kalerkantho


‘গভীর সমস্যা’ ডিপফেইক

উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে জাল ছবি ও ভিডিও তৈরি করার প্রযুক্তি ডিপফেইক। অনলাইনে ঘুরে বেড়াচ্ছে এ ধরনের ভিডিও। সমস্যা, চেনার উপায়, করণীয় ইত্যাদি নিয়ে লিখেছেন আল-আমিন দেওয়ান

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



‘গভীর সমস্যা’ ডিপফেইক

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

► সকালবেলা আচমকা ঘুম থেকে উঠে শুনলেন পুলিশ আপনাকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে। অভিযোগ, গত রাতে একজনকে গুলি করেছেন আপনি। খুনের এই ভিডিও পুলিশের কাছে আছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আপনি গুলি করছেন। সব দেখে আপনি বাকরুদ্ধ। এ কী করে সম্ভব!

► ফেইসবুক স্ক্রল করতে করতে এক ভিডিও দেখে চমকে গেলেন ভদ্রলোক। একি! ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে তিনি কোনো জঙ্গলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে অস্ত্র নিয়ে উল্লাস করছেন। তিনি তো কোনো দিন জঙ্গলেই যাননি। তাহলে!

এসব ঘটনার কোনোটিই আসলে সত্য নয়। তবে নিখুঁত ও বাস্তব ভিডিওগুলো আপনার বিশ্বাস ও বাস্তবতাকে টলিয়ে দেবে। এটাই ডিপফেইক।

টেলিনর রিসার্চের ভাইস প্রেসিডেন্ট বিয়র্ন হ্যানসেন বলেছেন, ডিপফেইক কনটেন্টগুলো এতটাই অত্যাধুনিক হবে যে ডিজিটাল বিশ্বের কোনটা আসল কিংবা কোনটা নকল তা আলাদা করা কঠিন হয়ে যাবে। উন্নত অ্যালগরিদম সহজেই জাল ছবি ও ভিডিও তৈরি করতে পারবে। তিনি বলেন, ২০১৯ সালে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, অপারেটর এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ডিপফেইক কনটেন্ট কমাতে কাজ করবে এবং এ নিয়ে ব্যাপক পরিসরে বিশ্বব্যাপী গণসচেতনতামূলক নানা কর্মসূচির আয়োজন করতে বাধ্য হবে।

 

হচ্ছে কিভাবে?

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা অ্যাট বার্মিংহামের কম্পিউটার বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. রাগিব হাসান বলেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এবং ডিপ লার্নিংকে কাজে লাগিয়ে নকল ভিডিও বানানোর প্রযুক্তি এই ডিপফেইক। আগে এগুলো বানাতে দক্ষতা লাগত, লাগত শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারের মতো ক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্র। এখন ডেস্কটপ কম্পিউটারই যথেষ্ট। কাজটাকে সহজ করার জন্য ফেইকঅ্যাপ নামের ডেস্কটপ অ্যাপও বের হয়ে গেছে। প্রয়োজন শুধু যার নকল ভিডিও বানানো হবে তার অনেকগুলো ছবি। ছবিগুলো সিস্টেমে ঢুকিয়ে দিলে চেহারা কেমন তা শিখে নেয় এআই ও ডিপ লার্নিং সিস্টেম। পরে যে ভিডিওতে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির চেহারা চান, সেখানে মুখটা পাল্টে চেহারাটা বসিয়ে দিলেই হলো। যেন আসলেই সেই মানুষটিকে দেখবে সবাই।

সাধারণত ডিপফেইক ভিডিও তৈরি করতে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে নেওয়া কমপক্ষে ৫০০ ছবি সংগ্রহ করা হয়। এরপর তা দিয়ে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সুপার ইম্পোজ করা ভিডিও ক্লিপ বানানো যায়।

