kalerkantho

দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কোন পথে

ইসহাক খান

১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কোন পথে

কেমন চলছে আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা? এই প্রশ্নের এককথায় সহজ উত্তর, ‘ভালো নেই।’ কেউ বা রাগী মুখে বলবেন, ‘খুব খারাপ।’ এখানে খুব খারাপই যথার্থ জবাব। বেশির ভাগই তা-ই বলবে।

বেদনার ব্যাপার হলো, আমাদের অনেক ভালো ডাক্তার আছেন। তার পরও আমরা কেন স্বাস্থ্যব্যবস্থা খারাপ বলছি। কারণ আমাদের দেশের বেশির ভাগ ডাক্তার দেশের মানুষের আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু—এমন খবর আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে।

অবস্থাদৃষ্টে এমন হয়েছে, কারো কিছু হলেই আমরা মুখস্থ বলে দিই, ওকে ভারতের চেন্নাই নিয়ে যাও, দিল্লি নিয়ে যাও। এখানে এ রোগের চিকিৎসা নেই। ডাক্তাররা রোগই ধরতে পারবে না।

এমন ঘটনা যে ঘটছে না, তা কিন্তু নয়। আমার একজন কাছের আত্মীয় অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হলেন। ডাক্তার একগাদা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বলে দিলেন, রোগীর ক্যান্সার। ডাক্তারের এই রিপোর্টে রোগী তো রোগী, রোগীর আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত অর্ধমৃত হয়ে গেল শুনে। পুরো পরিবারের মন ভেঙে গেল। হাসি-খুশি পরিবারটি রাতারাতি শোকের আবর্তে নিমজ্জিত হলো। এই সময় কে একজন তাদের পরামর্শ দিল, রোগীকে ইন্ডিয়া নিয়ে যাও। সেখানে আবার পরীক্ষা করাও। অগত্যা বাঁচার আশায় আমার সেই আত্মীয় ধারদেনা করে ইন্ডিয়া গেলেন। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তাররা বললেন, রোগীর শরীরে ক্যান্সারের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। আমার আত্মীয় যেন নতুন জীবন ফিরে পেলেন। নতুন জীবনের আনন্দে তিনি দেশের ডাক্তারদের এই খামখেয়ালি মাফ করে দিলেন। হাসিমুখে তিনি দেশে ফিরে এলেন। এই যে ভুল চিকিৎসায় তিনি রোগীকে নাস্তানাবুদ করলেন, রোগীর আত্মীয়দের হেনস্তা করলেন, মানসিক কষ্ট দিলেন, অর্থদণ্ড লাগালেন, তার জবাব কে দেবে?

এ দেশে কোনো কাজেরই জবাবদিহি নেই। আর আমাদের ডাক্তারদের জবাবদিহির বিষয়টা তো আরো দূরের ব্যাপার। তাঁদের সরকারি হাসপাতালে ঢাকার বাইরে পোস্টিং দিলে যেতে চান না। ধরপাকড় করে রাজধানীতেই থেকে যান। মাসে এক দিনও কর্মক্ষেত্রে না গিয়ে পুরো মাসের বেতন নেন। এর জন্য তাঁদের কোনো জবাবদিহি করতে হয় না। এসব নিয়ে আমাদের সরকারের কোনো মাথাব্যথা আছে বলেও মনে হয় না। জেলা হাসপাতালগুলোর সমস্যার শেষ নেই। অনেক হাসপাতালে অ্যাম্বুল্যান্স নেই। থাকলেও অ্যাম্বুল্যান্স নষ্ট। এক্স-রে মেশিন নেই। থাকলেও নষ্ট। মানুষ বাধ্য হয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হচ্ছে। যাদের অনেক টাকা আছে, তারা যায় সিঙ্গাপুর অথবা থাইল্যান্ড। যাদের একটু কম আছে তারা যায় ইন্ডিয়া। আর যারা গরিব তাদের জন্য ঝাড়ফুঁকই ভরসা। গরিব আবার মানুষ নাকি? তারা বাঁচলেই কী, মরলেই কী? একসময় তাদের ভোটের সময় সমাদর বাড়ত। এখন তো সেটাও নেই।

এত অব্যবস্থার মধ্যে আছে পুকুরচুরি। মোটা দাগে যে চুরিগুলো হয়, সেটা অফিশিয়াল চুরি। যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম হয়। মোটা অঙ্কের টাকা বেরিয়ে যায় এই পথে। সেটা মন্ত্রণালয়ের সবাই জানে ও বোঝে। যাদের করার কিছু থাকে না তারা আড়ালে-আবডালে ফোঁসফোঁস করে। মিডিয়ার কাছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সব বলে দেয়। আর যাদের করার কিছু আছে, তারা কমিশন পেয়ে চুপ হয়ে যায়। ব্যাপারটা তার পরেই ধামাচাপা পড়ে।

এত অনিয়মের মধ্যে দিনদুপুরে পুকুরচুরির খবর প্রকাশ করল কালের কণ্ঠ। ‘ওষুধ চুরি এবং পাচারের মচ্ছব’।

