kalerkantho

আগুন-পানির এই শহরে

মোস্তফা মামুন

১১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আগুন-পানির এই শহরে

যাত্রাবাড়ীতে থাকত মানুষটি। সেখানে ফ্লাইওভারের কাজ শুরু হলে বাসা বদলে চলে এলো মগবাজার। এবার শুরু হলো মগবাজার ফ্লাইওভারের কাজ। বেচারা আবাস বদলায় আবার। নতুন ঠিকানা মিরপুর। এবং এর কিছুদিনের মধ্যেই শুরু মেট্রো রেলের যজ্ঞ। এরপর আর বাসা বদলায়নি। কারণ ওর বদ্ধমূল ধারণা, সে যেখানেই যাবে সেখানেই উন্নয়ন তাঁর পিছু ধাওয়া করবে। যত দূর জানি, নিজেকে ভাগ্যের হাতে সঁপে দিয়ে সে মিরপুরেই আছে।

এই দুর্ভাগ্যের তুলনা হয় না। তবু গল্পটা বলে দেখেছি, মানুষজন হেসে দেয়। অল্পে দুঃখের গল্পে সবাই উহ-আহ করে। বেশি দুঃখের হলে অন্য রকম প্রতিক্রিয়া হয়। কিছু করার নেই বলেই বোধ হয় মানুষ এই ট্র্যাজেডির মধ্য থেকে কমেডি খুঁজে নেয়। হাসে। আমাদের নগরজীবন এখন এই হাসাহাসির বৃত্তে ঢুকছে। উন্নয়নকাজ চলছে ধুমছে, এটা নিয়ে বিরূপ মনোভাব দেখানো যায় না, পাছে সরকার বা দেশবিরোধী হিসেবে লেবেল লেগে যায়। আবার এই জ্বালা সহ্যও করা যায় না। অতএব মাঝামাঝি এবং নিরাপদ ব্যবস্থা। হাসি আর তামাশা। দুর্ভোগের কোনো ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়া রসে এমন টইটম্বুর হয়ে ওঠে যে বোঝা যায় এই শহর নিয়ে মানুষ আশা মোটামুটি ছেড়ে দিয়েছে। আশা আছে শুধু মন্ত্রীদের। যাঁরা প্যারিস-লস অ্যাঞ্জেলেসের গল্প বলে বলে নিজেদের হাসির পাত্র বানাচ্ছেন অবিরত। অবশ্য এক অর্থে তাঁরাও বিনোদনের জোগানদাতা। তাঁরা আছেন বলেই আমাদের দুঃখের জীবনে হাসি আছে। কৌতুক আছে।

সেদিন বৃষ্টির পর মতিঝিল থেকে রওনা হয়েছিলাম বসুন্ধরার উদ্দেশে। সাধারণত এক ঘণ্টা লাগে। বৃষ্টিজনিত ট্রাফিক ধরে দুই ঘণ্টার হিসাব করলাম। দুই ঘণ্টা পর আবিষ্কার করলাম, অর্ধেক রাস্তাও পার হইনি। শেষ পর্যন্ত যখন গাড়ি থেকে নামতে পারলাম ততক্ষণে পেরিয়ে গেছে সাড়ে চার ঘণ্টা। সাড়ে চার ঘণ্টা লেগেছে এমন কাউকে পাইনি, তবে তিন ঘণ্টা-চার ঘণ্টা গাড়িতে বসে থাকার অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই। এখনো বৈশাখ মাসই আসেনি। তাতেই এই অবস্থা। ঢাকা লস অ্যাঞ্জেলেস, প্যারিস হোক না হোক, এই বর্ষায় ভেনিস হয়ে যাবে নিশ্চিত। মেট্রো সার্ভিস হওয়ার আগেই নৌকা সার্ভিস চালু করতে হয় কি না কে জানে।

‘জলে কুমির ডাঙায় বাঘ’ কথাটা শুনে থাকবেন। উভয় সংকট বোঝাতে চমৎকার উদাহরণ। এর আধুনিক সংস্করণ বোধ হয় ‘বিল্ডিংয়ে আগুন, রাস্তায় পানি।’ রাস্তায় নামলে পানি, কিন্তু ওদিকে ঘরে বা অফিসে যে নিশ্চিন্তে বসে থাকবেন এরও তো উপায় নেই। আগুনে পোড়ার শঙ্কা।

