পরিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন যে বিজ্ঞানী) তাকাশি নাকাতসুকা। তাঁর সঙ্গে এই দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন ৬৮ জন গবেষক।

 

যেভাবে সম্ভব হয়েছে

গবেষণার জন্য ‘হিনোকি’ নামের একটি গাছ বেছে নেন গবেষকরা। বিভিন্ন বয়সের হিনোকি গাছের ৬৮টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পুরনো গাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে মাটির নিচে চাপা পড়া গাছের গুঁড়ি, কফিনের বোর্ড এবং মন্দিরের কাঠ থেকে। নমুনার এসব কাঠের বয়স ১০০ থেকে ১০০০ বছরের মতো। গাছটির কাঠের মধ্যে থাকা অক্সিজেন আইসোটোপের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে গাছটি কোন পরিবেশে বেড়ে উঠেছে তা অনুমান করা যায়। যেমন—ভেজা মৌসুমের তুলনায় শুষ্ক মৌসুমে কাঠে অনেক বেশি অক্সিজেন আইসোটোপের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে কাঠের মধ্যে অক্সিজেন আইসোটোপের উপস্থিতি পর্যালোচনা করে গাছটির জীবনকালে বায়ুমণ্ডলের শুষ্কতা অনুমান করা যায়। নাকাতসুকা মনে করেন, এটি অনেক সরল হলেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আধুনিক আবহাওয়াবিজ্ঞানও এই তত্ত্বের প্রমাণ পেয়েছে। এই তত্ত্ব ব্যবহার করে গত গ্রীষ্মের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, গবেষকরা এই পদ্ধতিতে আড়াই হাজার বছরের একটি টাইমলাইনও তৈরি করেছেন, যাকে বলা হচ্ছে মাস্টার ক্রনোলজি। এই কালক্রমে থেকে ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে শুরু করে ২০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কোন শতাব্দীতে জাপানের পরিবেশ-প্রকৃতি কেমন ছিল তা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।

 

কী কাজে লাগবে

গবেষকরা তাঁদের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখেছেন যে প্রতি ৪০০ বছরে জাপানে বৃষ্টিপাতের একটি মারাত্মক তারতম্য তৈরি হয়। এটি যেমন ভালো ফল বয়ে আনে, তেমনি খারাপ ফলও বয়ে আনে। ইতিহাস থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৩৫০ খ্রিস্টাব্দ সময়কালে জাপানে বেশির ভাগ মানবসতি ছিল ইয়োদা নদীকে কেন্দ্র করে। শুরুর দিকে উর্বর মাটিতে নদীর আশপাশে চলছিল সভ্যতার বিকাশ। তবে ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শুরু হয় পরিবর্তন। প্রবল বৃষ্টিপাত ও বন্যার ফলে মানুষ সেসব স্থান থেকে ধীরে ধীরে উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে চলে যেতে থাকে। তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দী নাগাদ উপত্যকা এলাকায় আর কোনো মানুষই অবশিষ্ট ছিল না। সপ্তম শতাব্দীতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমলে ধীরে ধীরে মানুষ আবার উপত্যকার দিকে ফিরে আসে। ওই সময়ই জাপান রাষ্ট্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। এভাবে বৃষ্টিপাতের তারতম্যের কারণে সমাজে নানা পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক এসব পরিবর্তন অনুমানের জন্য এই মডেলটি বেশ কাজে দেবে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। সেই সঙ্গে আসন্ন জলবায়ু পরিবর্তনের নানা ধরনের প্রভাব আগেই অনুমান করা সম্ভব হবে।

মন্তব্য