kalerkantho

‘আয় আয় চাঁদা মামা...’

মোফাজ্জল করিম

১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৪ মিনিটে



‘আয় আয় চাঁদা মামা...’

শৈশবে মায়ের কোলে বসে ছড়াটি বাংলাদেশের সব শিশুই কমবেশি শুনে থাকে। কিন্তু কোনো কোনো বিস্ময়বালকের অস্থিমজ্জায় ছড়াটি এমনভাবে মিশে যায় যে তা সারা জীবন তার ওপর জিনের বাদশাহর মতো সওয়ার হয়ে থাকে। আর স্থানে-অস্থানে, উঠতে-বসতে তার মস্তিষ্কে গুঞ্জরণ তোলে ছড়াটি : ‘আয় আয় চাঁদা মামা টিপ দিয়ে যা/চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।’ তারপর তসবিহ জপার মতো ব্যক্তিটি মনে মনে আওড়াতে থাকেন : ফাইল এলে সই দেবো/পাকা ধানে মই দেবো/যখন যেমন তখন তেমন/যা চাইবে করে দেবো/বিনিময়ে একটা শুধু/হৃষ্টপুষ্ট ‘প্যাকেট’ নেবো।

পাঠক কি অধৈর্য হয়ে জানতে চাইছেন ব্যক্তিটি কে? আর প্যাকেটটিই বা কিসের? বলছি। হ্যাঁ, ইনি সেই ব্যক্তি, যাঁর খপ্পরে একবার পড়েছেন কী মরেছেন। ইনি আপনাকে চাঁদা মামা বলে সম্বোধন করবেন খুব মিষ্টি করে। আর নিজেকেও পরিচয় দেবেন চাঁদ বলে। আর প্যাকেট? না, এটা কোনো মিষ্টির প্যাকেট নয়—মিষ্টি তো ফাউ হিসেবে তাঁর পাওনা এমনিতেই—এই পেটমোটা প্যাকেটটার নাম হচ্ছে সেলামি বা ‘টিপস’। বাংলা ‘টিপ দিয়ে যা’ না বলে ইনি একটি ‘স’ জুড়ে দিয়ে ইংরেজিতে বলেন, ‘টিপস দিয়ে যা’। বাংলায় বললে বলতে হয় বখশিস। ওটা শুনতে খারাপ শোনায়। উনি কি হোটেলের বয় না বেয়ারা, না ইস্টিশনের কুলি, যে তাঁকে বখশিস দেবেন? উনি হচ্ছেন প্রবল প্রতাপান্বিত, বিশাল ক্ষমতাধর একজন সরকারি/আধা সরকারি/নিম সরকারি আমলা, যার কলমের একটি খোঁচার ওপর নির্ভর করে আপনার এবং আপনার মতো অগণিত নিরীহ ছাপোষা বঙ্গবাসীর, ‘জীবন-যৌবন-ধনবান’। হ্যাঁ, শব্দার্থেই তাই। ইনি নাখোশ হলে আপনি এক মুহূর্তের মধ্যেই মরহুম বেওয়ারিশ লাশ হয়ে রাস্তায় কিংবা রাস্তার পাশের ডোবায় পড়ে থাকতে পারেন। কিংবা আপনি যদি একজন নীতিবান দেশপ্রেমিক টগবগে যুবক হোন, আর কোনো কারণে তা তাঁর নিজে থেকেই হোক বা অন্য কারো নির্দেশেই হোক, এই পাওয়ারফুল স্যারটি আপনার ওপরে রুষ্ট হোন তাহলে আপনার বাকি জীবন-যৌবন কাটতে পারে কারান্তরালে। আর বিত্ত-বেসাত জমি-জিরাত সবই মুহূর্তে বেহাত হতে পারে এই ব্যক্তিটির অঙ্গুলি হেলনে। আবার এর উল্টোটাও হতে পারে। স্যারকে আপনি খুশি করতে পারলে আপনি সাতটি খুন করেও দিব্যি গায়ে সেন্ট মেখে সেন্ট মার্টিন থেকে তেঁতুলিয়া যত্রতত্র ঘুরে বেড়াতে পারেন, উড়ে বেড়াতে পারেন, কেউ আপনার কেশাগ্রটিও স্পর্শ করতে পারবে না। এমনি মহাশক্তিধর এই মামা, যিনি চাঁন্দা ছাড়া কিছু বোঝেন না বলে লোকে তাঁকে ডাকে চাঁন্দা মামা। আর তাকে বাংলা টিপ নয়, দিতে হয় টিপস। সেটাও কপালে নয়, দিতে হয় তাঁর বাঁ হাতে।

