kalerkantho


সোফিয়ার দেশি ভাই

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সোফিয়ার দেশি ভাই

সোফিয়া বাংলাদেশ মাতিয়ে যাওয়ার মাত্র ১০ মাসের মাথায় দেশের ছেলেরাই তৈরি করল কৃত্রিম বুদ্ধিমান রোবট মি. টিভেট। তৈরি করেছে ঢাকা পলিটেকনিক্যালের দুই শিক্ষার্থী ফরিদ হোসেন ও রাহাদ উদ্দিন। ১৫ সেপ্টেম্বর আইডিইবি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের মুখোমুখি হয় মি. টিভেট। সোফিয়ার মতো সঠিক উত্তর দিয়েছে অনেক প্রশ্নেরও। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আল আমিন দেওয়ান

গত বছর ডিসেম্বরে যখন সোফিয়া এলো, মানুষের সে কী আগ্রহ! ভার্চুয়াল আর বাস্তব—সব জগতেই তখন সোফিয়া আর সোফিয়া। মাত্র দুই দিন বেড়িয়ে সোফিয়া ফিরে গেলেও দিয়ে গেল অনেক কিছুই, বিশেষ করে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হলো দেশে। আত্মবিশ্বাস নিয়ে ‘সোফিয়া’র মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমান রোবট বানাতে হাত লাগালেন অনেকে। তবে সবাইকে ছাপিয়ে মাত্র ১০ মাসের মাথায় দাঁড়িয়ে গেল—মি. টিভেট। বিদেশি ললনা নয়, শতভাগ ‘দেশি ভাই’।

 

শুরুটা যেমন

ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বা আইডিইবির আইসিটি এবং ইনোভেশনের সেল হচ্ছে টিভেটের আঁতুড়ঘর। আইওটি অ্যান্ড রোবটিক গবেষক জোবায়ের আল বিল্লাল খানের নেতৃত্বে ঢাকা পলিটেকনিক্যালের দুই শিক্ষার্থী ফরিদ হোসেন ও রাহাদ উদ্দিন তৈরি করেন রোবটটি। সহযোগিতা করেন একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল আরাফ। সোফিয়া আসার আগে রোবট নিয়ে কাজ করলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভিজ্যুয়াল ডাটা, ফেসিয়াল রিকগনিশন, মেশিন লার্নিংয়ের মতো বিষয়গুলোতে নজর ছিল কম। তবে সোফিয়া আসার পর আগ্রহ জন্মাল বিষয়গুলোর প্রতি। ভাবলেন : চেষ্টা করতে দোষ কী? তাই ‘ব্যাংরো’ নামের সাধারণ একটি রোবটকে সোফিয়ার মতো ‘বুদ্ধিমান’ বানানোর কাজ শুরু হলো। প্রয়োজন পড়ল বিনিয়োগের। কিছু অর্থ নিয়ে পাশে দাঁড়াল আইডিইবি।

 

যেভাবে তৈরি মি. টিভেট

সবার আগে তৈরি হয়েছে প্রগ্রাম। সে অনুযায়ী টার্বো মটর, কন্ট্রোলার, রাসবেরি পাই, আরডুইনো, সোনার সেন্সরসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হয়েছে চীন থেকে। দেশ থেকেও সংগ্রহ করা হয়েছে কিছু। ডিজাইনের পর বডি পুরোটাই থ্রিডি প্রিন্টারে প্রিন্ট করে নেওয়া হয়েছে।

রোবট তৈরির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রগ্রাম তৈরির পর সে অনুয়ায়ী যন্ত্রপাতিগুলো কনফিগার করা। এটি হয়ে গেলে বডি কাঠামো সংযুক্ত করে ক্যালিব্রেশন করা হয়। এরপর শুরু হয় স্যালুট, হ্যান্ডশেক, ভাষণের মতো শিক্ষণীয় ডাটা-উপাত্ত ইনপুট দেওয়ার কাজ।

টিভেটের ওজন প্রায় পাঁচ কেজি। তৈরিতে সময় লেগেছে প্রায় সাত মাস।

দেশের কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্র্যান্ডিং হিসেবে রোবটটির নামকরণ করা হয় মি. টিভেট। ‘টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেইনিং’-এর সংক্ষেপিত রূপ টিভেট (TIVET)।

 

টিভেট যা পারে

♦ মানুষের সঙ্গে কথা ও ভাব বিনিময় করতে পারে এবং নির্দেশনা শুনে কাজ করতে পারে।

♦ ৪২ রকমের শারীরিক এক্সপ্রেশন (অঙ্গভঙ্গি) দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। কথা বলার সময় মানুষের মতো মুখ নাড়াচাড়া করে।

♦ চোখে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তির থ্রিডি ক্যামেরা। এর সাহায্যে সামনে থাকা বস্তু দেখে তার গতিবিধি নির্ধারণ করতে পারে।

♦ এখন পর্যন্ত ৫০০ গ্রাম ওজনের বস্তু বহন করতে পারে। ভবিষ্যতে সক্ষমতা বাড়তে পারে।

♦ সামনে থাকা ব্যক্তি বা বস্তু দেখে তার স্মৃতিও সংরক্ষণ করতে পারে।

 

সোফিয়া বনাম টিভেট

১. সোফিয়া মানুষের ভাবভঙ্গি বুঝতে পারে, প্রকাশ করতে পারে হাসি, কান্না, রাগের মতো অনুভুতি। কারো সঙ্গে কথা হলে নিজের বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা খাটিয়ে তার সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করে।