খবরে প্রকাশ, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী [বিএসএফ] আসামের ধুবরা এলাকা থেকে ১০ হাজার স্বল্পমাত্রার গর্ভনিরোধক বড়িসহ দুই নারীকে আটক করেছে। সুখী নামের ওই বড়ি চোরাই পথে পাচার হয়েছে বাংলাদেশ থেকে। সুখী বড়ি বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব ব্র্যান্ডের জন্মনিরোধক, যা এ দেশের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতায় শুধু দেশের বিবাহিত নারীদের মধ্যে বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য সংরক্ষিত।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বছরে প্রায় ১১ কোটি সাইকেল বা ৩০৮ কোটি সুখী বড়ি কিনে থাকে দেশের একাধিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। এ বছরও প্রায় ১১০ কোটি টাকার সুখী বড়ি কিনছে সরকার।

শুধু এবারই নয়, মাঝেমধ্যে সুখী বড়ি ধরা পড়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যটির সীমান্তবর্তী এলাকায় ওষুধের দোকানেও বাংলাদেশ সরকারের সুখী বড়ি বিক্রি হয়। এমনকি বেশ কয়েকবার মিয়ানমারে পাচারের সময় সীমান্তে এই বড়ি ধরা পড়েছে।

শুধু পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরই নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতায় বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের রোগীদের জন্য সরবরাহ করা সরকারি ওষুধও চুরি হয়ে বেরিয়ে যায় হাসপাতালের বাইরে। বিনা মূল্যে বিতরণের এসব ওষুধ বেচাকেনা হয় দেশের ভেতরের বিভিন্ন ওষুধের দোকানে।

র‌্যাব ও পুলিশের সূত্রগুলো জানায়, সব ক্ষেত্রেই সরকারি ওষুধ পাচারে জড়িত থাকে হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দাবি করেন, তাঁরা এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না।

না জানারই কথা। জানলে তাঁদের কমিশন বন্ধ হয়ে যাবে। দেশের সর্বত্র হরিলুটের মহোৎসব চলছে। সরকার যতই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলছে দুর্নীতি যেন ততই শক্তপোক্তভাবে হাঁটু গেড়ে বসছে আমাদের সমাজে। তিতাস গ্যাসের একজন মিটার রিডারের উত্তরায় ছয়তলা ফ্ল্যাটবাড়ি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন অ্যাকাউন্ট্যান্টের ব্যাংকে কয়েক শ কোটি টাকা। বলতে গেলে এই তালিকা আরো দীর্ঘ হবে। তিতাস গ্যাসের একজন মিটার রিডার যদি চাকরিসূত্রে ছয়তলা বাড়ি করতে পারেন, তাহলে ওই অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তার অবস্থা সহজে অনুমান করা যায়।

রাজউক ২৫টির মতো টিম নামিয়ে অবৈধ ভবন চেক করছে। এত দিনে তাদের হুঁশ হয়েছে। যখন ২৬টি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে আগুনে। এই যে ভবন মালিক ১৮ তলার পারমিশন নিয়ে ২৩ তলা করলেন, তখন রাজউক কর্মকর্তারা কি ঘুমিয়ে ছিলেন? কেন তাঁরা তখন মনিটর করলেন না? কথায় কথায় তাঁরা জনবলের দোহাই দেন। গিজগিজে মানুষের দেশে জনবলের অভাব—এই হাস্যকর যুক্তি শুনতে আর ভালো লাগে না।

যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনেকেই মজা করে বলেছে, আগে রাজউকের অফিসে অভিযান চালানো দরকার। কথাটা হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কড়ি ছাড়া বাড়ির নকশা পাস হয় না রাজউকে। সেখানে কথা বলতে গেলেই আগে কড়ি ফেলতে হয়। রাজউকের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা। দুর্নীতি দমন কমিশন রাজউকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট চেক করলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে বলে সবারই কমন ধারণা।

কথা বলছিলাম আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়ে। চারদিকে এত এত অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা, কোনটা রেখে কোনটা বলি। একটা বলতে গেলে অন্যটা দাঁত ভেংচিয়ে সামনে চলে আসে।

রাস্তায় প্রতিদিন নিয়ম বেঁধে ঘটছে দুর্ঘটনা। ছাত্ররা রাস্তা বন্ধ করে নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটি নিরাপদ খাদ্যের জন্য আন্দোলন করছে। এক দল কর্মী নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবার জন্য আন্দোলন করছে। এসব দেখে দেখে একজন ভুক্তভোগী রসিকতা করে বললেন, ‘আমাদের এখন একটাই দাবি হওয়া উচিত, আমরা নিরাপদ মৃত্যু চাই।’ আগুনে পুড়ে, গাড়িচাপায়—এমনতর অসংখ্য অস্বাভাবিক মৃত্যু দেখতে দেখতে মৃত্যু নিয়ে মানুষ শঙ্কিত। তারা এখন নিরাপদ মৃত্যু চায়।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার ও নাট্যকার

মন্তব্য