আমার চাকরিজীবনের প্রথম দিকে সেই ষাটের দশকে এক জবরদস্ত চাঁন্দা মামার সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম। ভদ্রলোককে দেখলে মনে হতো ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানেন না। (এ ধরনের লোক সম্বন্ধে আমি অবশ্য বলি, এরা মার্জারধর্মী, এরা ভাজা মাছ উল্টে খায় না, কাঁটাকুটাশুদ্ধ চিবিয়ে খায়।) তা ওই লোক সম্বন্ধে জনশ্রুতি ছিল, তিনি নাকি হাত দিয়ে ঘুষের হারাম টাকা ছুঁতেন না, তাঁর ইশারায় টাকা রাখতে হতো পায়ের কাছে স্থাপিত একটি বড়সড় বদনায়। হতেও পারে। তখন তো পাকিস্তানি আমল। পাক-নাপাক, ইসলামী জোশ, ইসলামী জযবা ইত্যাদি ছিল একটু বাড়াবাড়ি রকমের বেশি। আরেক খুব পরহেজগার টাইপের ঘুষখোর ব্যক্তি ঘুষের টাকা বাসায় নিতেন না, ওই টাকা তো হারাম। তিনি অফিসের ক্যাশের টাকার সঙ্গে ঘুষের টাকা বদলিয়ে বাসায় নিতেন। অনেকটা সেই গুম্ফধারী তথাকথিত রোজাদারের মতো, যে হিমশীতল বিয়ার মুখে দিয়ে রোজা খুলত। আর তার বৈশিষ্ট্য ছিল সে রোজা খোলার সময় তার বাঁ হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ও তর্জনি দ্বারা পুরুষ্টু গুম্ফজোড়া উঁচু করে ধরে বিসমিল্লাহ বলে দু’আ-দরুদ পড়তে পড়তে বিয়ারের গ্লাসে চুমুক দিত। একদিন তার এক বন্ধু জানতে চাইল, এভাবে গোঁফ উঁচু করে ধরে বিয়ার পান করার মাজেজা কী। উত্তরে সে বলল, আরে বুদ্ধু বোঝো না, গোঁফের ছোঁয়া বিয়ারে লাগলে বিয়ার মকরুহ হয়ে যাবে।

তবে হ্যাঁ, এতক্ষণ যাদের কথা বললাম বুঝতেই পারছেন এরা নগদ নারায়ণে বিশ্বাসী। ঘুষের টাকা, যাকে এরা মনে করে বেতনের অতিরিক্ত ‘উপরি আয়’—স্পর্শ করে এরা এক ধরনের অপার্থিব আনন্দলাভ করে। তাই কম হোক বেশি হোক, ওটা নগদ পেতেই তারা বেশি আগ্রহী। এরা পারস্যের কবি ওমর খৈয়ামের অমর বাণীতে দারুণ বিশ্বাসী : ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকির খাতায় শূন্য থাক/দূরের বাদ্যে কাজ কি সখী, মধ্যে যে তার বেজায় ফাঁক’। দশ টাকা থেকে দশ লাখ টাকা সবই নগদ পেতে এদের বেশি ভালো লাগে। আরো ভালো লাগে, ওই টাকা দিয়ে অফিস থেকে ফেরার পথে বৌয়ের জন্য একটা চটকদার দামি শাড়ি কিনে বাসায় ফিরে বৌয়ের কান-এঁটো-করা হাসি দেখতে। আর পরকালে সদগতির আশায় কুরবানির ঈদে বিশাল আকৃতির গরু কিংবা পাড়া-প্রতিবেশীকে চমকে দিয়ে গরুর বদলে মরু অঞ্চলের প্রাণি একটি উট কুরবানি দিয়ে একজন বিরাট মাপের ধার্মিক মানুষ হিসেবে সুনাম অর্জন করতে এরা খুবই তৎপর।