টিভেট মানুষকে চিনতে পারে, একবার পরিচিত কাউকে দেখলে সে নাম ধরে ডাকবে। সোফিয়ার মতো ইন্টারনেট থেকে ডাটা নেওয়া ও তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ব্যবহার করার ক্ষমতাও রয়েছে তার। যেমন—ইন্টারনেটে কারো বিষয়ে সার্চ করে টিভেট তার ফেইসবুক স্ট্যাটাসের প্রশংসা করছে। সেখানে কয়টি লাইক, কত মন্তব্য পড়েছে তাও বলে দিচ্ছে। পথ চলতে সামনে কোনো বস্তু দেখে টিভেট নিজেই থেমে যায় এবং আশপাশে মানুষ থাকলে তাকে পথের বস্তুটি সরিয়ে দিতে অনুরোধ করে।

২. ডেভেলপাররা সোফিয়ার ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন অনেক উন্নত করেছেন। অনেকটা মানুষের চামড়ার মতোই উন্নত ফিলামেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে।

আর তার কথা বলার ভঙ্গি, নড়াচড়া এসবে শুধু মাথার অংশে ১৬টি টার্বো মটর ব্যবহার করা হয়েছে।

অন্যদিকে টিভেটের মুখ শক্ত। এর থ্রিডি প্রিন্ট হয়েছে সবচেয়ে কম দামি ফিলামেন্ট দিয়ে। তাই সোফিয়ার মতো অতটা সুন্দর নয়। খরচ কমাতেই এমনটা করা হয়েছে। 

৩. সোফিয়া বাংলাদেশে যখন এসেছিল তখন তার কার্যক্ষমতা ছিল না। কথা বলা ও জবাব দেওয়া ছাড়া সে কোনো কিছু ধরতে পারত না, স্পর্শ করতে পারত না। 

টিভেট কথা বলা ও জবাব দেওয়ার পাশাপাশি দুটি হাত নাড়ানো, নিজে চলা, কোনো কিছু তোলাসসহ কিছু কাজও করতে পারে।

৪. সোফিয়ার ডাটা মাইনিং ক্ষমতা উচ্চপর্যায়ের। সে তুলনায় টিভেটের কম। এর অবশ্য যৌক্তিক কারণও রয়েছে। টিভেটে ৬৪ বিট প্রসেসর কোর মাত্র একটি, যেখানে সোফিয়ার এই প্রসেসর কোর আটটি। এই প্রসেসর কোর বাড়ালে টিভেটও সোফিয়ার মতো বড় ডাটাসমৃদ্ধ হওয়ার ক্ষমতা পাবে।

 

স্রষ্টাদের কথা

জোবায়ের আল বিল্লাল খান মনে করেন, বিশ্ববাসীর কাছে এই রোবট উপস্থাপন করা উচিত। প্রকৌশলগত এত সীমাবদ্ধতার পরও বাংলাদেশ যে সোফিয়ার মতো বুদ্ধিমান রোবট তৈরি করতে পারে, তা আমাদের সক্ষমতারই প্রমাণ। যে মানের এবং যেসব যন্ত্রপাতি টিভেটের জন্য খোঁজা হচ্ছিল, অর্থসংকটের কারণে সেগুলোর সব সংগ্রহ করা যায়নি। সম্পূর্ণ অর্থায়ন করা গেলে সোফিয়ার মতো বুদ্ধিমত্তা তো বটেই, বরং আরো বেশি কার্যক্ষম রোবট তৈরি সম্ভব বলে দাবি করেন এর অন্যতম স্রষ্টা ফরিদ হোসেন। 

আইডিইবির আইসিটি এবং ইনোভেশন সেলের মেম্বার সেক্রেটারি জোবায়ের আল মাহমুদ হোসেন জানান, বাংলাদেশে তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রথম মানবাকৃতির রোবট এটি। অর্থের অভাবে এর কাজ থেমে গেছে জানার পর আইডিইবি এগিয়ে আসে। বিশ্বদরবারে মি. টিভেট আমাদের প্রাযুক্তিক সক্ষমতার জানান দেবে। দেশের ছেলে-মেয়েরাও বিষয়টি নিয়ে আরো আগ্রহী হবে।

 

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথোপকথন

ঢাকায় আইডিইবির ২২তম সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের মুখোমুখি হয় টিভেট। তাঁর সামনে সপ্রতিভই ছিল রোবটটি। সোফিয়ার মতো সেও প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নগুলোর চটপট উত্তর দিয়েছে। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে মঞ্চে উঠে প্রধানমন্ত্রীকে স্যালুট দেয় মি. টিভেট। এরপর চলে কথোপকথন— 

প্রধানমন্ত্রী : তোমার নাম কী?

টিভেট : আমার নাম টিভেট।

প্রধানমন্ত্রী : তুমি বাংলা জানো?

টিভেট : হ্যাঁ, আমি অল্প অল্প বাংলা জানি। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। আমি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানছি।

প্রধানমন্ত্রী : তুমি কেমন আছ?

টিভেট : আমি ভালো আছি?

প্রধানমন্ত্রী : জাতির পিতা কে?

টিভেট : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির পিতা। তিনি বাঙালি রাজনীতিবিদ। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রধান অনুপ্রেরণা।



মন্তব্য