এখন অনলাইন বাজারে ফেইক ভিডিও তৈরিতে কয়েক ধরনের সফটওয়্যার পাওয়া যায়। সিএনএন সোশ্যাল ডিসকভারি টিমের প্রযোজক ডনি ও’ সুলিভান বলছেন, হয়তো তাড়াতাড়িই বাজারে আসবে অডিও ম্যানিপুলেশনের টুলও। এই অডিও টুল হয়তো পুরো পরিস্থিতিকে আরো বিপজ্জনক করে তুলবে। সেখানে যে ব্যক্তি যে কথা বলেননি অথচ তাঁর কণ্ঠে সে কথার বিশ্বাসযোগ্য অডিও ভিডিওতে জুড়ে দিলেন। আবার ভিডিও ছাড়াও অডিও তৈরি করে ফেলা গেল।

 

আলোচিত কিছু ডিপফেইক

► ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্যারিসে জলবায়ু চুক্তি নিয়ে সমালোচনামূলক মন্তব্য করেছেন— ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ রকম একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। তির্যক মন্তব্যসহ ফেইসবুক-টুইটারে ভিডিওটি শেয়ার হয় কয়েক লাখ বার। কিন্তু কয়েক দিন পর ভিডিওটির আপলোডার জানান, মজা করার জন্য ডিপফেইক প্রযুক্তি দিয়ে ভিডিওটি তৈরি করেছেন তিনি। প্রযুক্তিতে জানাশোনা অনেক মানুষও ভিডিওটি যে ভুয়া তা শনাক্তে হিমশিম খেয়েছেন।

► কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভুয়া খবর সম্পর্কে একটি পাবলিক সার্ভিস অ্যানাউন্সমেন্ট দিচ্ছেন এমন ভিডিও চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আসলে ওই ভিডিওতে চলচ্চিত্র নির্মাতা জর্ডান পিলের শরীরে ওবামার মুখ বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

► ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ওয়ান্ডার উইমেন অভিনেত্রী গ্যাল গাদতের ভুয়া ভিডিও রেডিটে প্রকাশ করা হয়।

 

প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক ও প্রশ্নপত্র  ফাঁসের মতো ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ভুয়া খবর ও ফটোশপের মাধ্যমে ভুয়া ছবি দিয়ে অস্থিরতা তৈরির উদাহরণ দেখা যায়। আগেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া ছবি দিয়ে সাম্প্রদায়িক উসকানি ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ডিপফেইক ভিডিও ঝুঁকির কারণ হতে পারে। ইতিমধ্যে ডিজিটাল মাধ্যমে নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার জানিয়েছেন, ‘নাগরিকদের সাইবার ওযার্ল্ডের নিশ্চিত সুরক্ষার সব ব্যবস্থা করব। ডিজিটাল সিকিউরিটি এজেন্সি গত বছর বানানো হয়েছে। যেটা এখন পুরো গতিতে কাজ করছে। নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য প্রযুক্তির যত ধরনের অ্যাডভান্সমেন্ট এসেছে আর আসবে সেগুলো এই এজেন্সির মাধ্যমে কাজে লাগানো হবে।’

 

সামাজিক মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা

ডিপফেইক প্রযুক্তির পর্নো ছবি ও ভিডিও প্রচার নিষিদ্ধ করে দেয় প্রযুক্তিবিষয়ক ফোরাম ওয়েবসাইট রেডিট। সাইটটি ডিপফেইক নামে বানানো ভুয়া ভিডিও প্রচারের জন্যই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

তার আগে টুইটার, জিএফওয়াইক্যাট ও গিটহাব ডিপফেইক ভিডিও আপলোডের ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

 

ধরতে কী প্রযুক্তি?