এ ধরনের ঘুষ বা উেকাচ গ্রহণের লেনদেন হয় দুই পক্ষ, অর্থাৎ দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে। ঘুষ প্রদানকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের গাঁটের পয়সা থেকে গ্রহীতাকে ঘুষ দেন কাজ আদায়ের জন্য। আর এই টাকাটা গ্রহীতা নিয়ে থাকেন এক ধরনের ‘সার্ভিস চার্জ’(!) হিসেবে। আর রাতকে দিন, দিনকে রাত করার জন্য এই টাকা কাজ করে টনিকের মতো। এতে রাষ্ট্রের তহবিল থেকে সরাসরি কোনো অর্থব্যয় না হলেও এর ফলে যে ইচ্ছাকৃত ভুল সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়ে থাকে, তাতে অবশ্যই কখনো কখনো রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা বা তারও অধিক লোকসান হয়। আবার এ ধরনের অন্যায় সিদ্ধান্তের কারণে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অবিচারের শিকার হয়ে পথে বসে যেতে দেখা যায়।

দুই.

তবে এসব সরাসরি ঘুষ লেনদেনের চেয়েও বড় দুর্নীতি হয় লোকচক্ষুর অন্তরালে রাষ্ট্রের ক্ষতিসাধন করে, যখন রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী কাজ করা হয় বিরাট অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে। ‘কাজটা তো আপনাদের পাইয়ে দেবো বুঝলাম, আপনারা এ থেকে কয়েক শ কোটি টাকা কামাবেন এও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, তা এতে আমার লাভ কী? আমি কি বসে বসে আঙ্গুল চুষব?’ সংসার বিবাগী দরবেশের মতো মুখের ভাব করে জানতে চাইবেন কর্তাব্যক্তিটি। ‘ওটা স্যার আমরা ঠিক করেই রেখেছি। আপনার জন্য ধরা আছে টেন পারসেন্ট, যেটা সরাসরি চলে যাবে বিদেশে আপনার অমুকের অ্যাকাউন্টে। দেশে কোনো ফাদার্স সানও বিষয়টি টের পাবে না। আর আপনার বস্, যিনি সব সময় তক্কে তক্কে আছেন আপনি কী করেন না-করেন দেখার জন্য, তাঁর জন্য আছে আরো টেন পারসেন্ট,’ হাত কচলাতে কচলাতে বলবে বিনয়ে বৈষ্ণব টেন্ডারদাতা। বড় বড় ‘ডিল’-এ এ ধরনের একান্ত আলাপচারিতা খুবই ‘কমন’।

