kalerkantho


হুইলচেয়ারে ‘স্মার্ট’ গতি

স্মার্ট হুইলচেয়ার তৈরি করেছেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হক ও আনিকা আনজুম। প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি প্রযুক্তিটি সেরা হয়েছে একাধিক প্রতিযোগিতায়। প্রযুক্তিটি আরো উন্নত করার কাজ চলছে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন ইমরান হোসেন মিলন

২৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



হুইলচেয়ারে ‘স্মার্ট’ গতি

মাইক্রোসফট-ইয়াং বাংলা অ্যাওয়ার্ডসে সেরা প্রকল্প হিসেবে জিতে নেওয়া পাঁচ লাখ টাকার চেক হাতে মাহমুদুল হক ও আনিকা আনজুম।

খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের বিভাগ বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবে এক দিন প্রাকটিক্যাল ক্লাস করছিলেন মাহমুদুল হক। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে বেখেয়ালেই বসে পড়েন সেখানে রাখা এক হুইলচেয়ারে। তবে বসার পর বেড়ে যায় কৌতূহল। কেমন অনুভূতি হয় তা বোঝার জন্য ইচ্ছে করেই পা দুটো না নড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। বিষাদভরা মনে অনুভব করেন—প্রতিবন্ধী বা অসুস্থরা কতটা অসহায়ভাবে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। বিশেষ করে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতার বিষয়টি বেশি ভাবায় তাঁকে। ওই দিনই তাঁর মনে হয়েছে, এই মানুষদের অসহায়ত্ব কিছুটা হলেও লাঘব করা যাবে যদি হুইলচেয়ারকে স্মার্ট বানানো যায়। সে চিন্তা থেকেই গতি পেল ‘স্মার্ট পাওয়ার হুইলচেয়ার’ তৈরির কাজ।

 

ঘুরল চাকা যেভাবে

বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবট তৈরিতে যুক্ত ছিলেন সহপাঠীদের সঙ্গে। প্রযুক্তিটি তাই অচেনা নয় মাহমুদুল হকের কাছে। তাই স্মার্ট হুইলচেয়ার বানানোটা ‘অসম্ভব’ মনে হয়নি তাঁর। তিনি বলেন, অ্যানড্রয়েড মোবাইলের ব্লুটুথ মডিউল দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়—পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড এমন একটি প্রোটোটাইপ দাঁড় করাই প্রথমে। এটা তৈরি করতে গিয়েই বুঝতে পারি কাজের চাপ। তাই মূল কাজে যুক্ত করি সহপাঠী আনিকা আনজুমকে। দুজনে মিলেই মূল কাজ এগিয়ে নিয়েছি। সহযোগিতা পেয়েছি বিভাগের শিক্ষক ও সহপাঠীদেরও।

 

কাজ এগোল ধাপে ধাপে

স্বয়ংক্রিয়ভাবে হুইলচেয়ারটি চালানো বড় কাজ নয়, চেয়ারটিকে নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। কারণ এই চেয়ার ব্যবহার করবে মূলত অসুস্থ বা প্রতিবন্ধীরা। তাদের উপযোগী করে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা উন্নয়ন করতে না পারলে বেশি লাভ হবে না—এ বিষয়টা চিন্তায় এসেছে বারবার।

মাহমুদুল হক বলেন, আমরা সাধারণ একটি হুইলচেয়ার নিয়ে তাতে আলাদা করে হ্যান্ডেল যুক্ত করি। তাতে জুড়ে দিই ২৪ ভোল্টের একটি ব্যাটারি। সম্পূর্ণ চার্জ হতে ব্যাটারিটি সময় নেয় পাঁচ ঘণ্টার মতো। ওজনের ওপর নির্ভর করে এই চার্জে চলতে পারবে ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার।

মূল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রাখা হয় অ্যানড্রয়েড অ্যাপের মাধ্যমে। ডেমো চেয়ারটিতে পদ্ধতিটি সফলও হয়। তবে রোগী ও প্রতিবন্ধীরা অ্যাপ দিয়ে নিয়ন্ত্রণে ঝামেলায় পড়তে পারে ভেবে একে আরো উন্নতকরণের কাজ শুরু হয়।

স্মার্ট পাওয়ার হুইলচেয়ারে বাংলাদেশ জাতীয় প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক।          ছবি : সংগৃহীত 

হচ্ছে আরো স্মার্ট

ইন্টারনেট অব থিংকস বা আইওটি প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করছেন তাঁরা। আইওটি যুক্ত করে করা হচ্ছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। চেয়ারটিতে মোবাইল সিমের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে। পেছনে চলা, ডানে-বাঁয়ে ঘুরানো করা যাচ্ছে সবই। নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে অন্য স্মার্টফোন থেকেও।

তবে আইওটি সিস্টেমটি চূড়ান্ত হতে এখনো বাকি কিছু কাজ।

পরের মডেলগুলোতে আরো কিছু বিষয় সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। বানাবেন স্পোর্টস হুইলচেয়ারও। এই শ্রেণির চেয়ারে থাকবে হাত দিয়ে সরাসরি কন্ট্রোল করার জন্য জয়স্টিক ও সুইচ। সিঁড়িতে সহজে ওঠার ব্যবস্থাও রাখা হবে।

 

খরচ অনেক কম

দেশে প্রতিবন্ধীদের অনেকেই নিম্ন আয়ের মানুষ। তাদের অনেকের জন্য সাধারণ হুইলচেয়ার কেনাও কষ্টসাধ্য।

স্বয়ংক্রিয় স্মার্ট হুইলচেয়ার উন্নত দেশ থেকে আমদানি করতে খরচ পড়ে প্রায় দেড় লাখ টাকার মতো। তবে তাদের উন্নয়ন করা প্রযুক্তিতে এই চেয়ার বাণিজ্যিক উৎপাদনে খরচ ১৫ হাজার টাকার মধ্যে হবে বলে জানিয়েছেন মাহমুদুল হক।

 

থলিতে পুরস্কার

বেশ কয়েকটি প্রতিযোগিতায় সেরা প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়েছে স্মার্ট পাওয়ার হুইলচেয়ার।

খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ইনোভেশন মেলায় প্রকল্পটি প্রথম হয়েছিল। ২০১৭ সালে মাইক্রোসফট-ইয়াং বাংলা অ্যাওয়ার্ডসেও সেরা হয়েছে এটি। সেখানে বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্প হিসেবে সেরা হয়ে পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার অর্থ জিতে নেয়।



মন্তব্য