ডিপফেইক ভিডিও তৈরির প্রযুক্তি এতই নতুন যে এটি ধরতে ভুয়া তথ্য যাচাইকারী সংগঠনগুলো রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। সম্প্রতি গুগলের ঘোষণায় জানা যায়, তারা ডিপফেইক ভিডিও শনাক্তের জন্য একটি টুল তৈরি করছে।

এর কার্যক্ষমতা কেমন বা কবে আসবে জানা যায়নি। ফেস ফরেনসিকস নামে একটি প্রগ্রাম তৈরি করেছে মিউনিখের ভিজ্যুয়াল কম্পিউটিং ল্যাবের একটি দল। যদিও এটি একটি বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া সব জায়গায় সফল নয়। জিফিক্যাট ভুয়া ভিডিও শনাক্ত করার ক্ষেত্রে একটি পদ্ধতি এনেছে। যেখানে নিজেদের সাইটে ডিপফেইক ভিডিও খুঁজতে তারা এআই টুল ব্যবহার করছে। এটি ভিডিও থেকে মুখ বাদ দিয়ে অন্য ভিডিওর সঙ্গে শুধু ব্যাকগ্রাউন্ড মিলিয়ে দেখে। ডিপফেইকের বিপরীতে এই পদ্ধতি পুরোপুরি কার্যকর নয়।

ভেরিপিংলে নামে একটি প্রগ্রাম তৈরি করেছে মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল উদ্ভাবক। প্রগ্রামটিতে ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে স্মার্টফোন ও ক্যামেরায় তোলা ছবির মূল ফাইলে একটি ফুটপ্রিন্ট দিয়ে দেয়। এখানে ব্লকচেইনের সুবিধা হচ্ছে, যা-ই ঘটুক ফাইলের ঐতিহাসিক তথ্য ঠিক থাকবে। এটি এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ প্রথমবারের মতো একটি সফটওয়্যার টুলস তৈরি করেছে, যেটি ভিডিওটি অন্য কারো ধারণ করা কি না বা ভিডিওটি নিখুঁতভাবে অন্য ভিডিওর ওপর বসানো হয়েছে কি না ধরতে পারবে। এটিও তারা অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবহার করছে।

ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা বলেছেন, ডিপফেইক ভিডিও তৈরির সফটওয়্যার লাইসেন্সিংয়ের আওতায় আনা এবং তার ব্যবহার সীমিত করা এটি ঠেকানোর একটি উপায় হতে পারে।

 

তাহলে উপায়?

যত দিন কার্যকর প্রযুক্তি সাধারণের কাছে না পৌঁছে তত দিন ডিপফেইক ভিডিও কোনটি বুঝতে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল করতে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

► ভিডিওর মুখভঙ্গি এবং নড়াচড়া দেখা। ভিডিওতে আলোর কম্পন বা ঝিলিক বা ফ্ল্যাশ দেখা।

► চেহারা বা মুখের দিকটায় অস্পষ্টতা খেয়াল করা, অস্বাভাবিক বা অপ্রাসঙ্গিক ছায়া বা আলো, অস্বাভাবিক ও অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া বিশেষ করে মুখ, চোয়াল ও ভ্রুতে, ত্বকের রং এবং শরীরের গড়নে অসামঞ্জস্য দেখা, কথার সঙ্গে মুখের, ঠোঁটের নড়াচড়ায় না মেলা।

► ভিডিওকে ধীরগতিতে অথবা থামিয়ে থামিয়ে কয়েকবার দেখা। প্রতিটি ফ্রেম ধরে ধরে দেখতে হবে।

► ভিডিওটি কাদের ধারণ করা? কারা ওয়েবে প্রকাশ করেছে? কোন ওয়েব মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে? এটা শেয়ার করা হয়েছে কার কার সঙ্গে, একই ব্যক্তি কি বারবার শেয়ার করেছে, নাকি অনেকে ইত্যাদি বিষয়ে কোনো না কোনো অসংগতি হয়তো চোখে পড়বে।

► জনপ্রিয় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অন্য ভিডিওর সঙ্গে মুখভঙ্গি মেলানো।



মন্তব্য