ঘুষ খাওয়া, সরকারি কেনাকাটায় পারসেন্টেজ খাওয়া, ঈদে-পর্বে, পূজা-পার্বণে ভেট হিসেবে শাড়িটা-গয়নাটা নেওয়া, সব আমলেই ছিল, এখনো আছে। এমন নয় যে এগুলো এই কলিযুগের আবিষ্কার, সত্যযুগ-দ্বাপর যুগে লোকে এগুলোর নামও শোনেনি। না, ঘুষ, দুর্নীতি, ধান্দাবাজি, জালিয়াতি সব যুগে, সব কালেই ছিল। তবে এখনকার মতো এ রকম মহামারী আকারে ছিল না। বলা হয়, এখন নাকি একেকটা অফিসে-আদালতে ঘুষখোররা আযান দিয়ে ঘুষ খায়। কোনো কোনো অফিস-আদালতের ইট-পাথর, চেয়ার-টেবিলও শোনা যায় ঘুষ খায়। হায়া-শরম, লাজ-লজ্জার কোনো বালাই নেই। এখন আর বদনা-টদনায় ঘুষের টাকা রাখতে হয় না, টেবিলের তলায় লুকিয়ে-চুরিয়ে বাঁ হাত দিয়েও ঘুষ নিতে হয় না। এর কারণ এখন সবাই জানে, ঘুষ দেওয়া-নেওয়াটাই সিস্টেম হয়ে গেছে। পাশের টেবিলের লোক দেখে ফেলল তো কী হয়েছে। সে যার সঙ্গে গুজুর-গাজুর ফুসুর-ফাসুর করে চা-শিঙ্গাড়া সাবড়াচ্ছে সেই লোকও তো একটু পরেই তাকে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দেবে। আগে লোকে ভয় পেত অফিসের বড়কর্তাদের। এখন সবাই জানে ঘুষের ব্যাপারে সবাই দারুণ সাম্যবাদী হয়ে গেছেন, সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে এই নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাচ্ছেন এবং ফলে যা হবার তাই হচ্ছে : সবাই ‘বেআব্রু’ হয়ে যাচ্ছেন। বলা হয়, ব্রিটিশ আমলে, এমনকি পাকিস্তানি আমলেও অফিস-আদালতে বেশি হলে শতকরা ১০ জন ঘুষ খেত, বাকি ৯০ জন ছিল সৎ। এখন গনেশ উল্টে গেছে। এখন শতকরা ৯০ জন ঘুষ খায়, বাকি ১০ জন আল্লাহর বান্দা খায় না বলে তাদের পরিচয় তারা একেকটা অফিসের রাসভ। আশপাশের হালচাল কিচ্ছু বোঝে না। সারা জীবন কলুর বলদের মতো পরম নিষ্ঠায় ঘানি টানে। বলদটা এক ফোঁটা তেলেরও স্বাদ পায় না বা পেতে চায় না। মরার সময় আণ্ডাগণ্ডা বাচ্চাকাচ্চার পরকাল ঝরঝরে ফরসা, আর নিজের জন্য আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম ভরসা। লোকে মুখে বলে, আহা, একটা সৎ মানুষ চলে গেল। মনে মনে বলে, সারা জীবন একটা আস্ত বেকুব ছিল লোকটা।

তিন.