এই দেশে এ এক অদ্ভুত ব্যাপার, খারাপ কোনো একটা ব্যাপার শুরু হলে আর থামাথামি নেই। চুড়িহাট্টার আগুনটাকে আমরা ধরলাম দুর্ঘটনা। এমন দুর্ঘটনা আগেও তো ঘটেছে। কিন্তু কী কাণ্ড! দুর্ঘটনাটা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে আগুনটা এমন একটা স্বাভাবিক ব্যাপার যে দুয়েক দিন আগুন লাগার খবর না শুনলে মনে হয়, আরে কী যেন একটা ঘটনা ঘটেনি!

আগুন-পানির এই দ্বিমুখী আক্রমণ মিলিয়ে জাভেদ ভাইয়েরও মেজাজ বিগড়ে থাকার কথা। মাঝখানে একদিন শুনেছি, রিকশা উল্টে নাকি পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু জাভেদ ভাইয়ের অনেক কিছুর মধ্যে ভালো দিক হলো, নৈর্ব্যক্তিক থাকতে পারে। নিজের সুবিধা-অসুবিধায় বিশ্লেষণ বদলায় না। তবু আজ এমনভাবে অন্য প্রসঙ্গে গেল যে ধরতে একটু সময় লাগল।

বলল, ‘আমি এই আগুন নিয়ে চিন্তিত না। চিন্তিত অন্য আগুন নিয়ে।’

অন্য আগুন মানে কী? প্রতীকী আগুন হিসেবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কথা বলা হয়, কিন্তু বাজারে তো এমন কোনো আগুনের কথা শুনিনি।

বুঝতে পারছি না দেখে জাভেদ ভাই খুশি হয়। যেকোনো জ্ঞানী লোকেরই দেখেছি নিজের জ্ঞান প্রতিষ্ঠা পেলে ভালো লাগে। বলল, ‘আমি বলছি সেই আগুনের কথা, যে আগুনে একটা মেয়ে পুড়ে মরছে। লেগে যাওয়া আগুন নয়, আমার চিন্তা লাগানো আগুন নিয়ে।’

মানতে বাধ্য হই। নুসরাতের গায়ে লাগা এই আগুনটা শুধু শরীর জ্বালাচ্ছে না, মন আর সমাজকেও জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

মাথা নাড়তে নাড়তে বললাম, ‘বীভৎস ব্যাপার। মানুষ কিভাবে এমন পশু হতে পারে!’

‘এদের পশু বললে পশুদের অপমান হয়।’

‘কিন্তু হঠাৎ করে এমন পাশবিকতা বেড়ে গেল কেন?’

‘একদিকে দালানে আগুন লাগছে, অন্যদিকে মানুষ মানুষকে আগুনে পোড়াচ্ছে। দুটির মধ্যে আপাতদৃশ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু আসলে একটা সম্পর্ক আছে। আগুনের ভয়াবহতা দেখে আমরা শিউরে উঠি, কিন্তু এই ভঙ্গুর নৈতিকতার সমাজে কিছু মানুষ আছে যাদের কাছে এটা ঘৃণার স্পৃহা পূরণের একটা দরজা খুলে দেয়। ওরা মানুষকে কাতরাতে দেখে মনে করে, যদি আমার শত্রুকে এ রকম কষ্ট দেওয়া যায়!’

‘মাই গড! তুমি মনে করছ এই চুড়িহাট্টা বা এফ আর টাওয়ারের আগুন দেখে...’

‘আমি ভুলও হতে পারি। কিন্তু আমার মনে হয় সমাজতাত্ত্বিকদের এই নিয়ে ভাবা উচিত। সমাজে ঘৃণার জাল এমন বিস্তৃত হয়েছে, নৈতিকতা এত নিচে নেমেছে যে শুধু পুলিশ-থানা দিয়ে এর মীমাংসা সম্ভব না। এই সমাজের চিকিৎসা দরকার। এই দানবিকতার শুশ্রূষা জরুরি!’

