kalerkantho

প্রযুক্তিতে আলোচিত ২০১৮

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



প্রযুক্তিতে আলোচিত ২০১৮

২০১৮ সালে দেশের প্রযুক্তি অঙ্গনে যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু মাত্রা। সুযোগ হয়েছে হালনাগাদ প্রযুক্তিসেবা দেখার ও ব্যবহারের। এমনই সব বিষয় নিয়ে প্রতিবেদনটি লিখেছেন দেওয়ান নীল

 

মহাকাশে বাংলাদেশ

১২ মে দিবাগত রাত ২টা ১৪ মিনিটে (বাংলাদেশ সময়) যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ফ্যালকন-৯ নামে রকেটে চেপে মহাকাশের পথে উড়ে যায় দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১। উৎক্ষেপণ স্থান থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে যায় এই স্যাটেলাইট। কক্ষপথে স্যাটেলাইটটি সম্পূর্ণ চালু হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন গাজীপুর এবং রাঙামাটির বেতবুনিয়ায় হস্তান্তর করা হয়। উৎক্ষেপণের ছয় মাসের মাথায় নভেম্বরে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ বুঝে নেয় বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কম্পানি লিমিটিড (বিসিএসসিএল)। কক্ষপথে স্যাটেলাইটটির ফুয়েল লাইফ সাড়ে ১৫ বছর।

বর্তমানে সময়, ডিবিসি নিউজ, ইনডিপেনডেন্ট, এনটিভি, একাত্তর, বিজয় বাংলা, বৈশাখী, বিটিভি ওয়ার্ল্ড, সংসদ বাংলাদেশ এবং বিটিভি চট্টগ্রাম—এই ১০টি চ্যানেল বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছে।

স্যাটেলাইটটিকে ব্যাবসায়িকভাবে সফল করতে ইতিমধ্যে থাইল্যান্ডের কম্পানি থাইকমের সঙ্গে চুক্তি করেছে বিসিএসসিএল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ব্যবসার দিকটি তারাই দেখবে। সাত বছরের মধ্যে এ খরচ উঠবে আসবে বলে হিসাব করেছে উৎক্ষেপণকারী সংস্থা বিটিআরসি। দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা দিতে ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট।

 

বছরের শুরুতেই মিলল মন্ত্রী

২০১৪ সালের অক্টোবরে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পর এই মন্ত্রণালয়ে তিন বছরের বেশি সময় ধরে আর মন্ত্রী দেওয়া হয়নি। এই সময়ে মন্ত্রণালয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হাতে ছিল। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় তথ্য-প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বারকে। এ সময় মন্ত্রণালয়ের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে থাকা প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমকে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়। অন্য বিভাগ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে জুনাইদ আহেমদ পলককে রেখে দেওয়া হয়। ৬৮ বছর বয়সী মোস্তাফা জব্বার সংসদ সদস্য না হওয়ায় তাঁকে মন্ত্রিসভায় টেকনোক্র্যাট হিসেবে নেওয়া হয়েছে। মোস্তাফা জব্বার যখন মন্ত্রী হন তখন তিনি বেসিসের সভাপতি ছিলেন।

 

ইনফো সরকার-৩ বাস্তবায়ন

ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে সরকারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ডেভেলপমেন্ট অব আইসিটি ইনফ্রা-নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট বা ইনফো সরকার প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয় এপ্রিলে। দুই হাজার ৬০০ ইউনিয়নকে ফাইবার অপটিক কেবল সংযোগের আওতায় আনা ও দেশের সব ডিজিটাল সেন্টারে (ইউডিসি) বিপিও সেন্টার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে এ প্রকল্প শুরু হয়েছে। অনলাইনে পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম স্বয়ংক্রিয় করা ও ৯৯৯-এর সেবার জন্য এক হাজার ২০০ পুলিশ স্টেশনে ফাইবার অপটিক সংযোগ স্থাপনও রয়েছে লক্ষ্যে।

 

৫৮৭ কলেজে বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই

নভেম্বরে সারা দেশে ৫৮৭ সরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে বিনা মূল্যে উচ্চগতির ওয়াই-ফাই দেওয়া শুরু করেছে সরকার। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে রয়েছে ১৪৩টি, ময়মনসিংহে ৩৫টি, চট্টগ্রামে ১০৭টি, বরিশালে ৪৫টি, খুলনায় ৮৩টি, রাজশাহীতে ৮৫টি, রংপুরে ৫৬টি এবং সিলেট বিভাগে ৩৩টি। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১০ এমবিপিএস গতির ব্যান্ডউইথ পাচ্ছে।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিটিআরসি এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এ জন্য সরকার খরচ করছে ৪৫ কোটি টাকা।

 