একটা জিনিস লক্ষ করে দেখবেন। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্নীতিবিরোধী কথাবার্তা, তর্জন-গর্জন, হেন করেঙ্গা-তেন করেঙ্গা, যতটা না তাদের নির্বাচনী ওয়াদাসম্বলিত ইশতেহারের গুণগত মান বৃদ্ধি করে, তার সিকি ভাগও পরবর্তী পর্যায়ে তাদের কথাবার্তা বা কর্মসূচিতে প্রকাশ পায় না। নির্বাচনী ইশতেহার হচ্ছে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার একটি ঝকঝকে হাতিয়ার, একটি কৌশল। ভোটারের চোখে মায়া-অঞ্জন লাগানোর একটি সাময়িক চেষ্টা। এর সঙ্গে কাজের মিল থাকতে হবে—এমন মাথার দিব্যি রাজনৈতিক দলগুলোকে কেউ দেয়নি। ফলে দুর্নীতি দমন, অফিস-আদালতে ঘুষ বন্ধ করা এগুলো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের তালিকায় কোনো দলেই অগ্রাধিকার পায় বলে মনে হয় না। দেখেশুনে মনে হতে পারে, উেকাচ গ্রহণ বা অন্য বড় বড় দুর্নীতি যারা করে, তারা রাষ্ট্রের এবং বড় বড় নেতাফেতাদের সবুজ সংকেত পেয়েই করে। অথবা ‘আমি আর মামু, ভাগ করি খামু’ নীতিতে চলে ব্যাপারটা। তা না হলে রাষ্ট্রীয় তৎপরতা কেবল মাছি মারা কেরানি আর মশা মারা দুর্বল সিং নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কেন? আর সীমাহীন লুটপাট ও দুর্নীতির কারণে যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান শৈশবেই ইন্তেকাল ফরমায়, তাকে কেন জনগণের শত শত কোটি টাকা দিয়ে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে? সেই সঙ্গে তার শীর্ষ পর্যায়ের পালের গোদা ব্যক্তিটিকে নির্বিবাদে সটকে পড়তে দেওয়া হয় কেন? দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার এক শ একটা রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে; কিন্তু প্রশ্ন জাগে, সেগুলো কি রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে বড়? আজকে দেশে যে হাজার হাজার কদলীবৃক্ষ দেখা যায়, যারা এই সেদিনও ছিল মনুষ্যদেহের কনিষ্ঠ অঙ্গুলির মতো, সেই শতকরা পাঁচজনের সঙ্গে দেশের নিচতলার মানুষের যে আসমান-জমিন ফারাক দিন দিন বেড়েই চলেছে তার পেছনে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা ও শৈথিল্য কতটুকু দায়ী তার জবাব কে দেবে? আমরা কিছু দিন আগে দুর্নীতিতে ছিলাম বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, এখন ১০/১২ ধাপ ওপরে উঠে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছি। যেন যে ছেলে গতবার ক্লাসে ১০০ জন ছাত্রের মধ্যে ছিল সর্বনিম্নে ১০০তম স্থানে, এবার তার রোল নম্বর ৯০ হওয়াতে সে পাড়ায় মিষ্টি বিলাচ্ছে। আর মাথা পিছু আয়ের শুভংকরের ফাঁকি এবং জিডিপির উন্নতি নিয়ে আগেও আমরা বলেছি, এখনো বলব, দেশের শতকরা ৯৫ জন মানুষ কাঙ্ক্ষিত ফল ভোগ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকলে আয়বৃদ্ধি-জিডিপি বৃদ্ধি এগুলো অসার। বরং যারা এসব প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে সেই কৃষক-সেই বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী শ্রমিক-গার্মেন্টকর্মীকে আমরা প্রকারান্তরে ঠকিয়ে ওপরতলার মানুষদের তেলা মাথায় তেল দিচ্ছি। আর দুর্নীতিমুক্ত কৃষক-শ্রমিককে নিয়োজিত রেখেছি কিংবদন্তির সেই কলুর বলদের ভূমিকায়। তাদের গলায় সেই জোরও নেই যে তারা গাইবে, ‘মা আমায় ঘুরাবি কতো, চোখবাঁধা বলদের মতো’!

অথচ চোখ বুজে একবার ভেবে দেখুন, এই পোড়াকপাল দেশটাতে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত কারা? ঘুষ খায় কারা? মাঠের কৃষক? জেলে? কুমার? তাঁতি? কারখানার শ্রমিক? রিকশাওয়ালা? ঠেলাওয়ালা? দিনমজুর? অথচ সমগ্র জনসংখ্যার এরাই কিন্তু বিশাল মেজরিটি। আর যে জিডিপি নিয়ে আমাদের এত আত্মশ্লাঘা তারও বড় জোগানদার তারাই। এদের জন্য সম্পদের সুষম বণ্টন, আর্থ-সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধাপ্রাপ্তি, ন্যায় বিচার লাভ এগুলো সব সময় দূর আকাশের তারা। আর ময়দানের বক্তৃতায়, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে এসব ভাঙিয়ে ভাষণশিল্পীরা হরদম বাহবা কুড়াচ্ছেন, সেই সঙ্গে চেটেপুটে খাচ্ছেন সব রকমের সুযোগ-সুবিধার মালাই-মাখন।