‘আচ্ছা ২০১৪-১৫ সালের আগুন সন্ত্রাসও কি অগ্নি-পাশবিকতা উসকানির একটা কারণ।’

“ভালো পয়েন্ট। হতে পারে। সেগুলো নিয়ে রাজনীতি হয়েছে। সঠিক বিচার হয়নি। ওই পাশবিকতাটা সমাজে ছড়িয়েছে আবার ঠিক বিচার না হওয়ায় ‘নরপশু’দের মনে হচ্ছে পার পাওয়াও তো সম্ভব। দুটি মিলিয়ে...হতে পারে। এই সমাজের চিকিৎসা দরকার।”

‘কিন্তু জাভেদ ভাই, এই সমাজে ভালো দিকও তো আছে। ওই যে নাঈম নামের ছেলেটা যেভাবে পাইপ ধরে রাখল কিংবা সোহেল রানা...’

‘খুবই ভালো কাজ করেছে ওরা। সোহেল রানা জীবন উৎসর্গ করেছে। কিন্তু এটাকে তুমি যেমন সমাজের ভালো দিক হিসেবে দেখছ, আমি অতটা ভালো হিসেবে দেখি না। ধরো, নাঈম নামের ছেলেটি যে পাইপটা ধরেছে সেটা ভালো কাজ, কিন্তু দুর্যোগে তো সবারই এমনভাবে কাজে নেমে যাওয়া উচিত। আসলে কেউ তাঁর দায়িত্ব পালন করে না বলে সামান্য ভালো কাজই এই দেশে অতি মূল্যায়িত হয়ে যায়। একজন পুলিশ রাস্তায় একজন চোরকে ধরছে, এটা নিয়েই সবাই লাফায়। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চোরকে পুলিশ ধরে না অথবা ছেড়ে দেয়। সমাজে লোকজন তার দায়িত্ব পালন করে না বলে কেউ একটা কাজ করলেই মনে হয় বিরাট কাজ করল।’

‘তুমি বোধ হয় একটু বেশি নেগেটিভ। এগুলো তো আশা জাগায়।’

‘না জাগায় না। বরং এই দুয়েকটাকে সামনে এনে বাকি সবার ব্যর্থতাকে আড়াল করা যায়। এগুলো হয়ে যায় দায়িত্ব পালন না করাদের ঢাল। এই নাঈমকে নিয়ে লাফালাফিতে অন্য অনেক কিছু হারিয়ে গেল। সোহেল রানার আত্মদান নিয়ে আমাদের যে হাহাকার এর ভিড়েই হয়তো হারিয়ে যাবে রাজউকের অসাধুতা, লোভী দালান মালিকদের অসচেনতা কিংবা কর্তাব্যক্তিদের ঘটনার আগ পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকা।’

কথা বলতে বলতেই দেখি আকাশ আবার কালো হয়ে গেছে। বৃষ্টি হবে। বৃষ্টির পর পানি। যানজট।

জাভেদ ভাইও আকাশ দেখে। দেখতে দেখতে বলে, ‘আমাদের মূল সমস্যা এটাই।’

‘কোনটা?’

‘এই যে আগুন থেকে আমরা চলে যাব পানিতে। এখন তুমি ভাবছ কী করে বাসায় যাবে। কতক্ষণ জ্যামে থাকবে। বাসায় রাতে কারেন্ট থাকবে কি না?’

অস্বীকার করি না। তা কিছুটা ভাবছি।

জাভেদ ভাই স্বগতোক্তি করে, ‘ঘটনা ঘটে। আমরা ভিলেন বের করি। তারপর নায়ক খুঁজে পাই। তারপর নতুন সমস্যা আসে। নতুন ভিলেন। হিরো। আর ঘটনার এই ঘনঘটায়ই কর্তাব্যক্তিরা জানে, সবই দুদিনের মামলা। বড় বড় কথা বলে কয়েকটি দিন পার করে দিলেই হয়। আমাদের ভোলানো এত সহজ!’

সত্যি আমাদের ভোলানো খুব সহজ। আমাদের খুশি করা খুব সহজ। 

আর এসব কিছু খুব সহজ বলেই আমাদের শাসন কিংবা শোষণ করাও বড় সহজ।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

 

মন্তব্য