ভ্যাট কমল ইন্টারনেটে

ইন্টারনেটের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমানোর দাবি কয়েক বছর ধরে থাকলেও ২০১৮ সালে এসে এটি কমে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জাতীয় সংসদে সর্বশেষ বাজেট বক্তৃতায় ইন্টারনেটের ওপর বর্তমানে থাকা ১৫ শতাংশ ভ্যাটের ১০ শতাংশই ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করেন। অর্থমন্ত্রী তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর সেবাকে অধিকতর সহজলভ্য করার লক্ষ্যে ইন্টারনেট সেবার ওপর প্রযোজ্য ভ্যাট ১৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন এবং প্রস্তাবটি সংসদে পাস হয়। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারে ভ্যাট এই এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনার পরও যখন খুব একটা সুফল মিলছিল না তখন পাইকারি পর্যায়ের সরবরাহ লাইনেও একই হারে ভ্যাট কমানো হয়। আসলে গ্রাহক পর্যায়ে কমলেও ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিরিয়াল কেবল বা আইটিসি, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে বা আইআইজি এবং ন্যাশন ওয়াইড টেলিকমিউনিকেশনস নেটওয়ার্ক বা এনটিটিএন পর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে গিয়েছিল। এসব ভ্যাটের প্রভাব গ্রাহকের ওপরে চলে আসছিল। এমন পরিস্থিতিতে বছরের সর্বশেষ মাস ১ ডিসেম্বর থেকে সব পর্যায়ের ভ্যাট ৫ শতাংশ করে দেয় সরকার।

 

বিনিয়োগে ভরপুর বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি

২০১৮ সালে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে দেশি-বিদেশি খ্যাতনামা কম্পানিগুলো বিনিয়োগের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। সিটির ‘এ’ ব্লকের ১ নম্বর প্লটে দেড় একর জায়গা বরাদ্দ নেয় রবি আজিয়াটা। ২ দশমিক ২৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে তারা। চাকরি দেওয়া হবে ১১০ জনের। রবি এখানে ডিজিটাল সার্ভিস ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি করবে।

দুই এবং তিন নম্বর প্লটে দুই একর করে জায়গা নেয় নাজডাক টেকনোলজিস ও বিজেআইটি। নাজডাক বিনিয়োগ করবে ৬১ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার। তারা মিনি পিসি অ্যাসেম্বলিং, টেকনিক্যাল ট্রেনিং এবং সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করবে। তিন হাজার ৬০০ জনের কর্মসংস্থান হবে এখানে।

বিজেআইটি বিনিয়োগ করবে ১০ মিলিয়ন ডলার। তাদের চার হাজার লোকবল দরকার হবে। এখানে সফটওয়্যার, মোবাইল অ্যাপ, আইওটি, ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন, অটোমেশন টেস্টিং সার্ভিসসহ আইটি কনসালট্যান্সিও করবে বিজেআইটি।

চার ও পাঁচ নম্বর প্লটে তিন একর করে পেয়েছে কেডিএস গ্রুপ এবং ইন্টারক্লাউড। কেডিএস বিপিও, সফটওয়্যার ডেভেলমেন্ট, ডাটা সেন্টার করবে। তাদের বিনিয়োগ ১০ মিলিয়ন ডলার। এখানে কর্মসংস্থান হবে পাঁচ হাজার লোকের। ইন্টারক্লাউড বিনিয়োগ করবে ২১ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার। তাদের কাজ সফটওয়্যারে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে ৭৭০ জনের।

ছয় নম্বর প্লটে দুই একর জায়গায় এসেছে জেনেক্স। তারা ডাটা সেন্টার, টিওটি রিসার্চ, আউটসোর্সিং করবে। তাদের বিনিয়োগ ১০ মিলিয়ন ডলার। লোকবল নেবে ১১০ জন।

সাড়ে তিন একর জায়গার আট নম্বর প্লটে ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট করবে ফেয়ার ইলেকট্রনিকস। তারা ল্যাপটপ এবং কমিউনিকেশন ডিভাইস তৈরি করবে। তাদের বিনিয়োগ ১০ মিলিয়ন ডলার। ২৫০ জনের চাকরি হবে সেখানে।

‘বি’ ব্লকের ১১ নম্বর প্লটে আছে বিজনেস অটোমেশন। তারা দুই একর জায়গা পেয়েছে। তাদের বিনিয়োগ পাঁচ মিলিয়ন ডলার এবং কর্মসংস্থান ১০০ জন।

১২ নম্বর প্লটে দুই একর জায়গায় জেআর এন্টারপ্রাইজ। কম্পানিটি এখানে ডাটা ও ট্রেনিং সেন্টার, ই-ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নিয়ে কাজ করবে। তাদের বিনিয়োগ ১০ মিলিয়ন ডলার। তারা এখানে ১১০ জনকে চাকরি দেবে। একই মাসে আরো ৯টি কম্পানি এই সিটিতে জায়গা নেয়। যেখানে জায়গা বরাদ্দের আবেদনের সময় কম্পানিগুলো প্রাথমিক প্রস্তাবে সব মিলে এক হাজার ৫২৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে বলে জানিয়েছে। তাদের কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পুরোদমে চালু হলে কর্মসংস্থান হবে ১৫ থেকে ২০ হাজার ব্যক্তির। এসব কম্পানির মধ্যে ডাটা সফট ২ দশমিক ৭৫ একর, আমরা হোল্ডিংস ৩ দশমিক ৫০ একর, এসবিটেল এন্টারপ্রাইজ ৫ দশমিক ১৬ একর, ইউনিয়ন বাংলাদেশ অ্যান্ড সিসটেক ডিজিটাল ৩ দশমিক ৩৫ একর জায়গা পেয়েছে। ডেভনেট ও স্পেকট্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম পেয়েছে দুই একর করে। এক একর করে পেয়েছে মিডিয়াসফট ডাটা সিস্টেম ও ইউওয়াই সিস্টেম।

এ ছাড়া বাংলাদেশের হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ করতে জাপান, চীনসহ বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা আগ্রহ দেখিয়েছেন।

মন্তব্য