সরকার আসে, সরকার যায়, অবস্থার খুব একটা ইতরবিশেষ পরিবর্তন হয় না। কেবল ভাষণ, বুলি, প্রতিশ্রুতি ইত্যাদির লেবেল-মোড়ক বদলায়। ভেতরের দ্রাক্ষারস ঠিক রেখে ঝকমকে নতুন একটা বোতল ছাড়া হয় বাজারে। উদাহরণ : দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। এত কঠিন ইংরেজি কথা দেশের রাম-রহিম-যদু-মধু-কদু, অলিমদ্দি-সলিমদ্দিরা বোঝে না। তারা বরং নতুন দুর্ভোগের শিকার হয়। কর্তাব্যক্তিটির কাছে কোনো ন্যায্য তদ্বিরের জন্য গেলেও শুনতে  হয় : কী দশ হাজার-দশ হাজার বলে চিক্কুর পাড়ছেন। এখন রিস্ক বেড়ে গেছে। এখন এসব ছক্কা-পাঞ্জা দুই নম্বরি করতে গেলে বিশ হাজারের কমে হবে না। যদি পোষায় আসেন, না হলে রাস্তা মাপেন।

তাই বলি, এসব বড় বড় স্লোগানের আতশবাজি না ফুটিয়ে, আসুন, বড় বড় কিছু রুই-কাতলা পাকড়াও করুন। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন। লোকে দেখুক, আপনারা ‘কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়’ হয়েছেন। ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?’...কবি কুসুমকুমারী দাশ (জন্ম : ১২৮২, মৃত্যু ১৩৫৫ বঙ্গাব্দ)।

চার.

ভালো কথা। ঘুষ খাওয়া কিন্তু স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এ কথা আমার আপনার নয়, স্বয়ং এক বিলেতি সাহেবের, যাদের কথা সব সময় অমৃতসমান মনে করতাম আমরা তাদের শাসনামলে। সেই আমলের একটা গল্প দিয়ে শেষ করি আজকের লেখা।

এক ইংরেজ ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের (এখনকার ডেপুটি কমিশনার বা জেলা প্রশাসক) অফিসে এক ঘুষখোর নাজির দুহাতে দুপায়ে ঘুষ খেতো। তার পকেটে কিছু না গুঁজে দিয়ে, নিদেনপক্ষে কলাটা-মুলাটা না দিয়ে, কেউ পার পেতো না। তার বিরুদ্ধে সাহেবের কাছে ম্যালা নালিশ জানিয়েও কোনো লাভ হতো না। কারণ ঘুষ খাওয়া কাকে বলে সাহেব জানতেন না। তা একদিন নাজিরের প্রতিপক্ষ এক কর্মচারি দেখল এক লোক এক কাঁদি পুরুষ্টু শবরি কলা এনে নাজিরকে দিল ঘুষ হিসেবে। নাজির তা থেকে দুটো কলা নিয়ে চোখ বুজে আয়েশ করে কদলীসেবা করতে লাগল। কর্মচারিটি ভাবল এই সুযোগ, আজ ব্যাটা ঘুষখোরকে হাতেনাতে ধরিয়ে দেবো হুজুরের কাছে। সে সঙ্গে সঙ্গে সাহেবের কামরায় গিয়ে সাহেবকে বলল, হুজুর, দেখে যান, আপনার নাজির অফিসে সবার সামনে বসে কেমন ঘুষ খাচ্ছে। শুনে ঘুষ কী বস্তু দেখতে আগ্রহী সাহেবও ছুটতে ছুটতে গিয়ে হাজির নাজিরের টেবিলে। তারপর অবাক হয়ে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বললেন : আরে, এটা তোমাদের ঘুষ নাকি? এটা তো স্বাস্থ্যের জন্য খুব ভালো। আমি তো রোজই ব্রেকফাস্টের সময় অন্তত একটা ‘ঘুষ’ খাই। তাতে দেখছ না আমার স্বাস্থ্য কত ভালো।

আমাদের কর্তাব্যক্তিরা যারা ঘুষকে প্রশ্রয় দেন, নিজেরাও এস্তেমাল করেন, তাঁরাও বোধ হয় সেই সাহেবের মতো মনে করেন, ঘুষ স্বাস্থ্যের জন্য ভালো! কী বলেন?

আজ চৈত্রসংক্রান্তি, কাল পহেলা বৈশাখ। বাঙালি সাদরে বরণ করে নেবে নতুন বছরকে। সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। শুভ নববর্ষ।

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com

মন্তব্য